আর্শিতে নিজের মুখ দেখলাম। একেবারে অন্যরকম দেখাল। চোখ দুটো কী স্বচ্ছ আর গাঢ়, গাল দুটো গোলাপী–এ রকম যে কতদিন ছিল না আমার হাঁ-মুখটা অনেক তুলতুলে দেখাল; দেখে মনে হবে আমি আছি মনের সুখে, অথচ আমার মধ্যে কোথায় যেন একটা করুণ বিষাদের ভাব, আর আমার ঠোটে হাসি ফুটে উঠতে না উঠতে মিলিয়ে যায়। আমার মনে যে সুখ নেই, তার কারণ কবে হয়ত জানব আমার কথা পেটার আর ভাবে না; কিন্তু এ সত্ত্বেও আমি আজও যেন আমার চোখে তার দুটি অসামান্য চোখ আর আমার গালে তার স্নিগ্ধ নরম গাল অনুভব করি।
পেটেল, ও পেটেল, আমার মানসপট থেকে কেমন করে তোমার মূর্তি আমি সরিয়ে নেব? তোমার জায়গায় আর যাকেই বসাই, কেউই তো তোমার নখের যুগ্যিও হবে না? আমি তোমাকে ভালবাসি, সে ভালবাসা এত বড় যে আমার হৃদয়ের কূল ছাপিয়ে একদিন সে প্রকাশ্যে আছড়ে পড়বে, হঠাৎ সবকিছু ধসিয়ে দিয়ে নিজেকে সে লোকচক্ষে তুলে ধরবে!
এক সপ্তাহ আগে কেন, কেউ যদি গতকালও আমাকে জিজ্ঞাসা করত, ‘তোমার বন্ধুদের মধ্যে কাকে তুমি বিয়ে করার সবচেয়ে উপযুক্ত বলে মনে করো?’ আমি বলতাম, আমি জানি না; কিন্তু এখন হলে আমি গলা ফাটিয়ে বলব, পেটেলকে। কেননা মনপ্রাণ দিয়ে তাকে আমি ভালবাসি। নিজেকে আমি নিঃশেষে তার কাছে সঁপে দিয়েছি।’ তবে একটা কথা, পেটেল আমার মুখ স্পর্শ করতে পারে, কিন্তু তার বেশি নয়।
একবার যৌন বিষয়ে কথা হওয়ার সময় বাপি আমাকে বলেছিলেন যে, আমি এখনও সম্ভবত সেই কামনা বোধ করি না; আমি জানতাম আমার এই কামনাবোধ সব সময়েই ছিল এবং এখন আমি সে সম্বন্ধে পূর্ণভাবে সজাগ। এখন একজনই আমার পরম প্রিয়, সে হল আমার পেটেল।
তোমার আনা।
.
বুধবার, ১২ জানুয়ারি, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
এলি ফিরেছেন দিন পনেরো হল। মিপ আর হেক্ক দুদিন কাজে আসেননি–দুজনেরই পেটের গণ্ডগোল হয়েছিল।
এখন আমাকে পেয়ে বসেছে নাচ আর ব্যালে; রোজ সন্ধ্যেবেলা আমি নাচের তালে তালে পা ফেলা অভ্যেস করি। মা-র একটা লেস-লাগানো হালকা নীল সায়া ছিল, তাই দিয়ে আমি একটা অতি আধুনিক ঢংয়ের নীচের ঘাঘরা তৈরি করে নিয়েছি। ওপর দিয়ে গোল করে একটা রিবন পরিয়ে নিয়েছি আর ঠিক মাঝখানে লাগিয়ে নিয়েছি একটা বো-টাই; একটা পাকানো গোলাপী রিবনে হয়েছে ষোলকলা পূর্ণ। বৃথাই চেষ্টা করলাম আমার জিমন্যাস্টিকের জুতোটাকে সত্যিকার ব্যালে-জুতোর রূপ দিতে। আমার কাঠ-কাঠ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আবার আগের মতন নমনীয় হয়ে আসছে। সবচেয়ে সাংঘাতিক যে ব্যায়াম, সেটা হল মাটিতে বসে দুই হাতে দুটো গোড়ালি ধরে শূন্যে উঁচু করে তোলা। বসবার জন্যে আমাকে একটা কূশন পেতে নিতে হয়, নইলে আমার পাছার অবস্থাটা খুবই সংকটজনক হয়ে ওঠে।
এখানে ‘নির্মেঘ সকাল’ বইটা সবাই পড়ছে। মা-মণি বইটা অসাধারণ বলে মনে করেন; বইটাতে তরুণ-তরুণীদের সমস্যার বিষয়ে অনেক কিছু আছে। আমি ঠোট উল্টে মনে মনে ভাবি; তার আগে তোমাদের নিজেদের ছেলেপুলেদের ব্যাপারে একটু মাথা দিলেই তো পারো।’
আমার বিশ্বাস, মা-মণি মনে করেন মা-বাবার সঙ্গে ওঁদের ছেলেপুলেদের যে সম্পর্ক তার চেয়ে ভালো কিছু আর হতে পারে না, এবং ছেলেপুলেদের ব্যাপারে তাঁর মতন অত আদরযত্ন আর কেউই করতে পারে না। কিন্তু এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে, মা-মণি দেখেন শুধু মারগটকে আমার মনে হয় না মারগটের আমার মতন সমস্যা বা চিন্তাভাবনা। তবু মা মণিকে এটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবার কথা আমি ভাবতেই পারি না যে, মেয়েদের ব্যাপারে তার মনগড়া ধারণাটা আদৌ ঠিক নয়। কেননা সেটা জানলে তিনি একেবারে আকাশ থেকে পড়বেন এবং বুঝে নিজেকে বদল করাও কোনোভাবেই তার পক্ষে সম্ভব হবে না। এতে তিনি মনে যে দুঃখ পাবেন, আমি সে দুঃখ তাকে দিতে চাই না। বিশেষত আমি তো জানি আমার তাতে কিছুতেই কিছু যাবে আসবে না।
মা-মণি নিশ্চয় মনে করেন যে আমার চেয়ে মারগট তাকে বেশি ভালবাসে, তবে তাঁর ধারণা চন্দ্রকলার মতন এর হ্রাসবৃদ্ধি আছে। মারগট বড় হয়ে খুব মিষ্টি হয়েছে; ও অনেক বদলেছে, এখন আর আগের মতো অতটা হিংসুটে নেই। ক্রমশ ও আমার সত্যিকার বন্ধু হয়ে উঠছে। ও আমাকে আর এখন আগের মতো নেহাত এলেবেলে ছেলেমানুষ বলে মনে করে না।
কখনও কখনও আমার মধ্যে একটা অদ্ভুত ব্যাপার হয়; আমি অন্যের চোখ দিয়ে নিজেকে দেখতে পারি। তখন আমি অনায়াসে জনৈক ‘আনা’র ব্যাপার-স্যাপার দেখতে পাই এবং একজন বাইরের লোক হিসেবে তার জীবনের পাতাগুলো আমি উল্টে যাই। এখনে আসার আগে, যখন আমি আজকের মতো এটা-ওটা নিয়ে অত বেশি মাথা ঘামাতাম না, মাঝে-মাঝে আমার মনে হত মা, পিম্ আর মারগট–এরা আমার কেউ নয়, ভাবতাম চিরদিনই আমি থেকে যাব খানিকটা বাইরের লোক। কখনও কখনও এমন ভান করতাম যেন আমি অনাথ; পরে তার জন্যে নিজেকেই বকতাম এবং শাস্তি দিতাম; নিজেকে বোঝাতাম যে, এত ভাগ্য করে এসেও এই যে আমি আত্মনিগ্রহ করি এটা তো আমারই দোষ।
এরপর একটা সময়ে আমি নিজেকে জোর করে আত্মীয় করে তুলি। রোজ সকালে নিচের তলায় কেউ এলে আমি ভাবতাম নিশ্চয়ই মা-মণি, এবার আমার শিয়রে এসে সুপ্রভাত বলবেন। আমি তাঁকে দেখলেই আন্তরিক সম্ভাষণ জানাতাম, কেননা মনে মনে আমি সত্যিই চাইতাম যে,–মণি আমার দিকে স্নেহভরে তাকান।
