ঠিক তখন মা-মণি এমন একটা মন্তব্য করলেন বা কথা বললেন যাতে প্রতিকূলতা আছে বলে মনে হল, তারপর একেবারে ভাঙা মন নিয়ে আমি চলে গেলাম ইস্কুলে। বাড়ি ফেরার সময় ভাবতে ভাবতে আসতাম–মা-মণির আর দোষ কী, তার মাথায় এতরকমের বোঝা! বাড়ি ফিরতাম খুব হাসিখুশী হয়ে, মুখে খই ফুটত শেষে এই কথা যখন বার বার বলতে শুরু করতাম, তখন ইস্কুলের ব্যাগ বগলে করে মুখে চিন্তার ভাব ফুটিয়ে সট করে ঘর ছেড়ে চলে যেতাম।
মাঝে মাঝে ঠিক করতাম মুখ ভার করে থাকব, কিন্তু তখন ইস্কুল থেকে ফিরতাম তখন আমার এত খবর থাকত বলবার যে, সেসব সংকল্প কোথায় ভেসে যেত। আর মা-মণির হাতে যতই কাজ থাক, আমার সারাদিনের ঘটনা শোনার জন্যে মা-মণিকে কান খাড়া করে থাকতে হত। এরপর আবার সেই সময় এল, যখন আমি সিঁড়িতে পায়ের শব্দ শোনা ছেড়ে দিলাম। আর রাত্তিরে আমার বালিশ চোখের পানিতে ভিজে যেত।
সেই সময়টাতে সবকিছুই আরো খারাপ হয়ে পড়ল; বলতে কি, সে সবই তুমি জানো।
এখন আল্লাহর দয়ায় পেয়েছি একজন সহায়ক-পেটার…। আমি আমার লকেটটা জড়িয়ে ধরি, চুমো খাই আর আপন মনে বলি, ‘ওদের আমি কলা দেখাই! আমার আছে। পেটার। ওরা তার কী জানে?’ আমি যে এত দাবড়ানি খাই, এইভাবে তার আঘাত কাটিয়ে উঠি। একজন কমবয়সী মেয়ের গহন মনে এত কিছু তোলপাড় করে! কার আর সে কথা মাথায় আসে?
তোমার আনা।
.
শনিবার, ১২ জানুয়ারি, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
আমাদের যেসব ঝগড়া-বিবাদ, তা নিয়ে প্রতিবারই সবিস্তারে তোমাকে বলার কোনো মানে হয় না। তোমাকে শুধু এইটুকু বললেই হবে যে, বিস্তর জিনিস–তার মধ্যে আছে মাখন আর মাংস–আমরা ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছি এবং নিজেদের আলু আমরাই ভেজে নিই। কিছুদিন থেকে আজকাল আমরা দুই বেলার আহারের মাঝখানে অতিরিক্ত হিসেবে ময়দার রুটি খাচ্ছি, কেননা বিকেল চারটে নাগাদ রাতের খাবারের জন্যে আমরা এমন উতলা হয়ে পড়ি যে, পেটের ভোঁচকানি আর আমরা সামাল দিতে পারি না।
মা-মণির জন্মদিন দ্রুত এসে যাচ্ছে। ক্রালারের কাছ থেকে মা-মণি কিছুটা বাড়তি চিনি পাওয়ায় ফান ডানদের খুব গায়ের জ্বালা, কেননা মিসেস ফান ডানের জন্মদিনে এভাবে দাক্ষিণ্য করা হয়নি। কিন্তু এ নিয়ে অকথা-কুকথা বলে, চোখের পানি ফেলে, মেজাজ খারাপ করে একে অন্যের অশান্তি সৃষ্টি করে কী লাভ? এ কথা জেনে রাখো কিটি, ওদের ওপর আমাদের আগের চেয়েও বেশি ঘেন্না ধরে গেছে। এক পক্ষকাল যেন ফান ডানদের মুখ আর না দেখি। মা-মণি তাঁর এই ইচ্ছের কথা বলেই ফেলেছেন। এখুনি অবশ্য সেটা পূর্ণ হওয়া সম্ভব নয়।
আমি বসে বসে ভাবি, এক বাড়িতে যার সঙ্গেই থাকা যাক, শেষ অবধি খিটিমিটি বাধা অবধারিত কিনা। নাকি অদ্ভদেরই কপাল অতিরিক্ত খারাপ? বেশিরভাগ লোকেরাই কি তাহলে এই রকম হাঁটান আর নিজের কোলে ঝোল টানার স্বভাব? মনে হয়, মানুষজন সম্পর্কে কিঞ্চিৎ জ্ঞান হয়ে ভালোই হয়েছে; তবে এখন মনে হয়, যতটা জেনেছি সেই ঢের। আমরা চুলোচুলি করি বা না করি, মুক্তি পেয়ে খোলা হাওয়া গায়ে লাগাতে চাই বা না চাই, যুদ্ধ চলছে এবং চলবে।
কাজেই এখানে যতদিন আছি, আমাদের উচিত সবচেয়ে শ্রেয়ভাবে থাকা। এখন আমি জ্ঞানের কথা বলছি, কিন্তু এও জানি, খুব বেশিদিন এখানে থাকলে আস্তে আস্তে হয়ে যাব বুড়িয়ে-যাওয়া শুকনো সিমের বোঁটা। অথচ আমি কত না চেয়েছিলাম একজন প্রকৃত সুকুমারী রমণী হয়ে উঠতে!
তোমার আনা।
.
শনিবার, ২২ জানুয়ারি, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
আচ্ছা, তুমি বলতে পারো, লোকে সব সময়ে কেন নিজেদের আসল মনের ভাবটাকে ঢেকে রাখার জন্যে এত কোমর বেঁধে লাগে? অন্য লোক থাকলে যে রকম করা উচিত, তা করে কেন আমি একেবারে অন্য রকমের ব্যবহার করি বলো তো?
কেন আমরা পরস্পরকে এত কম বিশ্বাস করি? আমি জানি, নিশ্চয় তার কারণ আছে; কিন্তু তা সত্ত্বেও মাঝে মাঝে আমার দেখে শুনে মনে হয় এটা কী ভয়ঙ্কর যে, আমরা কখনই কাউকে বিশ্বাস করে ঠিক মনের কথা বলতে পারি না–সে যদি খুব আপনজন হয় তাহলেও।
সেদিন রাত্রে স্বপ্নটা দেখার পর থেকে আমার বয়স যেন অনেক বেড়ে গেছে। এখন আর আমি কারো মুখাপেক্ষী নই। শুনে আশ্চর্য হবে, ফান ডানদের প্রতি আমার মনোভাবও ঠিক আগের মতো নেই। সবার সব যুক্তিতর্ক এবং আর যা কিছু সমস্তই আমি হঠাৎ অন্য এক দৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছি। আমার মনের পাল্লা একদিকে এখন আর আগে থেকে ততটা ভারী হয়ে থাকে না।
আমি এতটা বদলে গেলাম কেমন করে? তার কারণ, এটা আমার হঠাৎ মনে হল যে, মা-মণি অন্য রকমের হতেন, মা যাকে সত্যিকার বলে–সম্পর্কটা তাহলে একেবারে অন্য রকমের ইত। এটা সত্যি যে, মিসেস ফান ভান মানুষটা আদৌ সুবিধের নন, কিন্তু তাহলেও অর্ধেক ঝগড়াঝাটি এড়ানো যেতে পারত–কথা কাটাকাটির সময় মা-মণি যদি একটু কম একগুয়ে হতেন।
মিসেস ফান ডানের একটা ভালো দিক এই যে, ওঁর সঙ্গে কথা বলা যায়। ওঁর মধ্যে স্বার্থপরতা, কঞ্জুষপনা আর লুকোচুরির ভাব থাকলেও ওঁকে নোয়ানো যায় সহজেই–অবশ্যই ওঁকে না চটিয়ে এবং আঁতে ঘা না দিয়ে। প্রতিবারেই যে এতে কাজ হবে তা নয়, তবে ধৈর্য ধরে করতে পারলে ফিরে চেষ্টা করে দেখতে পারো কতটা এগোনো যায়।
আমাদের মানুষ হওয়ার, পরকাল ঝরঝরে হওয়ার, খাওয়াদাওয়ার যা কিছু সমস্যা এসব একেবারেই অন্যরূপ নিত যদি আমরা পুরোপুরি দিলখোলা আর অমায়িক হতাম এবং যদি পরের দোষ ধরার জন্যে সবসময় মুখিয়ে না থাকতাম।
