আমি সে জিনিসটাতে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিতাম, মনে মনে ক্ষুণ্ণ হতাম এবং মা-মণির প্রতি রূঢ় ব্যবহার করে তাকে আরও চটিয়ে দিতাম; এই সবের ফলে আবার মা-মণির মন। খারাপ হত। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে সমস্ত সময় এটা হত অশান্তি আর দুঃখকষ্টের ঘাত প্রতিঘাত। দুজনের কারো পক্ষেই সেটা ভালো ছিল না, তবে সেটা কেটে যাচ্ছে।
আমি এসব সম্পর্কে চোখ বুজে থেকে নিজের মনে অসম্ভব দুঃখ পেয়েছি। তবে তারও মানে বোঝা যায়। খুব রাগ হলে সাধারণ জীবনে আমরা বদ্ধ ঘরে বার দুই দুম দুম করে পা ঠুকে কিংবা আড়ালে মা-মণিকে এটা-ওটা বলে গায়ের ঝাল ঝেড়ে নিতে পারি–কাগজে ঐ রকম চড়াগলায় চোটপাটের ব্যাপারটাও তাই।
আমার জন্যে মা-মণির চোখের পানি ফেলার পর্যায় শেষ হয়ে গেছে। আগের চেয়ে এখন আমার জ্ঞানবুদ্ধি বেড়েছে, মা-মণিও এখন আগের মত একটুতেই চটে যান না। বিরক্ত হলে আমি সাধারণত মুখ বুঝে থাকি, মা-মণিও তাই করেন; কাজেই লোকে দেখে, আমরা দুজনে আগের চেয়ে ঢের বেশি মানিয়ে চলছি। পরাধীন শিশুর মত করে মা-মণিকে আমি সত্যি ভালবাসতে পারি না। আমার মধ্যে সে ভাব আদৌ নেই।
মনে মনে এই বলে আমি আমার বিবেককে শান্ত করি যে, মা-মণি তার হৃদয়ে বহন করার চেয়ে কড়া কথাগুলো কাগজে থেকে যাওয়াই ভালো।
তোমার আনা।
.
বুধবার, ৫ জানুয়ারি, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
আজ আমি তোমার কাছে দুটো জিনিস কবুল করব। তাতে বেশ খানিকটা সময় লাগবে। কাউকে আমায় বলতেই হবে, সেদিক থেকে তোমাকে বলাই সবচেয়ে ভালো। কেননা যতদূর জানি, যে অবস্থাই আসুক, তুমি সব সময় গোপন কথা রক্ষা করো।
প্রথমটা মা-মণিকে নিয়ে। তুমি জানো, মা-মণির ব্যাপারে আমি প্রচুর গজগজ করেছি তবু নতুন করে আমি চেষ্টা করেছি তার মন পেতে। আজ হঠাৎ আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি তার মধ্যে কিসের অভাব। মা-মণি নিজেই আমাদের বলেছেন যে, আমাদের তিনি মেয়ের চেয়ে বেশি করে বন্ধু হিসেবে দেখেন। তা সে সব খুব ভালো কথা। কিন্তু তবু মায়ের স্থান কখনও বন্ধু নিতে পারে না।
আমি একান্তভাবে চাই আমার মা হবেন এমন এক আদর্শ–যাকে আমি অনুসরণ করতে পারি, আমি চাই যাতে তাকে আমি ভক্তিশ্রদ্ধা করতে পারি। আমার মনে হয়, মারগট এসব জিনিস অন্য ভাবে দেখে এবং আমি তোমাকে যা বললাম ও কখনই তা অনুধাবন করতে পারবে না। আর বাপি তো মা-মণির ব্যাপারে কোনো রকম বাদানুবাদে যেতে রাজী নন।
আমার ধারণায়, মা হবেন এমন একজন স্ত্রীলোক বিশেষত নিজেরই সন্তানদের ব্যাপারে যিনি প্রথমত যথেষ্ট বিবেচনার পরিচয় দেবেন— যখন তারা আমাদের বয়সে পৌঁছবে এবং আমি চেঁচামেচি করলে–ব্যথায় নয়, অন্য সব ব্যাপারে–উনি তা নিয়ে আমাকে ঠাট্টা করবেন না, মা-মনি যা করে থাকেন।
আমি কখনই ভুলতে পারিনি তার একটা জিনিস, যেটা হয়ত খানিকটা বোকামি বলে মনে হবে। আমাকে একদিন দাঁতের ডাক্তারের কাছে যেতে হয়েছিল।
মারগটকে নিয়ে মা-মণি যাচ্ছিলেন আমার সঙ্গে; আমি সাইকেল নিয়ে যাব বলতে ওঁরা রাজী হলেন। দাঁতের ডাক্তার সেরে, যখন আমরা বাইরে বেরোলাম–মারগট আর মা-মণি বললেন ওরা শহরের বাজারে যাবেন কী একটা জিনিস দেখতে কিংবা কিছু একটা কিনতে ঠিক কী জন্যে আমার মনে নেই।
আমিও যেতে চাইলে ওঁরা আমাকে নিয়ে যেতে রাজী হলেন না। কেননা আমার সঙ্গে সাইকেল ছিল। রাগে আমার চোখ ফেটে পানি বেরিয়ে এল; তাই দেখে মারগট আর মা মণি আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করতে লাগলেন। তাতে আমি প্রচণ্ড রেগে গিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ওদের জিভ ভেঙাতে লাগলাম–ঠিক সেই সময় এক বৃদ্ধা সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন, আমার কাণ্ড দেখে তার চক্ষু ছানাবড়া! সাইকেল করে বাড়ি ফিরে এসে, আমার মনে আছে, আমি অনেকক্ষণ ধরে কেঁদেছিলাম।
সেদিন বিকেলে কী ভীষণ রেগে গিয়েছিলাম, এটা যখন ভাবি, আশ্চর্য, আমার প্রাণে মা-মণির দুঃখ দেয়া ব্যাপারটা এখনও বুকের মধ্যে খচখচ করে। দ্বিতীয় জিনিসটা তোমার কাছে ব্যক্ত করা খুব কঠিন, কেননা ব্যাপারটা আমার নিজেকে নিয়ে।
লজ্জায় লাল হওয়ার বিষয়ে মিস্ হেপ্টারের লেখা একটা প্রবন্ধ পড়লাম কাল। প্রবন্ধটা ব্যক্তিগত ভাবে আমার উদ্দেশ্যে লেখা হতে পারত।
যদিও খুব সহজে আমি লজ্জায় লাল হই না, তাহলেও প্রবন্ধের অন্যান্য জিনিস আমার ক্ষেত্রে সমস্তই খাপ খেয়ে যায়। ভদ্রমহিলা যা লিখেছেন মোটামুটি ভাবে তা এই রকম বয়ঃসন্ধির বছরগুলোতে মেয়েরা ভেতরে ভেতরে চুপচাপ হয়ে পড়ে এবং তাদের শরীরে যে অবাক কাণ্ড ঘটছে তাই নিয়ে ভাবতে থাকে।
আমিও দেখছি তা ঘটছে এবং সেই জন্যে মারগট, মা-মণি আর বাপির ব্যাপারে ইদানীং আমি কেমন যেন সঙ্কোচ বোধ করছি। মজার বিষয়, আমার চেয়ে মারগট অত যে লাজুক, ও কিন্তু আদৌ সঙ্কোচ বোধ করে না।
আমার যেটা হচ্ছে আমি মনে করি সে এক অদ্ভুত ব্যাপার, এবং শুধু যে শরীরে তা ফুটে উঠেছে তাই নয়, আমার ভেতরেও তার যাবতীয় ক্রিয়া চলেছে। নিজের বিষয়ে কিংবা এর একটা কিছু নিয়েও কারো সঙ্গে আমি আলোচনা করি না; সেইজন্যে এই সব প্রসঙ্গ নিয়ে আমাকে নিজের সঙ্গে কথা বলতে হবে।
প্রত্যেকবার যখনই আমার মাসিক হয়–এটা হয়েছে মোটে তিন বার সমস্ত ব্যথা, অস্বস্তি এবং কদর্যতা সত্ত্বেও, আমার কেমন যেন মনে হয় আমার একটা মধুর রহস্য আছে, তাই একদিক থেকে দেখলে এটা আমার কাছে নিছক একটা উৎপাত হওয়া সত্ত্বেও, আমি বারবার সেই সময়টার জন্যে উন্মুখ হয়ে থাকি যখন আমার মধ্যে আমি আবার অনুভব করব সেই রহস্য।
