আমি কেবল লিসকে দেখেছি; অন্য কাউকে নয়; এখন আমি এর অর্থ বুঝতে পারছি। আমি ওকে বিচার করেছিলাম ভুলভাবে; আমি তখন খুব ছোট বলে ওর মুশকিলগুলো বুঝিনি। ওর তখন এক নতুন মেয়ে-বন্ধুর ওপর খুব টান এবং ওর এটা মনে হয়েছিল যে, আমি যেন তাকে ওর কাছছাড়া করতে চাইছি। বেচারার মনে কতটা লেগেছিল আমি জানি; আমি নিজেকে দিয়ে জানি মনের অবস্থা কেমন হয়।
কখনও কখনও এক ঝলকে তার জীবনের কোনো কিছু আমার চোখে ভেসে উঠেছে, পরক্ষণেই স্বার্থপরের মত আমি আমার নিজস্ব সুখস্বাচ্ছন্দ্য আর সমস্যার মধ্যে ডুবে গিয়েছি। আমি তার প্রতি যে ব্যবহার করেছি তা খুবই খারাপ এবং এখন সে ফ্যাকাসে মুখে আর করুণ দৃষ্টিতে কী অসহায়ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। শুধু আমি যদি তাকে সাহায্য করতে পারতাম। হে সৃষ্টিকর্তা, আমি যা ইচ্ছে করি তাই আমি পাই, আর ও বেচারা কী সাংঘাতিক নিয়তির ফেরে পড়েছে। আমি তো ওর চেয়ে বেশি পুণ্য করিনি; লিসও তো চেয়েছিল ন্যায়ের পথে থাকতে। তবে কেন আমার ভবিতব্য হল বেঁচে থাকা আর ওর সম্ভবত মৃত্যু? আমাদের মধ্যে কী তফাত ছিল? আজ কেনই বা আমরা পরস্পর থেকে এতটা দূরে?
স্বীকার করছি, কত যে মাস; হ্যাঁ, তা প্রায় একটা বছর, আমি তার কথা ভাবিনি। সম্পূর্ণ যে ভুলেছিলাম তা নয়। তবে দুঃখে ভেঙে পড়া অবস্থায় তাকে দেখার আগে তার কথা এভাবে কখনও ভাবিনি।
ও লিস্, যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত যদি তুই বেঁচে থাকিস, আবার আমাদের মধ্যে ফিরে আসবি; আমি তখন আবার তোকে কাছে টেনে নেব; তোর প্রতি যে অন্যায় করেছি আমি কোনো না কোনোভাবে সেই দোষ স্খলন করব।
তবে আমি যখন তাকে সাহায্য করতে সক্ষম হব, তখন হয়ত আজকের মত এত চরমভাবে সাহায্যের তার দরকার হবে না। আমার জানতে ইচ্ছে করে, লিস্ কি আমার কথা ভাবে? ভাবলে, ওর মনের মধ্যে কি রকম হয়?
হে মঙ্গলময় প্রভু, ওকে তুমি রক্ষা করো, ও যাতে অন্তত নিঃসঙ্গ না হয়। প্রভু, ওকে দয়া করে একটু বলো আমি প্রীতি আর সমবেদনার সঙ্গে ওর কথা ভাবি, তাতে হয়ত ওর সহ্যশক্তি আরও বাড়বে।
আমি আর এ নিয়ে ভাবব না, কেননা ভেবে কোনো লাভ নেই। আমার সামনে সারাক্ষণ ভাসতে থাকে তার দুটো ড্যাবডেবে চোখ, আমি কিছুতেই তা থেকে নিজেকে সরাতে পারি না। যে জিনিস তার ঘাড়ে এসে পড়েছে, সেটা ছাড়াও আমার জানতে ইচ্ছে করে, নিজের ওপর সত্যিকার ভরসা আছে তো তার?
আমি সেসব জানি না, কোনোদিন স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে জিজ্ঞেস পর্যন্ত করিনি।
লিস, লিস, শুধু আমি যদি তোকে তুলে আনতে পারতাম, যদি তোর সঙ্গে আমার সব সুখস্বাচ্ছন্দ্য ভাগ করে নিতে পারতাম। আমি নিরুপায়, অনেক দেরি হয়ে গেছে কিংবা আমি যে ভুল করেছি এখন তা ঠিক করে নেওয়ার কোনো উপায় নেই। কিন্তু আমি আর কখনো তাকে ভুলছি না, আমি সর্বক্ষণ তার জন্যে প্রার্থনা করব।
তোমার আনা।
.
সোমবার, ৬ ডিসেম্বর, ১৯৪৩
আদরের কিটি,
সেন্ট নিকোলাস ডে যখন আসন্ন, তখন আমাদের সকলেরই মনের মধ্যে জেগে উঠেছিল গত বছরের সেই সুন্দর করে সাজানো ঝুড়িটার কথা; বিশেষ করে আমার মনে হল, এ বছর কিছুই না করলে খুব বাজে লাগবে। এই নিয়ে অনেক ভেবে ভেবে শেষ পর্যন্ত একটা জিনিস আমার মাথায় এল, তাতে বেশ মজাই হবে।
পিমের সঙ্গে আমি এ নিয়ে কথা বললাম। এক সপ্তাহ আগে প্রত্যেকের জন্যে আমরা একটি করে ছোট্ট পদ্য লেখা শুরু করেছিলাম।
রবিবার সন্ধ্যেবেলায় পৌনে আটটা নাগাদ ময়লা কাপড় রাখার বড় ঝুড়িটা ধরাধরি করে ওপরতলায় আমরা হাজির হলাম। তার গায়ে ছোট ছোট মূর্তি আঁকা আর সেই সঙ্গে গিট বাধা নীল আর গোলাপী কার্বন কাগজ। একটা বড় বালির কাগজ দিয়ে ঝুড়িটা ঢাকা, তাতে আলপিন দিয়ে গাঁথা একটা চিঠি। আজব গাটরির আকার দেখে সবাই বেশ অবাক।
বালির কাগজ থেকে চিঠিটা বের করে নিয়ে আমি পড়তে থাকি :
সান্টা ক্লজের পুনরাগমন
তা বলে নয় কো আগের মতন
গতবার হয়েছিল যত ভালো
হবে না এবার তত জমকালো।
তখন যে ছিল উজ্জ্বল আশা
ভবিষ্যৎকে মনে হত খাসা,
স্বাগত জানাব ভাবেই নি কেউ
সান্টাকে পুনরপি এবারেও।
হাত খালি, কিছু নেইকো দেবার
তবুও জাগাব আত্মাকে তাঁর,
ভেবে ভেবে বের করা গেছে কিছু
যে যার জুতায় দেখ হয়ে নিচু।
ঝুড়ি থেকে যার যার জুতো বের করে নিতেই প্রত্যেকের সে কী হো হো করে হাসি। প্রত্যেকটি জুতোর মধ্যে কাগজের একটি ছোট মোড়ক, তাতে জুতোর মালিকের ঠিকানা লেখা।
তোমার আনা।
.
বুধবার, ২২ ডিসেম্বর, ১৯৪৩
আদরের কিটি,
এমন খারাপ ধরনের ফ্লু হয়েছিল যে, এর মধ্যে আর তোমাকে লিখে উঠতে পারিনি। এই জায়গায় অসুখে পড়লে ভোগান্তির একশেষ। একবার, দুবার, তিনবার–কাশতে হলেও আমাকে কম্বলের তলায় গিয়ে দেখতে হবে যেন আওয়াজ বাইরে না যায়। সাধারণত এর একমাত্র ফল হয় এই যে, সারাক্ষণ গলা সুড়সুড় করে; তখন দূধ আর মধু, চিনি কিংবা লজেন্সের শরণাপন্ন হতে হয়।
যে পরিমাণ দাওয়াই আমার ওপর চাপানো হয়েছে ভাবলে মাথা ঘুরে যায়। গা দিয়ে ঘাম বের করা, গরম সেঁক, বুকে জলপট্টি, বুকে শুকনো পট্টি, গরম পানীয়, গার্গ করা, গলায় বেল্ট লাগানো, চুপচাপ শুয়ে থাকা, বাড়তি উষ্ণতার জন্যে কুশন, গরম পানির বোতল, লেমন স্কোয়াশ, এবং তার ওপর, দু ঘণ্টা পর পর থার্মোমিটার।
