আমার তেরো বহুরে ফাউন্টেন পেনটি আমাদের সঙ্গে এসে উঠল ‘গুপ্ত মহলে’ সেখানে সে আমার হয়ে অসংখ্য ডায়রি আর রচনার ভেতর দিয়ে সজোরে ছুটেছে।
এখন আমার বয়স চৌদ্দ; আমাদের শেষ বছরটা আমরা একসঙ্গে কাটিয়েছি।
সেদিন ছিল শুক্রবার বিকেল পাঁচটা বেজে গিয়েছিল। আমি আমার ঘর থেকে বেরিয়ে লিখবার জন্যে টেবিলে বসতে যাব, এমন সময় আমাকে একপাশে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বাপিকে নিয়ে আমার জায়গায় গিয়ে বসল মারগট। ওরা ‘লাটিন’ নিয়ে রেওয়াজ করবে। টেবিলে ফাউন্টেন পেনটা বেকার পড়ে রইল আর তার মালিক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাধ্য হয়ে টেবিলের ছোট্ট একটা কোণে বসে বিগুলো ডলতে আরম্ভ করল। ‘বি ডলা’ বলতে ছাতা পড়া বিগুলোকে ফের চকচকে করে তোলা। পৌনে ছ’টার সময় মেঝে ঝাট দিয়ে খারাপ বিসুদ্ধ জঞ্জালগুলো খবরের কাগজে মুড়ে উনুনে বিসর্জন করলাম। সঙ্গে সঙ্গে জিনিসটা দাউ দাউ করে জ্বলে উঠতে দেখে আমার ভালই লাগল। কেননা আমি ভাবিনি যে প্রায় নিভন্ত আগুনে জিনিসটা ওরকম দপ করে জ্বলে উঠবে। এরপর আবার সব চুপচাপ, ‘লাটিন পড়ুয়াদের অনুশীলন শেষ, তারপর আমি টেবিলে গিয়ে বসে লেখার জিনিসগুলো গোছগাছ করতে শুরু করে দিলাম। কিন্তু এদিক-ওদিক তাকিয়ে কোথাও আমার ফাউন্টেন পেনটা দেখতে পেলাম না। আরও একবার খোঁজাখুঁজি করলাম, মারগটও খুঁজল, কিন্তু কোথাও আমার ফাউন্টেন পেনের হদিশ করতে পারলাম না। না তা হতেই পারে না! সেদিন সন্ধ্যেবেলায় ফাউন্টেন পেনটা না পেয়ে আমরা সবাই ধরে নিলাম যে, এটা নিশ্চয়ই আগুনে পুড়েছে, আরও এই কারণে যে সেলুলয়েড জিনিসটা সাংঘাতিক রকমের দাহ্য।
পরে আমাদের মন-খারাপ-করা ভয়টাই সত্যি বলে প্রমাণ হল; পরদিন সকালে উনুন পরিষ্কার করতে গিয়ে ছাইয়ের মধ্যে বাপি পেন আটকানোর ক্লিপটা দেখতে পেলেন। সোনার নিবটার কোনো পাত্তা পাওয়া গেল না। বাপির ধারণা–ওটা নিশ্চয় আগুনে গলে গিয়ে পাথরে বা আর কিছুতে সেঁটে গেছে।’
খুব ক্ষীণ হলেও আমার একমাত্র সান্ত্বনা ও কলমটির সত্ত্বার হয়েছে, ঠিক আমি যা পরে এক সময়ে চাই!
তোমার আনা।
.
বুধবার, ১৭ নভেম্বর, ১৯৪৩
আদরের কিটি,
এমন সব ঘটনা ঘটছে যে আমাদের মাথায় হাত। এলির বাড়িতে ডিপৃথিরিয়া, ফলে ছ’সপ্তাহ ধরে আমাদের এখানে ওঁর আসা বন্ধ। খাবার-দাবার আর কেনাকাটার ব্যাপারে আমরা মহাফাঁপড়ে পড়েছি। তাছাড়া এলির সাহচর্য থেকে আমাদের বঞ্চিত হওয়া তো আছেই। কূপহুইস এখনও শয্যাগত এবং তিন সপ্তাহ ধরে ওঁর পথ্য বলতে শুধু পরিজু আর দুধ। ক্রালার নিশ্বাস ফেলার সময় পাচ্ছেন না।
মারগট তার লাটিন অনুশীলনীগুলো ডাকে দেয়, একজন শিক্ষক সেসব সংশোধন করে ফেরত পাঠান। মারগট এটা করে এলির নামে। শিক্ষকটি চমৎকার মানুষ এবং সেই সঙ্গে তার রসবোধ আছে। অমন বুদ্ধিমতী ছাত্রী পেয়ে উনি নিশ্চয়ই খুব খুশী।
ডুসেল খুব ম্রিয়মাণ হয়ে আছেন, আমরা কেউই জানি না কেন। এটা শুরু হয় যখন দেখা গেল ওপরতলায় উনি একেবারেই মুখ খুলছেন না; মিস্টার এবং মিসেস ফান ডানের সঙ্গে ওঁর একেবারেই কথা নেই। এটা প্রত্যেকেরই নজরে পড়ে; দুদিন ধরে এটা চলবার পর মা-মণি তাকে সাবধান করে দিয়ে বলেন যে, উনি যদি এরকম করেন তাহলে মিসেস ফান ডান তার জীবন অতিষ্ঠ করে তুলতে পারেন। ডুসেল বলেন যে, মিস্টার ফান ডানই প্রথম তার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করেন এবং তিনি নিজে কিছুতেই আগ বাড়িয়ে কথা বলবেন না।
তোমাকে এখন বলা দরকার যে, গতকাল ছিল ষোলই নভেম্বর–ঐদিন ‘গুপ্ত মহলে’ ডুসেলের আসার এক বছর পূর্ণ হল। এই উপলক্ষে মা-মণি একটি গাছ উপহার পান, কিন্তু কিছুই পেলেন না মিসেস ফান ডান, যিনি গত কয়েক সপ্তাহ ধরে একথা গোপন করেননি যে, তাঁর মতে ডুসেলের উচিত আমাদের খাওয়ানো।
আমরা যে নিঃস্বার্থভাবে ডুসেলকে আমাদের মধ্যে নিয়েছি, তার জন্যে একদিন এই প্রথম ধন্যবাদ জ্ঞাপন করা দুরের কথা, সে প্রসঙ্গে তিনি একটিও কথা বললেন না। ষোল তারিখ সকালে আমি যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম যে, আমি অভিনন্দন জানাব, না শোক প্রকাশ করব–উনি তার উত্তরে বললেন–ওঁর কিছুতেই কিছু আসে যায় না। মা-মণি চেয়েছিলেন মধ্যস্থ হয়ে ব্যাপারটা মিটিয়ে দিতে, কিন্তু ওঁর পক্ষে এক পা-ও এগোনো সম্ভব হল না; শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা যে-কে সেই থেকে গেল।
ডের মান হাট আইনেন গ্রোসেন গাইস্ট
উণ্ড ইস্ট সো ক্লাইন ফন টাটেন।
(মানুষের মন দরাজ, কত ছোট তার কাজ)
তোমার আনা।
.
শনিবার, ২৭ নভেম্বর, ১৯৪৩
আদরের কিটি,
কাল রাত্তিরে ঘুমিয়ে পড়ার আগে হঠাৎ কে আমার চোখের সামনে এসে দাঁড়াল, বলো তো? লিস্! আমি দেখলাম শতচ্ছিন্ন বস্ত্রে জীর্ণ শীর্ণ মুখে সে আমার সামনে দাঁড়িয়ে। প্রকাণ্ড বড় বড় চোখ মেলে বিষণভাবে আর ভৎসনার দৃষ্টিতে আমার দিকে সে তাকিয়ে ছিল; যেন তার চোখ দিয়ে আমাকে সে বলছিল–’ওহে আনা, কেন আমাকে তুমি ত্যাগ করেছ? এই নরক থেকে তুমি আমাকে বাঁচাও, আমাকে টেনে তোলো!’
আমার তো তাকে সাহায্য করার ক্ষমতা নেই, আমি শুধু চেয়ে দেখতে পারি, অন্যরা কিভাবে কষ্ট পাচ্ছে আর মারা যাচ্ছে। তাকে আমাদের কাছে এনে দাও বলে আমি শুধু সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করতে পারি।
