তোমার আনা?
.
শুক্রবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৩
আদরের কিটি, যখনই আমি তোমাকে লিখতে বসি, যেন একটা বিশেষ কিছু ঘটে, কিন্তু ঘটনাগুলো প্রীতিকর হওয়ার বদলে প্রায়ই অপ্রীতিকর হয়। যাই হোক, এখন অবিশ্বাস্য কিছু ঘটছে। গত বুধবার সন্ধেবেলায়, ৮ই সেপ্টেম্বর, আমরা গোল হয়ে বসে সাতটার খবর শুনছিলাম। প্রথম খবরই হল : ‘সারা যুদ্ধের সেরা খবর শুনুন এবার। ইতালি আত্মসমর্পণ করেছে।’ ইংলণ্ড থেকে ডাচ ভাষায় খবর শুরু হল সওয়া আটটায়। শ্রোতাবৃন্দ এক ঘণ্টা আগে আজকের ঘটনাপঞ্জি লেখা যখন সবে শেষ করেছি, সেই সময় ইতালির আত্মসমর্পণের অবিশ্বাস্য খবরটা এসে পৌঁছোয়। বিশ্বাস করুন, লেখা নোটগুলো বাজে কাগজের ঝুড়িতে ফেলে দিতে এত আনন্দ এর আগে কখনও পাইনি। গড সেভ দি কিং’, আমেরিকার জাতীয় সঙ্গীত এবং ইন্টারন্যাশনাল’ বাজানো হল। বরাবরের মতই ডাচভাষার প্রোগ্রামটা ছিল মন-চাঙ্গা-করা, কিন্তু খুব একটা আশাবাদী নয়।
আমাদের মুশকিলও আছে বেশ; মুশকিলটা মিস্টার কুপহুইসকে নিয়ে। তুমি জানো উনি আমাদের খুব প্রিয়জন; সবসময় ওঁর মুখে হাসি এবং আশ্চর্যরকমের সাহসী মানুষ, যদিও কখনই ওঁর শরীর ভালো নয়, নিদারুণ যন্ত্রণা পান, ওর পেট ভরে, খাওয়া আর বেশি হাঁটাচলা করা বারণ। মা-মনি কদিন আগে খুব খাঁটি কথাই বলেছিলেন, ‘মিস্টার কুপহুইস ঘরে পা দিলে, রোদ হেসে ওঠে।’ ওঁকে এখন হাসপাতালে যেতে হয়েছে। তলপেটে একটা খুব বিচ্ছিরি ধরনের অস্ত্রোপচারের জন্যে। অন্তত চার সপ্তাহ তাঁকে হাসপাতালে থাকতে হবে। তুমি যদি দেখতে কি রকম আটপৌরে ভাবে উনি আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গেলেন–যেন কিছুই নয়, যেন উনি একটু কোনাকাটা করতে বেরোচ্ছেন।
তোমার আনা।
.
বৃহস্পতিবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৩
আদরের কিটি,
আমাদের ভেতরকার সম্পর্ক দিন দিন আরও খারাপ আকার ধারণ করেছে। খেতে বসে কেউ মুখ খুলতে (খাবারের গ্রাস তোলা ছাড়া) সাহস পায় না, পাছে কিছু বললেই কারো গায়ে লাগে কিংবা কেউ উল্টো বোঝে। দুশ্চিন্তা এবং মানসিক অবসাদ থেকে বাচার জন্যে আমি ভালেরিয়ান পিল্ গিলছি, কিন্তু তাতে পরের দিন আমার অবস্থা আরও শোচনীয় হওয়া আটকাচ্ছে না। দশটা ভালেরিয়ান পিল্ খাওয়ার চেয়েও বেশি কাজ হত প্রাণ খুলে একবার হাসতে পারলে কিন্তু আমরা যে ভুলেই গিয়েছি কেমন করে হাসতে হয়। মাঝে মাঝে আমার ভয় হয় যে, অত গুরুগম্ভীর হয়ে থাকতে থাকতে আমার মুখচ্ছবি হয়ত পঁাচার মত হয়ে মুখের দুটো কোণ ঝুলে যাবে। অন্যদেরও গতিক তেমন সুবিধের নয়, শীত হলে সেই মহা বিভীষিকা যার দিকে প্রত্যেকেই সভয়ে আর সংশয়িত চিত্তে তাকায়। আরেকটি জিনিসও আমাদের আদৌ খুশি করছে না–সেটা হল এই যে, মালখানদার ফ.ম. ‘গুপ্ত মহল’ সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে উঠেছে। ফ.ম. এ বিষয়ে কী ভাবছে না ভাবছে তা নিয়ে আমরা প্রকৃতপক্ষে মাথাই ঘামাতাম না যদি লোকটা অত বেশি ছেক-ছোক না করতো, যদি ওর চোখে ধুলো দেওয়া শক্ত না হত, আর তাছাড়া, ও এমন যে ওকে বিশ্বাস করা যায় না। একদিন ক্রালার চাইলেন একটু বেশি রকম সাবধান হতে; একটা বাজার দশ মিনিট আগে কোট গায়ে দিয়ে উনি মোড়ের কাছে ওষুধের দোকানে গেলেন। পাঁচ মিনিটও হয়নি, উনি ফিরে এসে চোরের মত গুটিসুটি মেরে খাড়া সিঁড়ি বেয়ে সোজা আমাদের ডেরায় চলে এলেন। সওয়া একটার সময় উনি যখন ঠিক করলেন ফিরে যাবেন, তখন এলি এসে ওঁকে এই বলে হুঁশিয়ার করে দিলেন যে, ফ.ম. তখনও অফিসে রয়েছে। ক্রালার আর ও-মুখো না হয়ে আমাদের সঙ্গে দেড়টা অবধি বসে কাটালেন। তারপর জুতোজোড়া খুলে ফেরে মোজা-পরা পায়ে চিলেকোঠার দরজার মুখে গিয়ে ধাপে ধাপে নিচের তলায় নেমে গেলেন; সেখানে যাতে ক্যাচ ক্যাচ শব্দ না হয় তার জন্যে পনেরো মিনিট ধরে তাল সামলে ক্রালার বাইরের দিক থেকে ঢুকে নির্বিঘ্নে অফিস-ঘরে অবতরণ করলেন। ইতিমধ্যে ফ.ম.-কে কাটিয়ে এলি আমাদের ডেরায় উঠে এলেন ক্রালারকে নিয়ে যেতে। কিন্তু ক্রালার তার ঢের আগেই চলে গেলেন; তখনও তিনি খালি পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নামছেন। রাস্তার লোকে যদি দেখত ম্যানেজার সায়েব বাইরে দাঁড়িয়ে জুতো পরছেন, তাহলে কী ধারনা হত তাদের শুধু মোজা পায়ে ম্যানেজার সায়েব!
তোমার আনা।
.
বুধবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৩
আদরের কিটি,
আজ মিসেস ফান ডানের জন্মদিন। আমরা ওঁকে জ্যাম দিয়েছি এক পাত্র, সেই সঙ্গে পনির, মাংস আর রুটির কুপন। ওঁর স্বামী, ডুসেল আর আমাদের ত্রাণকর্তাদের কাছ থেকে উনি পেয়েছেন নানা খাবারদাবার আর ফুল। এমনই এক সময়ে আমরা বাস করছি।
এই সপ্তাহে এলির মেজাজ ঠিক থাকে নি; দ্যাখ-না-দ্যাখ ভাঁকে বাইরে পাঠানো হয়েছে; বার বার তাঁকে বলা হয়েছে দৌড়ে গিয়ে এই জিনিসটা আনো, যার মানে বাড়তি ফরমাশ খাটা অথবা প্রকারান্তরে বলা যে এটা এলির ভুল হয়েছে। নিচের তলায় অফিসের কাজ পড়ে আছে এলিকে সেসব সারতে হবে, কুপহুইস অসুস্থ, ঠাণ্ডা লেগে মিপ বাড়িতে তাছাড়া এলির নিজেরও গোড়ালিতে মচকানোর ব্যথা, মনের মানুষকে নিয়ে ভাবনাচিন্তা, এবং তার ওপর খুঁতখুঁত করা বাবা–এসব কথা মনে রাখলে বোঝা যায় এলির কেন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। আমরা এলিকে এই বলে প্রবোধ দিই যে, দু-একবার উনি জোর করে বলুন যে ওঁর সময় নেই। তাহলে বাজারের ফর্দ আপনা থেকেই হালকা হয়ে আসবে।
