পৌনে ছটা। এলি বিদায় নেন। দু’তলার সিঁড়ি ভেঙে নিচে গিয়ে আমি একবার চারদিক দেখে আসি। প্রথমে রান্নাঘরে, তারপর অফিসের খাস কামরায়, এরপর মুশ্চির জন্যে কল আঁটা দরজাটা খুলতে কয়লার গর্তে। বেশ অনেকক্ষণ ধরে সবকিছু দেখাশুনো করার পর শেষে গেলাম কালারের কামরায়। ফান ডান ড্রয়ার আর পোর্টফোলিওগুলো ঘেঁটে ঘেঁটে দেখছিলেন আজকের কোনো ডাক আছে কিনা। পেটার গেছে মালখানার চাবি আর বোখাকে আনতে; পিম্ টাইপরাইটারগুলো টেনে টেনে ওপরে তুলছেন; মারগট একটা নিরিবিলি। জায়গা খুঁজছে যাতে সে তার অফিসের কাজগুলো করতে পারে; মিসেস ফান ডান গ্যাসের উনূনে কেটলি চাপাচ্ছেন; মা-মণি আলুর ডেকচি নিয়ে নিচে নেমে আসছেন; প্রত্যেকেই জানে কার কী কাজ।
পেটার একটু বাদেই মালখানা থেকে ফিরে এল। প্রথম সওয়াল হল-রুটি। রান্নাঘরের আলমারিতে সব সময়ই রুটি রাখেন মহিলারা; কিন্তু সেখানে নেই। রাখতে ভুলে গেছেন। ওরা? পেটার সদর দপ্তরের খোঁজ করতে চাইল। যাতে বাইরে থেকে দেখা না যায় তার জন্য। নিজেকে গুটিয়ে যথাসম্ভব ছোট করে দরজার সামনে সে গুটিসুটি মেরে বসে হাতে আর হাঁটুতে ভর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে চলল স্টীলের আলমারির দিকে; রুটি সেখানেই রাখা ছিল; রুটিটা হস্তগত করে পেটার হাওয়া হল; অন্তত, সে চেয়েছে হাওয়া হয়ে যেতে, কিন্তু ঘটনাটা ভালোরকম মালুম হওয়ার আগেই মুশ্চি তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, সোজা গিয়ে গাট হয়ে বসেছে লেখার টেবিলের তলায়।
পেটার ফ্যাল ফ্যাল করে এদিক ওদিক তাকায়–এইও, মুশ্চিকে দেখতে পেয়ে, আবার হামাগুড়ি দিয়ে অফিসে ঢুকে গিয়ে মুশ্চির ল্যাজ ধরে টানতে থাকে। মুশ্চি ফঁাচ ফ্যাচ করে, পেটার ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলে। কিন্তু তাতে ফল কী দাঁড়াল? মুশ্চি এবার জানলার পাশে উঠে বসে পেটারের হাত এড়াতে পেরে মহাসুখে গা চাটছে। পেটার ওকে ভজাবার জন্যে বেড়ালটার নাকের নিচে একখণ্ড রুটি ধরে শেষ চেষ্টা দেখছে। মুশ্চি ওতে ভুলবে না, দরজা
বন্ধ হয়ে গেল। দরজার ফাঁক দিয়ে আমি আগাগোড়া দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম। আমরা বসে নেই। খুট, খুট, খুট। দরজায় তিনটে শব্দ মানে খাবার দেওয়া হয়েছে।
তোমার আনা।
.
মঙ্গলবার, ২৩ আগস্ট, ১৯৪৩
আদরের কিটি
‘ুহপ্ত মহলে’র দৈনিক নির্ঘণ্টের বাকি কিস্তি। ঘড়িতে সকাল সাড়ে আটটা বাজলেই মারগট আর মা-মণি ছটফট করতে থাকেন, চুপ, চুপ…বাপি, আস্তে অটো, চুপ…পিম।‘ ‘সাড়ে আটটা বাজে, এদিকে চলে এসো, এখন আর পানির কল খোলা চলবে না; পা টিপে টিপে চলে এসো।‘ বাথরুমে বাপিকে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে এমনি সব অনুশাসন দেওয়া হতে থাকে। ঘড়িতে সাড়ে আটটা বাজা মাত্র তাঁকে বসবার ঘরে হাজির হতে হবে। কলে এক ফোঁটাও পানি পড়বে না, কেউ পায়খানায় যাবে না, পায়চারি করা চলবে না, কোথাও কোনো টু শব্দ হবে না। অফিসে যতক্ষণ লোকজন না থাকে, মালখানায় সব কিছু শ্রুতিগোচর হয়। আটটা বেজে কুড়ি মিনিট হলে ওপরতলার দরজা খুলে যায় এবং তার কিছুক্ষণ পরেই মেঝের ওপর টুক টুক্ করে তিনবার আওয়াজ হয়–আনার পরিজ। আমি সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে আমার কুকুরছানা’র প্লেটটা হস্তগত করি। তারপর আবার একছুটে আমার ঘরে। সব কিছুই করা হয় প্রচণ্ড দ্রুতগতিতে। চুল আঁচড়ে নিই, আমার আওয়াজ করা টিনের টুকরিটা সরিয়ে ফেলি, বিছানাটা যথাস্থানে রাখি। এই চুপ, ঘড়িতে ঘণ্টা বাজছে! ওপর তলায় মিসেস ফান ডান জুতো খুলে ফেলে বেডরুম স্লিপারে পা গলাচ্ছেন। মিস্টার ফান ডানও তাই করছেন; চারিদিক নিস্তব্ধ। এতক্ষণে আমরা ফিরে পাচ্ছি একটুখানি সত্যিকার পারিবারিক জীবন। আমি এখন পড়াশুনো করতে চাই। মারগটও চায়, আর সেই সঙ্গে চান বাপি আর মা-মণি। ঝুলে পড়া, ক্যাচ ক্যাচ শব্দ করা খাটের একপ্রান্তে বসে বাপি (হাতে চিরাচরিত ডিকন্স আর অভিধান); একটু ভদ্রগোছের গদিও তাতে নেই; ওপর নিচে দুটো পাশ-বালিশ জোড়া দিলেও কাজ চলে যায়, বাপি তখন ভাবেন : ‘কাজ নেই ওসবে, এমনিতেই আমি চালিয়ে নেব।’
বাপি যখন পড়েন, মুখ তোলেন না, এদিক ওদিক তাকানও না। থেকে থেকে হাসেন আর তখন বিস্তর চেষ্টা করে কোনো একটা ছোট্ট গল্পে মা-মণির আগ্রহ জাগাতে। উত্তর পান–’আমার এখন সময় নেই। বাপি এক সেকেও একটু দমে যান, তারপর আবার পড়তে থাকেন; খানিক পরে, যখন বাড়তি মজাদার কিছু পান, তখন আবার চেষ্টা করেন : এই জায়গাটা তোমার পড়া উচিত, মা-মণি।’ মা-মণি ‘ওপক্লাপ’ (ওলন্দাজদের এক ধরনের খাট, সামনে পর্দা খাঁটিয়ে দেয়ালে ভাজ করে রাখলে বুককেসের মতন দেখায়) চৌকিতে বসে বসে যখন যেমন ইচ্ছে বইপত্র পড়েন, সেলাই করেন, বোনেন অথবা কাজ করেন। তখন হঠাৎ একটা কিছু তার মনে পড়ে যায়। তড়বড় করে বলে ওঠেন : ‘আনা, তুই জানিস…মারগট, লিখে নে…!’ খানিক পরে আবার সব মিটমাট হয়ে যায়।
মারগট ফটাস করে তার বই বন্ধ করে। বাপি তার ভুরুজোড়া তুলে অদ্ভুত ভাবে বাকান, তার চোখ কুঁচকে পড়বার ধরনটা আবার স্পষ্ট হয় এবং আবার একবার তিনি বইয়ের মধ্যে ডুবে যান; মা-মনি মারগটের সঙ্গে বকবক করতে থাকেন, আমিও কান খাড়া করে। শুনি। পিম্ সেই আলোচনায় ভিড়ে যান…ঘড়িতে নটা। প্রাতরাশ এখন।
