এটা অদ্ভুত, এখানে আমি প্রায়ই আমার স্বপ্নে সব যেন জীবন্ত দেখতে পাই। প্রথম আমি এক রাত্রে দিদিমাকে এত স্পষ্ট দেখতে পাই যে, আমি তার পুরু তুলতুলে কোঁচকানো মখমলের মতো গায়ের চামড়া পর্যন্ত যেন আলাদা করতে পারছিলাম। এরপর দিদিমা দেখা দেন বিপত্তারিণী পরীর মতন; তারপর আসে লিস্। ও আমার কাছে আমার সমস্ত মেয়ে বন্ধু এবং ইহুদীর লাঞ্ছনার প্রতীক। ওর জন্যে যখন আমি সৃষ্টিকর্তাকে ডাকি, তখন আমার সেই প্রার্থনা হয় সকল ইহুদী এবং সকল আর্তের জন্যে। আর এখন এল পেটার, আমার প্রাণাধিক পেটার–এর আগে আমার মানসপটে তার এত স্পষ্ট ছবি কখনও ছিল না। আমার কাছে তার ফটোর কোনো দরকার নেই, আমি তাকে আমার মনশ্চক্ষে দেখতে পাই এবং কী সুন্দরভাবে।
তোমার আনা।
.
শুক্রবার, ৭ জানুয়ারি, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
আমি কী বোকা গাধা। আমি একেবারে ভুলে বসে আছি যে, আমি আমার নিজের এবং আমার তাবৎ ছেলে-বন্ধুদের ইতিহাস তোমাকে কখনও বলিনি।
যখন আমি নিতান্তই ছোট–কিন্ডারগার্টেনের গণ্ডীও যখন ছাড়াইনি–কারেল সামসনের প্রতি আমার টান হয়। ওর বাবা মারা গিয়েছিলেন; মাকে নিয়ে সে তার এক মাসীর কাছে থাকত। কারেলের এক মাসতুতো ভাই ছিল, তার নাম রবী; ছেলেটি ছিল রোগা, সুশ্রী, গায়ের রং একটু চাপা। কারেল ছিল ছোটখাটো, কৌতুকপ্রিয়। কারেলের চেয়ে রবীকে নিয়ে সবাই বেশি আদিখ্যেতা করত। কিন্তু আমি চেহারা জিনিসটাকে আমল দিতাম না; বেশ কয়েকবছর আমি কারেলের খুব অনুরক্ত ছিলাম।
আমরা বিস্তর সময় প্রায়ই একসঙ্গে কাটাতাম, কিন্তু সে ছাড়া, আমার ভালবাসার প্রতিদান পাইনি। এ এরপর পেটারকে পেলাম; ছেলেমানুষের মতো আমি সত্যিই প্রেমে পড়লাম। আমাকেও সে খুব পছন্দ করত এবং একটি পুরো গ্রীষ্ম আমরা পরস্পর অচ্ছেদ্যভাবে কাটালাম। এখনও মনে পড়ে, দুজনে হাত ধরাধরি করে আমরা একসঙ্গে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছি; পেটারের পরনে একটা সাদা স্যুট আর আমি পরেছি গরমকালের খাটো পোশাক। গরমের ছুটির পর পেটার গিয়ে ভর্তি হল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাথমিক শ্রেণীতে আর আমি নিম্নতর বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণীতে। ইস্কুল থেকে ও আসত আমার কাছে, আমিও তেমনি যেতাম। দুজনের দেখা হত। পেটার ছেলেটা ছিল খুব প্রিয়দর্শন, লম্বা, সুন্দর আর ছিপছিপে; অমায়িক, শান্ত, বুদ্ধিদীপ্ত মুখ। কালো চুল, আশ্চর্য বাদামী চোখ, রক্তিম গাল আর টিকোলো নাক। সবচেয়ে বড় কথা, আমাকে মাত করে দিত ওর হাসি–ওকে তখন এমন মিচকে শয়তানের মতো দেখাতো।
ছুটিতে আমি গ্রামে গিয়েছিলাম; ফিরে এসে দেখি–পেটার যেখানে থাকত সেখান থেকে উঠে গেছে; ঐ একই বাড়িতে থাকত পেটারের চেয়ে বয়সে ঢের বড় একটি ছেলে। সম্ভবত পেটারকে সে এটা বুঝিয়েছিল যে, আমি হলাম একজন বাচ্চা ক্ষুদে শয়তান এবং সেই শুনে পেটার আমাকে ত্যাগ করে। আমি পেটারকে এত বেশি ভক্তি-শ্রদ্ধা করতাম যে, প্রকৃত সত্যের মুখোমুখি হতে আমার মন চায়নি। আমি তাকে আঁকড়ে ধরে থাকতে চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু পরে আমার খেয়াল হল যে, আমি যদি এভাবে তার পেছনে ছুটি, তাহলে শীগগিরই লোকে আমাকে ছেলে-ধরা বলে বদনাম দেবে। বছরগুলো চলে গেল। তার মধ্যে পেটার তার সমবয়সী মেয়েদের নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, একবার ডেকে আমার খবর নেওয়ার কথাও তার মনে হয় না। আমি কিন্তু তাকে ভুলতে পারিনি।
আমি চলে গেলাম ইহুদীদের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। আমাদের ক্লাসের প্রচুর ছেলে আমার সঙ্গ পাওয়ার জন্য উদগ্রীব–তাতে আমার মজা লাগত, ইজ্জত বাড়ত, কিন্তু অন্যদিকে থেকে সেসব আদৌ আমার মন স্পর্শ করত না। এরপর একটা সময়ে হ্যারি আমার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিল। কিন্তু তোমাকে তো আগেই বলেছি আমি আর কখনো কারো প্রেমে পড়িনি।
কথায় বলে, ‘সময় সব ব্যথা ভুলিয়ে দেয়,’ আমার ক্ষেত্রেও তাই ঘটল। আমি ধারণা করেছিলাম পেটারকে আমি ভুলে গিয়েছি, তার প্রতি আমার আর এতটুকুও টান নেই। তবু তার স্মৃতি আমার অবচেতন মনে খুব প্রবলভাবে থেকে গিয়েছিল; মাঝে মাঝে আমি নিজের কাছে কবুল করতাম যে, অন্য মেয়েগুলোকে আমি হিংসে করি; আর সেই জন্যেই হ্যারিকে আমার পছন্দ হত না। আজ সকালে আমি জানলাম, কিছুই বদলায়নি; বরং, বয়স আর বুদ্ধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার ভালবাসারও বৃদ্ধি ঘটেছে। এখন আমি বিলক্ষণ বুঝতে পারি, পেটার আমাকে খুকী মনে করত; কিন্তু ও আমাকে একেবারে ভুলে যাওয়ায় আমার মনে লেগেছিল। ওর মুখ এত স্পষ্ট দেখাচ্ছিল যে, এখন আমি এ বিষয়ে নিঃসন্দেহ যে, ও ছাড়া আর কেউ আমার কাছে টিকে থাকতে পারত না।
স্বপ্নটা দেখা অব্দি আমি যেন আর আমাতে নেই। আজ সকালে বাপির চুমো খাওয়ার সময় আমি তারস্বরে বলে উঠতে পারতাম–’ইস, তুমি যদি পেটার হতে!’ সারাক্ষণ আমার ধ্যানজ্ঞান হল সে আর আমি। সারাদিন মনে মনে আওড়াতে থাকলাম, ‘ও পেটেল, আমার আদরের পেটেল…!’
এখন কে আমার সহায় হবে? বেঁচে থেকে আমাকে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে হবে যখন আমি এখান থেকে বের হব তখন তিনি যেন এমন করেন যাতে পেটারের সঙ্গে আমার দেখা হয়; পেটার আমার দিকে তাকিয়ে আমার চোখে ভালবাসার লেখন পড়ে বলবে–’আনা গো, আগে জানলে কবে আমি তোমার কাছে চলে আসতাম!’
