মিস্টার ফান ডানের ব্যাপারে আবার কোনো গোলমাল পাকিয়েছে। আমি বেশ বুঝতে পারছি শীগগিরই একটা কিছু বাধবে। কি কারণ যেন বাপি খুব ক্ষেপে আছেন। একটা কোনো বিস্ফোরণ ঘটবে, কিন্তু সেটা কী ধরনের তা জানি না। শুধু আমি যদি এই সব ঝগড়াঝাটিতে অতটা জড়িয়ে না পড়তাম তো ভালো হত! আমি যদি এ থেকে বেরিয়ে যেতে পারতাম! ওরা শীগগিরই আমাদের পাগল করে ছাড়বে।
তোমার আনা।
.
রবিবার, ১৭ অক্টোবর, ১৯৪৩
আদরের কিটি,
কী ভাগ্যিস, কুপহুইস ফিরে এসেছেন। এখনও ওঁর ফ্যাকাশে ভাব যায় নি। কিন্তু তা সত্ত্বেও উনি হাসিমুখে ফান ডানের জামাকাপড় বিক্রির ভার কাঁধে তুলে নিয়েছেন। একটা বিশ্রী
ব্যাপার হল, ফান ডানদের হাতে এই মুহূর্তে কোনো টাকাকড়ি নেই। মিসেস ফান হাতছাড়া। করবেন না। মিস্টার ফান ডানের স্যুট সহজে বিক্রি হবে না, কেননা ওঁর খাই খুব বেশি। শেষ পর্যন্ত যে কী হবে এখনও বোঝা যাচ্ছে না। মিসেস ফন ডানকে তার চারকোট। হাতছাড়া করতেই হবে। ওপর-তলায় এই নিয়ে স্বামী-স্ত্রীতে প্রচণ্ড বচসা হয়ে গেছে; এখন চলছে ওঁদের ‘ও সোনার পুট্টি’ এবং ‘আদরের কেলি’ বলে মানভঞ্জনের পালা।
গত মাসে এই পুন্যবান বাড়িতে যে পরিমাণ গালিগালাজ বিনিময় হয়েছে তাতে আমি হকচকিয়ে গিয়েছি। বাপি মুখে কুলুপ এঁটে ঘুরে বেড়াচ্ছেন; কেউ ওঁকে ডেকে কিছু বললে উনি চমকে উঠে এমনভাবে মুখ তুলে তাকান যেন ওঁর ভয় আবার কার সঙ্গে কার কী খিটিমিটি হয়েছে ওঁকে তা মেটাতে হবে। উত্তেজনার দরুন মা-মণির গালে লাল ছোপ পড়েছে। মারগটের সব সময় মাথা ধরে আছে। ডুসেল অদ্রিায় ভুগছেন। মিসেস ফান ডান সারাদিন গজগজ করেন আর আমার হয়েছে সম্পূর্ণ মাথা-খারাপের অবস্থা! সত্যি বলছি; মাঝে মাঝে আমার মনে থাকে না কার সঙ্গে আমাদের আড়ি চলছে আর কার সঙ্গেই বা ভাব। এসব জিনিস থেকে মনটাকে সরিয়ে রাখার একমাত্র উপায় হল–পড়াশুনা নিয়ে থাকা এবং আমি এখন প্রচুর পড়ছি।
তোমার আনা।
.
শুক্রবার, ২৯ অক্টোবর, ১৯৪৩
আদরের কিটি, মিস্টার আর মিসেস ফান ডানের মধ্যে কয়েকবার তুমুল ঝগড়া হয়ে গেছে। ব্যাপারটা ঘটেছিল এই রকম–তোমাকে আমি আগেই বলেছি, ফান ডানদের টাকাপয়সা সব ফুরিয়ে গেছে। কিছুদিন আগে একদিন কথায় কথায় কুপহুইস বলেছিলেন ফার-ব্যবসায়ীর সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক আছে; তাতে স্ত্রীর কার-কোটটা বেচার কথা ফান ডানের মাথায় আসে। ফার কোটটা খরগোসের চামড়ায় তৈরি এবং ভদ্রমহিলা সতেরো বছর ধরে সেটা সমানে পরেছেন। ওটা বেচে ভদ্রলোক পেয়েছেন ৩২৫ ফ্লোরিন প্রচুর টাকা। যাই হোক, মিসেস ফান ডান চেয়েছিলেন যুদ্ধের পর কাপড়চোপড় কেনার জন্যে টাকাটা রেখে দিতে; ধানাই পানাই করার পর ফান ডান তার স্ত্রীকে পরিষ্কার বলেন যে সংসারের জন্যে টাকাটা এখুনি দরকার।
সে যে কী চিৎকার আর চেচামেচি পা-দাপানো আর গালাগালি–তুমি ধারণা করতে পারবে না। সে এক ভয়ানক ব্যাপার আমার পরিবারের সবাই সিঁড়ির নিচে রুদ্ধ নিশ্বাসে দাঁড়িয়ে, দরকার হলে টেনে হিঁচড়ে ওদের ছাড়িয়ে দেবার জন্যে তৈরি। এইসব গলাবাজি আর কান্না আর স্নায়বিক উত্তেজনা এমন অস্বস্তিকর এবং এত ক্লান্তিকর যে সন্ধ্যেবেলায় আমি কাঁদতে কাঁদতে বিছানায় ঢলে পড়লাম আর সৃষ্টিকর্তাকে এই বলে ধন্যবাদ দিলাম যে, কখনও কখনও আমি আধ ঘণ্টা সময় পাই যা আমার নিজস্ব।
মিস্টার কুপহুইস আবার আসছেন না; পাকস্থলী নিয়ে ওর ভোগান্তির একশেষ। রক্ত। পড়া বন্ধ হয়েছে কিনা উনি জানেন না। যখন উনি বললেন ওঁর শরীর ভালো যাচ্ছে না এবং বাড়ি চলে যাচ্ছেন, তখন সেই প্রথম ওঁকে খুব কাহিল দেখলাম।
আমার ক্ষিদে হচ্ছে না, এ ছাড়া মোটের ওপর আমার খবর ভালো। সবাই বলছে ‘দেখে মনে হচ্ছে, তুমি মোটেই সুস্থ নও।’ আমাকে এটা স্বীকার করতেই হবে যে, আমাকে ঠিক রাখার জন্যে ওরা যথাসাধ্য করছে। গ্লুকোজ, কডলিভার অয়েল, ইস্ট ট্যাবলেট আর ক্যালসিয়াম–সব একধার থেকে খাওয়ানো হচ্ছে।
প্রায়ই আমি মানসিক স্থৈর্য হারিয়ে ফেলি; বিশেষ করে আমার মেজাজ খিচড়ে যায় রবিবারগুলোতে। সিসের মত ভারী এমন বুকচাপা আবহাওয়া, খালি হাই ওঠে। বাইরে একটি পাখিও ডাকে না, চারিদিকে মারাত্মক নৈঃশব্দ্যের ঘেরাটোপ, আমাকে ধরে বেঁধে যেন পাতালের দিকে টেনে নিয়ে যাবে।
যখন এইরকম হয়, তখন বাপি, মা-মণি আর মারগট, কারো সম্বন্ধেই আমার কোনো পৃহা থাকে না। একবার এ-ঘর একবার ও-ঘর, একবার নিচে একবার ওপরে আমি ঘুরে ঘুরে বেড়াই, মনে হয় আমি যেন সেই গান-গাওয়া পাখি যার ডানা দুটো কেটে দেওয়া হয়েছে আর সে যেন নিচ্ছিদ্র অন্ধকারে খাচার গরাদে আছাড়ি-পিছাড়ি খাচ্ছে। আমার ভেতর থেকে কেউ চেঁচিয়ে বলে, ‘যাও না বাইরে, হেসেখেলে বেড়াও, গায়ে খোলা হাওয়া লাগাও, কিন্তু তাতেও আমার কোনো সাড়া জাগে না। আমি গিয়ে ডিভানে শুই, তারপর ঘুমিয়ে পড়ি, যাতে আরও তাড়াতাড়ি কাটে সময়, আর স্তব্ধতা আর সাংঘাতিক ভয়, কেননা তাদের কোতল করার কোনো উপায় নেই।
তোমার আনা।
.
বুধবার, ৩ নভেম্বর, ১৯৪৩
আদরের কিটি,
আমরা যাতে এমন কিছু করতে পারি, একাধারে যা শিক্ষামূলকও হবে, তার জন্যে বাপি লিডেনের টিচার্স ইনস্টিটিউটে প্রস্পেক্টাস চেয়ে চিঠি লিখেছিলেন। মারগট ঐ মোটা বইটা অন্তত তিনবার খুঁটিয়ে পড়েও তাতে এমন কিছু পায়নি যা তার মনে ধরে কিংবা যা তার সাধ্যায়ও। বাপি তার আগেই ঠিক করে ফেলেছেন, উনি প্রাথমিক লাটিন শিক্ষার পরীক্ষামূলক অনুশীলনী চেয়ে ইনস্টিটিউটে চিঠি লিখতে চান।
