‘মা-মণি’কে আমি প্রায়ই ও মা বলে ডাকি, যাতে কাছাকাছি ধ্বনি থেকে আমি মা সোনা’ বলার অনুভূতিটা পাই; তা থেকে আসে মা গো, সেটা যেন ‘মা-সোনা’রই অসম্পূর্ণ রূপ; ‘সোনা’ যোগ করে আমি তাকে কত সম্মানিত করতে চাই, কিন্তু হলে কী হবে, উনি সে সব বোঝেন না। এটা ভালো, কেননা জানলে উনি অসুখী হতেন।
এই প্রসঙ্গে যথেষ্ট হল, লেখার ফলে ‘দুঃখের রসাতলে’র ভাব কিছুটা কেটে গেছে।
তোমার আনা।
.
সোমবার, ২৭ ডিসেম্বর, ১৯৪৩
আদরের কিটি,
শুক্রবার সন্ধ্যেবেলা জীবনে এই প্রথম বড়দিনে কিছু পেলাম। কুপহুইস, ক্রালার আর মেয়ের দল আবার মনোরম চমক লাগিয়েছেন। মিপ একটা ভারি সুন্দর বড়দিনের কেক বানিয়েছিলেন, তাতে লেখা ‘শান্তি ১৯৪৪’। এলি দিয়েছিলেন যুদ্ধের আগে যে রকম ভালো মিষ্টি বিস্কুট পাওয়া যেত সেই রকম বিস্কুট এক পাউণ্ড। পেটার, মারগট আর আমার জন্যে এক বোতল দই আর বড়দের প্রত্যেকের জন্যে এক বোতল করে বীয়ার। প্রত্যেকটি জিনিস সুন্দর ভাবে সাজানো ছিল এবং বিভিন্ন প্যাকেটের ওপর ছবি সাটা ছিল। এ বারে বড়দিন এত তাড়াতাড়ি চলে গেল যে আমাদের বুঝতেই দিল না।
তোমার আনা।
.
বুধবার, ২৯ ডিসেম্বর, ১৯৪৩
আদরের কিটি,
কাল সন্ধ্যেবলায় আবার মনটা খুব খারাপ হয়েছির। ঠাকুমা আর লিসির কথা আমার মনে পড়ে গিয়েছিল। দিদু, ও আমার দিদু, কী কষ্ট পেয়েছিলেন! কী ভালো ছিলেন! আমরা তার কতটুকু বুঝেছিলাম। এসব ছাড়াও, সারাক্ষণ তিনি অন্যের কাছ থেকে সযত্নে গোপন করে রেখেছিলেন একটি ভয়ঙ্কর জিনিস (একটি গুরুতর আন্ত্রিক ব্যাধি)।
দিদু ছিলেন বরাবর কত অনুগত, কত ভালো একজন মানুষ; আমাদের একজনকেও কখনও তিনি বিপদে পড়তে দেননি। আমি যাই করি, যত দুটুই হই–দিদু সব সময় আমার পাশে দাঁড়াতেন।
দিদু, তুমি কি আমাকে ভালবাসতে, নাকি তুমিও আমাকে বুঝতে পারোনি? আমি জানি না। কেউ কখনও দিদুকে নিজেদের বিষয়ে কথা বলেনি। দিদু নিশ্চয়ই নিজেকে খুব নিঃসঙ্গ বোধ করতেন, আমরা থাকা সত্ত্বেও তিনি কত একা ছিলেন। বহুজনে ভালবাসলেও একজন নিঃসঙ্গ বোধ করতে পারেন, কেননা তিনি তো কারো কাছেই এক এবং একমাত্র নন।
আর লিস্, এখনও কি সে বেঁচে আছে? কী করছে সে? হে সৃষ্টিকর্তা, তুমি লিকে দেখো, তাকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে এনো। লিস, আমি সবসময় তোমার মধ্যে দেখি আমার কপালে যা ঘটতে পারত, আমি তোমার জায়গায় নিজেকে রেখে দেখে থাকি। এখানে যা ঘটে তা নিয়ে কেন তবে আমি প্রায়ই মন খারাপ করি? যে সময়ে আমি তার এবং তার সঙ্গীদের বিপদের কথা ভাবি, তখন ছাড়া অন্য সবসময়ে আমার কি আনন্দিত, সন্তুষ্ট আর। সুখী হওয়া উচিত নয়? আমি স্বার্থপর আর ভীতু। কেন আমি সব সময় সাংঘাতিক সাংঘাতিক দুঃস্বপ্ন আর বিভীষিকা দেখি–কখনও কখনও আমি ভয়ে আর্তনাদ করে উঠতে চাই। কারণ, এখনও এত কিছু সত্ত্বেও, ঈশ্বরে আমার যথেষ্ট বিশ্বাস নেই। আমাকে তিনি কত কিছু দিয়েছেন–আমি যা পাবার অধিকারী নই তবু আমি প্রতিদিন কত কিছু করি করা ঠিক নয়। তুমি যদি তোমার স্বজাতীয় মানুষজনের কথা ভাবো, তোমার তাহলে ডাক ছেড়ে কাদতে ইচ্ছা করবে, সারাদিন কেঁদেও তুমি কুল পাবে না। একটাই করবার আছে, সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করা–তিনি এমন অলৌকিক কিছু করুন যাতে তাদের কেউ কেউ বেঁচে থাকে। সেটাই আমি করছি–এই আমার আশা।
তোমার আনা।
০৫. ডায়রির কিছু কিছু পাতা
রবিবার, ২ জানুয়ারি, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
আজ সকালে কিছু করবার না থাকায় আমার ডায়রির কিছু কিছু পাতা উল্টাচ্ছিলাম। বেশ কয়েবার চোখে পড়ল ‘মা-মণি’র বিষয়ে লেখা চিঠিগুলো এমন মাথা গরম করে চিঠিগুলো লেখা হয়েছে যে, আমি পড়ে রীতিমত স্তম্ভিত হয়ে নিজেকে প্রশ্ন করলাম—‘আনা, ঘৃণার কথা এই যে বলেছো এ কি প্রকৃতই তুমি? ইস্, এ তুমি কী করে পারলে, আনা?’ খোলা পাতা সামনে নিয়ে বসে আছি। এ বিষয়ে ভাবছিলাম যে, কী করে আমার মধ্যে এ রকম ক্রোধ উপচে পড়ল এবং সত্যিই ঘৃণার মতন এমন জিনিসে মন ভরে উঠল যে, তোমাকে সব কিছু গোপনে না বলে পারলাম না। এক বছর আগের আনাকে আমি বুঝতে এবং তার অপরাধ মার্জনা করতে চেষ্টা করছি, কেননা কিভাবে তা ঘটল সেটা পেছনে তাকিয়ে যতক্ষণ না ব্যাখ্যা করতে পারছি, ততক্ষণ এইসব অভিযোগ তোমার কাছে ফেলে রেখে আমার বিবেক শান্তি পাবে না।
আমার মনের অবস্থা হয়েছিল যেন (বলতে গেলে) ডুবে যাওয়ার মতন। ফলে, সবকিছু আমি শুধু নিজেকে দিয়ে দেখছিলাম; আমি অন্যপক্ষের কথাগুলো নির্বিকারচিত্তে বিচার করতে পারিনি; মাথা গরম করে মেজাজ দেখিয়ে যাদের আমি চটিয়েছি কিংবা মনে আঘাত দিয়েছি, সেইভাবে তাদের কথার আমি জবাব দিতে পারিনি।
নিজের মধ্যে আমি নিজেকে আড়াল করেছি, শুধুমাত্র নিজেরটা দেখেছি আর আমার ডায়রিতে চুপচাপ লিখে রেখেছি আমার যত সুখ-দুঃখ আর ঘৃণার কথা। আমার কাছে এই ডায়রির অনেক মূল্য, কেননা অনেক জায়গায় এই ডায়রি হয়ে উঠেছে আমার স্মৃতিকথার বই, কিন্তু বেশ অনেক পৃষ্ঠাতেই আমি লিখে দিতে পারতাম ‘অতীতের কথা চুকেবুকে গেছে।’
এক সময়ে আমি মা-মণির ওপর প্রচণ্ড রেগে যেতাম, এখনও মাঝে মাঝে রেগে যাই। মা-মণি আমাকে বোঝেন না এটা ঠিক, কিন্তু আমিও তো ওঁকে বুঝি না। আমাকে তিনি ভালবাসতেন খুবই, স্নেহের ঘাটতি ছিল না, কিন্তু আমার দরুন এত রকমের অপ্রীতিকর অবস্থায় ওকে পড়তে হয়েছে, সেইসঙ্গে অন্যান্য দুশ্চিন্তা আর মুশকিলের জন্যে ওঁকে এমন ভয়ে ভয়ে থাকতে হত এবং ওঁর মেজাজ এমন তিরিক্ষে হয়ে থাকত যে, এটা স্পষ্ট বোঝাই যায় কেন উনি আমাকে দাতঝাড়া দিতেন।
