ডুসেল পরোক্ষে আমাদের জীবন বিপন্ন করে তুলেছেন। আসলে মুসোলিনি আর হিটলারকে গালাগাল দেওয়া একটা নিষিদ্ধ বই উনি মিকে আনতে দেন। আসবার সময় ঝটিকা বাহিনীর একটি গাড়ি মিপের প্রায় ঘাড়ে এসে পড়েছিল। মিপ্ চটে গিয়ে বলে ওঠেন, হতভাগা নচ্ছার কাহাকা।’ বলে সাইকেল চালিয়ে দেন। ওঁকে যদি ওদের সদর দপ্তরে পাকড়াও করে নিয়ে যেত তাহলে যে কী হত সে কথা না ভাবাই ভালো।
তোমার আনা!
.
বুধবার, ১৮ আগস্ট, ১৯৪৩
আদরের কিটি,
এই লেখাটার শিরোনাম হল : ‘আজকের যৌথ কর্তব্য–আলু ছোলা।’
একজন খবরের কাগজ আনে, আরেকজন ছুরি (অবশ্যই, সেরা ছুরিটা সে নিজে নেয়), তৃতীয়জন আনে আলু আর চতুর্থজন এক ডেকচি পানি।
শুরু করেন মিস্টার ডুসেল, সব সময় ওঁর ছোলা ভালো হয় না, তবু ডাইনে বাঁয়ে তাকিয়ে অনবরত ছুলে যান। সবাই কি ওঁর পন্থা অনুসরণ করে? উঁহু! এই আনা, এদিকে তাকাও; এইভাবে আমি ছুরিটা ধরছি, তারপর ওপর থেকে নিচের দিকে ছুলছি! উঁহু, ওভাবে নয়-এই ভাবে!’
আমি আমতা আমতা করে বলি, ‘মিস্টার ডুসেল, এইভাবে আমার ভালো হয়!’
‘তাহলেও, সবচেয়ে ভালো হয় এইভাবে। তবে তোমার দ্বারা এটা হবে না। স্বভাবতই ও নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না। করতে করতে এটা তোমার জানা হবে।’ আমরা ছুলে চলি। আমার পাশের লোকের দিকে আমি আড়চোখে তাকাই। উনি কী যেন ভাববে ভাবতে আরেকবার মাথা নাড়ান (বোধ হয়, আমাকে মনে করে), কিন্তু রা কাড়েন না।
আমি আবার দুলতে থাকি, বাপি যে দিকটাতে বসে আছেন, এবার আমি সেইমুখো তাকাই। ওঁর কাছে আলু ছোলার ব্যাপারটা নেহাত একটা নগণ্য কাজ নয়, এটা রীতিমত একটা সূক্ষ্ম কাজ। বাপি যখন বই পড়েন, ওঁর মাথার পেছন দিকের চামড়ায় গভীর টোল পড়ে, কিন্তু আলু, বিন্ আর অন্যান্য তরিতরকারি কাটাকুটো করবার সময় মনে হয় ওঁর মাথায় আর কিছু ঢোকে না। তখন উনি পরে নেন ‘আলুর মুখচ্ছবি এবং নিখুঁত ভাবে না। ছুলে কোনো আলু কিছুতেই উনি হাতছাড়া করবেন না; একবার ঐ মুখচ্ছবি ধারণ করলে সে প্রশ্নই আর ওঠে না।
তারপর আবার কাজ করতে করতে এক মুহূর্তের জন্যে একবার মুখ তুলি; ঘটনাটা আমার বিলক্ষণ জানা, মিসেস ফান ডান চেষ্টা করছেন ডুসেলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে। প্রথমে উনি ভুসেলের দিকে তাকিয়ে থাকেন, ডুসেল সেটা খেয়াল করেন বলে বোধ হয় না। এরপর চোখের ইশারা করেন; ডুসেল ঘাড় গুঁজে কাজ করে যান। তখন উনি হাসতে থাকেন, ডুসেল। মুখ তোলেন না। এরপর মা-মনিও হাসতে থাকেন; ডুসেল গ্রাহ্য করেন না। মিসেস ফান ডান কিছু করতে না পেরে, তখন অন্য উপায় অবলম্বন করার কথা ভাবলেন। খানিক চুপ করে থেকে তারপর বললেন : পুড়ি, একটা অ্যাপ্রন জড়িয়ে নাও না। নইলে কাল তোমার স্যুট থেকে ঘষে ঘষে সব দাগ আমাকে তুলতে হবে।’
‘আমি মোটেই স্যুট নোংরা করছি না!’
আরেক মুহূর্ত সব চুপচাপ।
‘পুট্টি, তুমি বসছ না কেন?’
দাঁড়িয়ে থেকে আমি আরাম পাচ্ছি। এই বেশ ভালো। চুপ।
‘পুট্টি ডু স্পাটস্টশন! (পিণ্ডি পাকাচ্ছ!’)।
‘আমার খেয়াল আছে গো, খেয়াল আছে।’
মিসেস ফান ডান বিষয়াত্তর খোঁজেন। ‘আচ্ছা, পুট্টি, বলো তো ইদানীং ইংরেজদের হাওয়াই হামলা নেই কেন?’
‘আবহাওয়া এখন সুবিধের নয় বলে।‘
‘কালকের দিনটা তো চমৎকার ছিল, কই ওদের প্লেন তো এল না।‘
‘ওসব নিয়ে কথা না বলাই ভালো।‘
‘কেন, আলবৎ বলব। আমরা আমাদের মতো বলতে পারি।’
‘কেন নয়?’
‘চুপ করে থাকো।’
‘মিস্টার ফ্রাঙ্ক সব সময় ওঁর স্ত্রীর প্রশ্নের উত্তর দেন। কী, দেন না?’
মিস্টার ফান ডান নিজের সঙ্গে লড়েন। এটা তার ব্যথার জায়গা, এটা এমন জিনিস যা তাঁর সহ্যের বাইরে এবং মিসেস ফান ডান আবার শুরু করেন—‘মনে হচ্ছে স্থলাভিযান কোনোদিনই হবে না!’
মিস্টার ফান ডান সাদা হয়ে গেলেন; সেটা লক্ষ্য করে মিসেস ফান ডান লাল হয়ে গিয়ে আবার বলে চললেন: ‘বৃটিশরা কচু করছে।’ ব্যস্, বোমা ফাটল!
‘আর একটা কথা নয়, ডনারভেটার-নখ-আইনমাল!’ (‘কালবোশেখি আবার!’)
মা-মণি আর হাসি চাপতে পারেন না। আমি সোজা সামনের দিকে তাকাই।
প্রায় রোজই এই এক ধরনের ঘটনা। ওঁদের মধ্যে খুব একচোট ঝগড়া হয়ে গেলে অবশ্য এর ব্যতিক্রম হয়। কেননা তখন দুজনেই মুখ বন্ধ করে থাকেন।
আমাকে চিলেকোঠায় উঠে গিয়ে কিছু আলু নিয়ে আসতে হয়। পেটার বেড়ালের উকুন বেছে দিচ্ছিল। পেটার মুখ তুলে তাকাতেই বেড়ালটার নজরে পড়ে–হু–খোলা জানালা দিয়ে সোজা সে নালীর মধ্যে উধাও হয়। পেটার এই মারে তো সেই মারে। আমি হো হো করে সটকে পড়ি।
তোমার আনা।
.
শুক্রবার, ২০ আগস্ট, ১৯৪৩
আদরের কিটি,
মালখানার লোকেরা ঠিক সাড়ে পাঁচটায় বাড়ি চলে যায়। তারপর আমরা ঝাড়া হাত পা।
সাড়ে পাঁচটা। এলি এসে আমাদের অর্পণ করেন সান্ধ্য স্বাধীনতা। সঙ্গে সঙ্গে আমরা আমাদের কাজকর্মে লেগে পড়ি। প্রথমে এলির সঙ্গে আমি ওপরতলায় যাই, এলি সাধারণত আমাদের দ্বিতীয় ক্রমের খাবার থেকে নিয়ে চাখতে শুরু করে দেন।
এলি বসবার আগইে মিসেস ফান ডান ভেবে ভেবে বের করতে থাকেন কী কী জিনিস তার চাই। সে সব প্রকাশ হতে দেরি হয় না; ‘দেখ, এলি, আমার একটা ছোট্ট জিনিস চাই…।’ এলি আমাকে চোখ টেপে; ওপরে যেই আসুক, মিসেস ফান ডান কাউকে কখনও বলতে ছাড়েন না যে তার কোন্ জিনিসটা চাই। লোকজনেরা যে ওপরতলায় আসতে চায় না এটা নিশ্চয় তার একটা কারণ।
