আমিও যাতে নতুন কিছু লিখতে শুরু করতে পারি, বাপি কুপহুইসকে তার জন্যে একটি শিশুপাঠ্য বাইবেল আনতে বলেছেন; তাতে শেষ পর্যন্ত নিউ টেস্টামেন্ট সম্পর্কে আমি কিছুটা জানতে পারব। মারগট খানিকটা বিচলিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘খানুকার জন্যে আনাকে তোমরা বুঝি বাইবেল দেবে?’ বাপি জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, তা-সেন্ট নিকোলাস ডে হলে আরও ভালো হয় খানুকার (দ্রষ্টব্য–৭ ডিসেম্বর, ১৯৪২) সঙ্গে যীশু ঠিক চলে না।’
তোমার আনা।
.
সোমবার সন্ধ্যা, ৮ নভেম্বর, ১৯৪৩
আদরের কিটি,
তুমি যদি আমার চিঠির তাড়া একটার পর একটা পড়ো, তুমি নিশ্চয়ই দেখে অবাক হবে কত রকমারি মেজাজে চিঠিগুলো লেখা হয়েছে। এখানকার আবহাওয়ার ওপর আমি এত বেশি নির্ভরশীল যে, এতে আমার বিরক্তিই ধরে; তাই বলে আমি একা নই–আমাদের সকলেরই এক অবস্থা। কোনো বই যদি আমার মনে রেখাপাত করে, অন্য কারো সঙ্গে মেশবার আগে নিজেকে আমার শক্ত হাতে ধরে রাখতে হয়; তা নইলে ওরা ভাববে আমার মনটা কি রকম অদ্ভূত হয়ে আছে। এই মুহূর্তে তুমি হয়ত লক্ষ্য করে থাকবে, আমি একটু মনমরা হয়ে আছি। আমি তোমাকে এর কারণ বলতে পারব না, তবে আমার বিশ্বাস আমি ভীরু প্রকৃতির মানুষ বলে, এবং তাতেই আমি সারাক্ষণ ধাক্কা খাই।
আজ সন্ধ্যেবেলায়, এলি তখনও এখানে, দরজায় খুব জোরে অনেকক্ষণ ধরে তীক্ষ্ণস্বরে বেল বেজে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে আমি সাদা হয়ে গেলাম, আমার পেট ব্যথায় মোচড় দিয়ে উঠল আর বুক ধড়ফড় করতে লাগল–বিলকুল ভয়ে। রাত্তিরে বিছানায় শুয়ে আমি দেখি মা মণি নেই, বাপি নেই–এক অন্ধকার গুদামঘরে আমি একা। কখনও কখনও দেখি হয় রাস্তার ধার দিয়ে আমি ঘুরে বেড়াচ্ছি, নয় ‘গুপ্ত মহলে’ আগুন লেগেছে, নয় রাত্রে হানা দিয়ে ওরা। আমাদের নিয়ে চলেছে। যা কিছুই দেখি, মনে হয় বাস্তবিকই সেটা ঘটেছে; এ থেকে কেমন যেন আমার মনে হয় এ সমস্তই আমার ভাগ্যে অতি সত্ত্বর ঘটতে চলেছে। মিলু প্রায়ই বলে থাকেন আমাদের এখান এমন অনাবিল শান্তি দেখে ওঁর হিংসে হয়। সেটা হয়ত সত্যি, কিন্তু আমাদের তাবৎ ভয়ের কথা উনি হিসেবে আনেন না। আমি একদম ভাবতে পারি না পৃথিবীটা আবার কখনও আমাদের কাছে স্বাভাবিক হয়ে ধরা দেবে। আমি বলি বটে ‘যুদ্ধের পর’, কিন্তু সেটা শূন্যে সৌধ নির্মাণ মাত্র, যা কখনই বাস্তবে ঘটবে না। যখন পুরনো কথাগুলো মনে করি-আমাদের সেই বাড়ি, আমার মেয়ে বন্ধুরা, ইস্কুলের সেই মজাতখন মনে হয় সেসব আমার নয়, যেন অন্য কারো জীবনে ঘটেছে।
আমাদের গুপ্ত মহলে এই যে আমরা আটজন মানুষ আমি দেখি আমরা যেন ঘন কালো জলদ মেঘে এক ফালি ছোট্ট নীল আকাশ। যে গোলাকার সুনির্দিষ্ট জায়গায় আমরা দাঁড়িয়ে, এখনও তা বিপদসীমার বাইরে, কিন্তু চারদিক থেকে মেঘগুলো ক্রমশ আমাদের হেঁকে ধরছে এবং আসন্ন বিপদ থেকে আমাদের পৃথক করে রাখা বৃত্তটি ক্রমে তার গণ্ডি ছোট করে আনছে। এখন আমরা বিপদাপদে আর অন্ধকারে এমন ভাবে ঘেরাও হয়ে পড়েছি যে পরিত্রাণের পথ খুঁজতে গিয়ে আমরা পরস্পরের সঙ্গে ঠোকাঠুকি খাচ্ছি। আমরা সবাই নিচের দিকে তাকিয়ে দেখছি সেখানে মানুষজনেরা নিজেদের মধ্যে মারামারি কাটাকাটি করছে, ওপরে তাকিয়ে দেখছি কী শান্ত সুন্দর। তার মধ্যে আমাদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলে সেই বিশাল অন্ধকার, যে আমাদের ওপরে যেতে দেবে না, যে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে অভেদ্য প্রাচীরের মত; সে আমাদের পিষে মারতে চায়, কিন্তু এখনও পারছে না। আমি কেবল চিৎকার করে ব্যর্থতা জানাতে পারি; ‘ইস্, কালো বৃত্তটা যদি পিছিয়ে গিয়ে আমাদের পথ একটু খোলসা করে দিত।’
তোমার আনা।
.
বৃহস্পতিবার, ১১ নভেম্বর, ১৯৪৩
আদরের কিটি,
এই অধ্যায়ের একটা ভালো শিরোনাম পেয়েছি। আমার ফাউন্টেন পেনের উদ্দেশ্যে স্মৃতিতর্পণ। আমার কাছে বরাবর আমার ফাউন্টেন পেনটি ছিল সবচাইতে অমূল্য একটি সম্পদ; বিশেষ করে তার মোটা নিবের জন্যে কলমটি আমার এত আদরের, কেননা একমাত্র মোটা নিব হলে তবেই আমার হাতের লেখাটা পরিপাটি হয়। আমার ফাউন্টেন পেনের পেছনে রয়েছে এক অতি দীর্ঘ আগ্রহ-জাগানো কলম-জীবন, তার কথা সংক্ষেপে আমি তোমাকে বলব।
আমার যখন ন’বছর বয়স, তখন আমার ফাউন্টেন পেনটি এসেছিল একটি প্যাকেটে (তুলো দিয়ে মোড়ানো অবস্থায়), বিনামূল্যের নমুনা হিসেবে; পেনটি এসেছিল সুদূর আখেন থেকে; সহৃদয় উপহারদাতা আমার দিদিমা সেখানে থাকতেন। ফ্র হয়ে আমি তখন শয্যাগত, ফেব্রুয়ারির হাওয়া তখন বাড়ির চারদিকে হুঙ্কার দিয়ে ফিরছে। জমকালো সেই ফাউন্টেন পেনের ছিল একটা লাল চামড়ার খাপ। পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত বন্ধুকে সেটা দেখানো হয়ে গেল। আমি, আনা ফ্রাঙ্ক, একটি ফাউন্টেন পেন থাকার গর্বে গরবিনী। যখন আমি দশ বছরের হলাম তখন আমাকে কলমটি ইস্কুলে নিয়ে যেতে দেওয়া হল এবং শিক্ষত্রিয়ী এমন কি তা দিয়ে আমাকে লেখবারও অনুমতি দিলেন।
যখন আমার বয়স এগারো, আমাকে আবার আমার সম্পত্তিটি সরিয়ে ফেলতে হল; কেননা ষষ্ঠ শ্রেণীর শিক্ষত্রিয়ী ইস্কুলের দোয়াত কলমে ছাড়া আমাদের লিখতে দিতেন না।
বারো বছর বয়সে যখন আমি ইহুদী লিসিয়ামে (এক ধরনের মাধ্যমিক ইস্কুল যেখানে বিশেষভাবে প্রাচীন বিষয়াদি শেখানো হয়। ইউরোপের প্রায় সর্বত্র এর চলন আছে) ভর্তি হলাম তখন সেই বিরাট ঘটনা উপলক্ষে আমার ফাউন্টেন পেন পেল একটি নতুন খাপ; তাতে পেনসিল রাখারও ব্যবস্থা ছিল এবং জিপার টেনে বন্ধ করা যেত বলে খাপটা দেখতে আরও বাহারে হল।
