এভাবে কি সত্যিই কেউ ভালো হয়ে উঠতে পারে? সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক ব্যাপার হয় তখনই, যখন মিস্টার ডুসেল ভাবেন যে তিনি ডাক্তারি করবেন; উনি এসে আমার খালি গায়ে বুকের ওপর তার মাথা রাখবেন, যাতে ভেতরকার শব্দ শোনা যায়।
একে তো ওর চুলের দরুন ‘অসহ্য রকমের সুড়সুড়ি লাগে, তার ওপর মরমে মরে যাই হোক না, কবে তিরিশ বছর আগে উনি মেডিকেল পড়েছিলেন এবং ওঁর একটা ডাক্তার খেতাব আছে। ভদ্রলোক এসে কেন আমার বুকের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়বেন। আর যাই হোক, উনি তো আমার প্রেমিক নন! আর তাছাড়া, আমার ভেতরটা সুস্থ, না অসুস্থ উনি তো তার আওয়াজও পাবেন না; দিন দিন উনি যে রকম ভয়াবহ ধরনের কম শুনছেন, তাতে আগে তো ওঁর কানের ভেতরেই নল ঢোকানো দরকার।
ঢের হয়েছে, অসুখের কথা থাক। আমি আবার পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছি, লম্বা হয়েছি আরও এক সেন্টিমিটার, ওজন বেড়েছে দুই পাউণ্ড, রং হয়েছে ফ্যাকাসে, সেই সঙ্গে জ্ঞানলাভের সত্যিকার স্পৃহা বেড়ে গেছে।
তোমাকে দেবার মত খুব বেশি খবর নেই। এখন আর আগের মত নয়, আমরা সবাই মিলেমিশে আছি। ঝগড়াঝাটি নেই–অন্তত ছ’মাস ধরে এখানে বিরাজ করছে একটানা শান্তি। আগে কখনও এমন হয়নি। এলি এখনও আমাদের কাছ ছাড়া।
আমরা বড়দিনের জন্যে বাড়তি তেল, মিষ্টি আর সিরাপ পেয়েছি; প্রধান উপহার’ হল একটা ক্ৰচ–আড়াই সেন্টের মুদ্রা দিয়ে তৈরি সুন্দর ঝকঝকে দেখতে। যাই হোক, জিনিসটা এত ভালো যে, ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
মা-মণিকে আর মিসেস ফান ডানকে মিস্টার ডুসেল একটা চমৎকার কেক দিয়েছেন; উনি মিপকে দিয়ে কেকটা তৈরি করিয়েছেন। মিপ আর এলির জন্যে আমিও কিছু জিনিস রেখেছি। আমার পরিজ থেকে, বুঝলে, অন্তত ছমাস ধরে আমি চিনি বাঁচিয়েছি; কুপহুইসের সাহায্যে তাই দিয়ে আমি মিঠাই বানিয়ে নেব।
বিশ্রী বাদুলে আবহাওয়া, উনুনে সোঁদা গন্ধ, প্রত্যেকের পেটের মধ্যে খাবার গ্যাজ গ্যাজ করছে, তার ফলে চারদিকে মেঘ-ডাকা আওয়াজ। যুদ্ধ এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে আছে, মনোবলের অবস্থা যাচ্ছেতাই।
তোমার আনা।
.
শুক্রবার, ২৪ ডিসেম্বর, ১৯৪৩
আদরের কিটি,
আগেই লিখেছি এখানকার আবহাওয়ায় আমরা কতটা আক্রান্ত হচ্ছি; আমি মনে করি আমার ক্ষেত্রে এই অসুবিধে ইদানীং আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
‘হিমেলহোখ ইয়াউখুসেণ্ড ইৎসুম টোডা বেটরুট (গয়টের বিখ্যাত পঙক্তি–সুখের। স্বর্গে নয় দুঃখের রসাতলে’) এটা রীতিমত এখানে খাপ খায়। আমি যখন অন্য ইহুদী ছেলেমেয়েদের সঙ্গে তুলনা করে শুধু নিজেদের সৌভাগ্যের কথা ভাবি তখন মনে হয় আমি আছি সুখের স্বর্গে’; আর ‘দুঃখের রসাতলে আছি মনে হয় যখন, যেমন আজকে, মিসেস কুপহুইস এসে বলছিলেন তার মেয়ে করি-র হকি ক্লাব, ডোঙায় করে জলযাত্রা, থিয়েটার করা আর সেই সঙ্গে তার বন্ধুদের কথা। এটা নয় যে করিকে আমি হিংসে করি, আসলে আমার খুব ইচ্ছে হয় একবার প্রচুর আনন্দ করি এবং হাসতে হাসতে যেন পেটে খিল ধরে যায়। বিশেষ করে বড়দিন আর নববর্ষের এই ছুটির মরসুম আর এখন কিনা আমরা এখানে আটক হয়ে আছি একঘরের মতন।
তবু এটা আমার লেখা উচিত নয়, কেননা তাতে মনে হবে আমি অকৃতজ্ঞ এবং অবশ্যই আমি তিলকে তাল করছি। এ সত্ত্বেও, আমাকে তুমি যাই ভাবো, আমি সব কিছু চেপে রাখতে পারি না, সুতরাং আমি তোমাকে মনে করিয়ে দেব আমার সেই গোড়ার কথাগুলো; ‘কাগজের সবই সয়।’
যখন কামাকাপড়ে হাওয়া আর মুখগুলোতে হিম লাগিয়ে লোকে বাইরে থেকে আসে, তখন কবে আমরা খোলা হাওয়ার গন্ধ নেবার সুযোগ পাব?’–এই ভাবনা মনে যাতে উদয় হয় তার জন্যে কম্বলে মুখ গুঁজে রাখতে পারি। আর যেহেতু আমি কম্বলে মুখ তো পুঁজবই, বরং করব তার উল্টো আমাকে মাথা উঁচু রাখতেই হবে, সাহসে বুক বাঁধতে হবে, ভাবনাগুলো আসবে একবার নয়, আসবে অসংখ্যবার।
বিশ্বাস করো, যদি তুমি দেড় বছর ধরে আটক থাকো, কখনও কখনও তোমার তা অসহ্য বলে মনে হবে। সুবিচার আর কৃতজ্ঞতা সত্ত্বেও, তোমার অনুভূতিগুলোকে তুমি পিষে মারতে পারো না। সাইকেল চালানো, নাচা, শিস্ দেওয়া, পুথিবীকে চোখ মেলে দেখা, তারুণ্যকে অনুভব করা–আমি তার জন্যে মরে যাই; তবু বাইরে এটা প্রকাশ করা চলবে না, কেননা সময় সময় আমি ভাবি যদি আমরা আটজন সবাই নিজেদের নিয়ে খেদ করতে থাকি আমরা হাঁড়িমুখ করে ঘুরে বেড়াই, তাতে আমাদের কী দশা হবে?
মাঝে মাঝে আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করি, ‘আমি একজন কাঁচা বয়সের মেয়ে, কিছুটা হাসিখেলা আমার না হলেই নয়–এটা কি ইহুদী বা ইহুদী নয় যারা, তারা কি অনুধাবন করতে পারে?’ আমি জানি না; এ কথা কাউকে বলতেও পারিনি, কারণ আমি জানি করতে গেলে আমি কান্নায় ভেঙে পড়ব। কাঁদলে বুকটা কী যে হালকা হয়।
আমার সব তত্ত্বজ্ঞান এবং আমার শত চেষ্টা সত্ত্বেও প্রতিদিন আমার মনে হয় এমন। একজন সত্যিকার জননী নেই–যিনি আমার এবং আমাকে বুঝতে পারেন। তাই যাই করি। আর যাই লিখি, আমি সেই মা-সোনার কথা ভাবি যা আমি পরে আমার সন্তানদের ক্ষেত্রে হতে চাই। সেই ‘মা-সোনা’, যিনি সাধারণ কথাবার্তায় যা বলা হয় তার সব কিছুতেই অতখানি গুরুত্ব দেবেন না, অথচ যিনি আমার কথাগুলো নিশ্চয়ই গুরুত্ব দিয়ে শুনবেন। কী করে তা বলতে পারব না, তবে আমি লক্ষ্য করেছি মা-সোনা’ কথার মধ্যেই সব কিছু বলা আছে। জানো আমি কী খুঁজে পেয়েছি?
