তুমি ঠিক কী বলবে আমি জানি, কিটি; ‘আনা, এ কী কথা শুনি আজ…? যে ওপরতলার লোকদের এত বাক্যযন্ত্রণী শুনেছে, যে মেয়ে এত বেশি অন্যায় অবিচার সয়েছে, সেই তোমার মুখ থেকেই কিনা…?’–হ্যাঁ, তবু আমারই কথা এসব।
আমি কেঁচে গণ্ডুষ করতে চাই, যেতে চাই এইসব কিছুর মূলে। লোকে বলে, সব সময় ছোটরা যা খারাপ দেখবে তাই শিখবে। আমি তেমন হতে চাই না; আমি চাই গোটা জিনিসটা নিজে সযত্নে যাচাই করতে এবং কোন্টা ঠিক আর কোনটা অতিরঞ্জিত তা খুঁজে বার করতে। যদি দেখি আমি যা ভেবেছিলাম, হায়, ওরা তা নয়। তাহলে মা-মণি আর বাপির সঙ্গে আমি একমত হব। তা না হলে, আমি গোড়ায় চেষ্টা করব ওঁদের ধারণাগুলো বদলাতে, যদি না পারি তাহলে আমি আমার মতামত আর সিদ্ধান্তে অবিচল থাকব। মিসেস ফান ভানের সঙ্গে আমাদের মতান্তরের প্রতিটি বিষয় নিয়ে খোলাখুলি আলোচনার প্রত্যেকটি সুযোগ আমি গ্রহণ করব এবং নিজেকে নিরপেক্ষ বলে জাহির করতে আমি ডরাব না–তাতে যদি আমাকে সবজান্তা বলে খোটা দেওয়া হয় তো হোক। তার মানে এই নয় যে আমি আমাদের পরিবারের বিরুদ্ধে চলে যাব–আসলে আজ থেকে যেটা করব তা হল নির্মম গল্পগুজবে আর আমি নিজেকে ফাসাব না।
এ পর্যন্ত আমি নিজের মত থেকে এক চুল নড়তাম না! সব সময় ভাবতাম যত দোষ সব ঐ ফান ডানদের, কিন্তু আমরাও দোষের ভাগী ছিলাম। এ ব্যাপারে সন্দেহের নেই যে, বিতর্কিত বিষয়টাতে আমরাই ছিলাম সঠিক; কিন্তু যাদের বুদ্ধি বিবেচনা আছে (আমাদের আছে বলে তো আমরা মনেই করি!) অন্যদের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে তাদের জ্ঞান আরো টনটনে হবে, লোকে এটাই প্রত্যাশা করে। আমি কিছুটা অন্তদৃষ্টি লাভ করেছি বলে এবং সময়ে সেটা সুষ্ঠুভাবে ব্যবহার করবার আশা রাখি।
তোমার আনা।
.
সোমবার, ২৪ জানুয়ারি, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
আমার কী যেন ঘটেছে; কিংবা, সেটাকে একটা ঘটনা হিসেবেও আমি দেখাতে পারি না; শুধু বলতে পারি, ব্যাপারটাতে বেশ খানিকটা মাথার ছিট আছে। বাড়িতে বা ইস্কুলে যখনই কেউ যৌন সমস্যার বিষয়ে কিছু বলত, তাতে হয় থাকত একটা রহস্যের ভাব, নয় সেটা হত নিধৃণ্য ধরনের।
প্রাসঙ্গিক কথাগুলো বলা হত ফিস্ ফিস্ করে, এবং কেউ বুঝতে না পারলে সে হত উপহাসের পাত্র। জিনিষটা আমার কাছে বিসদৃশ মনে হত। আমি ভাবতাম, এসব জিনিস নিয়ে কথা বলবার সময় লোকে কেন এত ঢাকঢাক গুড়গুড় করে? কেনই বা এত কান ঝালাপালা করে? এসব পাল্টে দেব এমন দুরাশা আমার না থাকায় আমি যথাসম্ভব মুখে কলুপ এঁটে থাকতাম, কিংবা দু-এক সময় আমার মেয়েবন্ধুদের কাছ থেকে এটা-ওটা জেনে নিতাম। যখন বেশ কিছু জানা হয়ে গেল এবং মা-বাবাকেও তা বললাম, মা-মণি একদিন আমাকে ডাকলেন, ‘আনা, তোমার ভালোর জন্যেই এটা বলছি–ছেলেছোকরাদের সামনে যেন এসব কথা বলো না; ওরা যদি কথাটা তোলে তাহলে তুমি হা-ও বলো না, না-ও বলো না। তার উত্তরে কী বলেছিলাম আমার অবিকল মনে আছে। আমি বলেছিলাম, সে আর বলতে!’ ব্যস, এখানেই এর ইতি।
যখন গোড়ায় আমরা এখানে এলাম, বাপি প্রায়ই এমন সব জিনিস নিয়ে আমাকে বলতেন যেসব বিষয়ে বরং মা-মণির কাছ থেকে শুনতে পারলেই আমি বেশি খুশি হতাম; জানার যেটুকু বাকি ছিল, সেটুকু পুষিয়ে নিলাম কিছু বইপত্র থেকে আর কিছুটা লোকপ্রমুখাৎ। ইস্কুলের ছেলেদের মতন পেটার ফান ডানকে কিন্তু এ ব্যাপারে কখনই ততটা অসহ্য বলে মনে হয়নি–হয়ত গোড়ার দিকে দু-একবার ছাড়া। কখনই ও আমার মুখ খোলার চেষ্টা করেনি।
মিসেস ফান ডান আমাদের বলেছিলেন এসব প্রসঙ্গে তিনি বা তার জ্ঞানত, তাঁর স্বামীও পেটারকে কোনদিনই কিছু বলেননি। বোঝাই যায়, পেটার কতটা কী জানে না জানে সে সম্পর্কে তিনি কোনো খবরও রাখতেন না।
কাল মারগট, পেটার আর আমি যখন আলুর খোসা ছাড়াচ্ছিলাম, কথায় কথায় বোখার প্রসঙ্গ ওঠে। আমি প্রশ্ন করেছিলাম, আমরা এখনও জানি না বোখা ছেলে না মেয়ে-তাই না?’
পেটার তার উত্তরে বলেছিল, ‘আলবৎ জানি, ও হচ্ছে হুলো।‘
শুনে আমি হেসে উঠি। ‘হুলোর পেটে বাচ্চা, অবাক কাণ্ড!’
পেটার আর মারগটও এই ছেলেমানুষী ভুলের ব্যাপারটা নিয়ে খুব হাসল। দেখ, দুই মাস আগে পেটার বলেছিল শীগগিরই বোখার বাচ্চা হবে, ওর পেটটা কি রকম বড় হয়ে উঠেছে। অবিশ্যি ওর পেট মোটা হওয়ার কারণ বোঝা গেল চুরি করে খাওয়া প্রচুর হাড়, কেননা বাচ্চা পাড়া দূরের কথা, পেটের মধ্যে বাচ্চাগুলোর চটপট বেড়ে ওঠারও কোনো লক্ষণ দেখা গেল না।
স্বপক্ষে যুক্তি না দেখিয়ে পেটারের উপায় নেই। বলল, না হে না, আমার সঙ্গে গিয়ে স্বচক্ষে দেখে আসতে পারো। একদিন ওর আশপাশে খেলা করছিলাম, তখন একদম স্পষ্ট দেখতে পাই ও হচ্ছে হুলো।
শুনে আমার এমন কৌতূহল হল যে ওর সঙ্গে মালখানায় না গিয়ে পারলাম না। কিন্তু বোখা তখন দেখা দেওয়ার মেজাজে ছিল না, ফলে কোথাও তার টিকি দেখা গেল না। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর ঠাণ্ডা লাগতে থাকায় ফের ওপরতলায় চলে গেলাম। পরে বিকেলের দিকে পেটার যখন দ্বিতীয়বার নিচের তলায় যায় তখন তার পায়ের শব্দ পেলাম। মনে অনেক সাহস সঞ্চয় করে নিঃশব্দ বাড়িটাতে পা ফেলে ফেলে আমি নিচে মালখানায় চলে গেলাম। গিয়ে দেখি একটা প্যাকিং টেবিলে দাঁড়িয়ে বোখা পেটারের সঙ্গে খেলছে। ওজন নেবার জন্যে পেটার তখন তাকে সবে দাঁড়িপাল্লায় তুলেছে।
