এক, ভদ্রমহিলা পরিশ্রমী, দুই হাসিখুশি, তিন ছেনাল এবং কখনও-সখনও সুচ্ছিরি। ইনিই হলেন পেট্রোনেলা ফান ডান।
খাওয়ার টেবিলের তৃতীয় সাথীটি। ওকে তেমন টা ফো করতে শোনা যায় না। তরুণ শ্ৰীমান ফান ডান খুব চুপচাপ এবং ওর দিকে কারো বড় একটা দৃষ্টি পড়ে না। ওর ক্ষিধের কথা বলতে গেলে : সেটা যেন (গ্রীক পুরানের) দেনাইদিনের সেই পাত্র, যা কখনই ভর্তি হয় না। চর্বচোষ্য করে ভরপেট খাওয়ার পরও অম্লানবদনে সে বলবে আবার দিলে আবারও সে খেতে পারে।
চার নম্বর–মারগট। নেংটি ইঁদুরের মতন কুট কুট করে খায় এবং কোনো রা কাড়ে। গলা দিয়ে একমাত্র যায় তরিতরকারি আর ফলমূল। ফান ডানদের বিচারে ‘মাথা খাওয়া’; আমাদের মতে, যথেষ্ট খোলা হাওয়া এবং খেলাধুলোর অভাব।
সে বাদে–মা-মণি। ক্ষিধের সঙ্গে খান, বড় বেশি কথা বলেন। মিসেস ফান ডান যেমন, তেমন কারো মনেই হয় না; ইনিই হলেন গৃহকত্রী। তফাতটা কোথায়? তফাত হল গিয়ে মিসেস ফান ডান করেন রান্না, আর মা-মণি করেন মাজাঘষা।
নম্বর ছয় আর সাত। বাপি আর আমার সম্বন্ধে বেশি কিছু বলব না। প্রথমোক্ত জন। হলেন খাওয়ার টেবিলে সবচেয়ে সাদাসিধে মানুষ। তিনি আগে দেখে নেন সবাই কিছু কিছু করে পেয়েছে কিনা। তার নিজের কিছু না পেলেও চলে, কেননা সেরা জিনিসগুলো পাবে ছোটরা। উনি হলেন এমন দৃষ্টান্ত যার কোনো ঘাট নেই।
ওঁর পাশে ‘গুপ্ত মহলে’র ‘বদমেজাজী’ ডাক্তার ডুসেল। নিতে কার্পণ্য করেন না। বিনাবাক্যে ঘাড় গুঁজে খেয়ে যান। কেউ মুখ খুললে, দোহাই, কেবল খাওয়ার কথা হোক। এ নিয়ে কে আর কোন্দল করে, করে শুধু বাফাট্টাই। ভদ্রলোক নেন কজি ডুবিয়ে, খেতে ভালো হলে কখনই আর ‘না’ বলেন না, খারাপ হলে বলেন মাঝে মধ্যে। বুকের কাছে টানা ট্রাউজার, লাল কোট, শোবার ঘরের কালো চটি আর শিঙের তৈরি চশমার ফ্রেম। ছোট্ট টেবিলটাতে ওঁর এই চেহারাটা চোখে ভাসে–সব সময় কাজ করছেন, তারই ফাঁকে ফাঁকে। দিবান্দ্রিা, খাওয়ার পর্ব, আর-তার প্রিয় জায়গা পায়খানা। দিনে তিন, চার, পাঁচবার দোরগোড়ায় অস্থির হয়ে দাঁড়ানো, একবার এ-পায়ে একবার ও-পায়ে ভর দিয়ে এমন ভাবে শরীরটাকে দোমড়ানো মোচড়ানো যে বোঝাই যায় আর সামলানো যাচ্ছে না। তাতে কি উনি অতিষ্ঠ হন? একটুও না! সওয়া সাতটা থেকে সাড়ে সাতটা, সাড়ে বারোটা থেকে একটা, দুটো থেকে সওয়া দুটো, চারটে থেকে সওয়া চারটে, ছটা থেকে সওয়া ছটা, সাড়ে এগারোটা থেকে বারোটা। সময়গুলো মনে করে রেখে দেওয়া ভালো–এগুলো হল রোজকার ‘বৈঠকী সময়। দরজায় যদি আসন্ন বিপদের জানান-দেওয়া, কাতর কণ্ঠস্বর শোনা যায়! ওঁর ভারি বয়েই গেছে বেরিয়ে আসতে কিংবা তাতে কান দিতে।
নয় নম্বরটি গুপ্ত মহলের পরিবারভুক্ত নন, কিন্তু এ বাড়ির এবং খাওয়ার টেবিলের সঙ্গীসাথী। এলির রয়েছে সুস্থ সবল মানুষের ক্ষিধে। ওঁর প্লেটে কিছু পড়ে থাকে না এবং ওঁর ওটা খাব না সেটা খাব না নেই। একটুতেই এলি সন্তুষ্ট হন এবং ঠিক সেই কারণেই আমরা আনন্দ পাই। সদাপ্রফুল্ল এবং ঠাণ্ডা মেজাজ কোনো কিছুতে ‘না’ বলা নেই এবং ভালো মানুষ–এই সব ওঁর চরিত্রের গুণ।
তোমার আনা।
.
মঙ্গলবার, ১০ আগস্ট, ১৯৪৩
আদরের কিটি,
নতুন মতলব মাথায় এসেছে। খাওয়ার সময় অন্যদের সঙ্গে কম কথা বলি, বেশি বলি নিজের সঙ্গে। দুটো কারণে এটা প্রশস্ত। প্রথমত, সারাক্ষণ আমি মুখে খই না ফোঁটালে সবাই খুশি হয়, এবং দ্বিতীয়ত, অন্যেরা কী বলে না বলে তা নিয়ে আমার বিরক্ত হওয়া উচিত নয়। আমি মনে করি না, আমি বোকার মতন ফোড়ন কাটি; অন্যেরা মনে করে। সুতরাং আমার কথা আমার মনে মনে রাখাই ভালো। আমি একই জিনিস করি যখন আমাকে এমন কিছু খেতে হয় যা আমার দু’চক্ষের বিষ। আমি প্লেটটা আমার সামনে রেখে খাবারটা যেন অতি উপাদেয় এইভাবে মনকে চোখ ঠারি, পারতপক্ষে সেদিকে তাকাই না বললেই হয়, এবং কোথায় আছি সে সম্বন্ধে হুশ হওয়ার আগেই জিনিসটা লোপাট হয়। আরেকটা খুব বিচ্ছিরি প্রক্রিয়া হল সকালে ওঠা। বিছানা থেকে পা ছুঁড়ে উঠে পড়তে পড়তে নিজের মনে বলি–‘আসছি, এক সেকেণ্ড’–বলে জানালায় গিয়ে দাঁড়িয়ে নিষ্প্রদীপের গ্রন্থি খুলি, জানলার ফাঁকে নাক লাগিয়ে থেকে কিছুক্ষণ পরে খানিকটা তাজা হাওয়ার অনুভুতি পাই, তখন আমি জেগে যাই। যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি বিছানাটা তুলে ফেললে ঘুমোবার প্রলোভন চলে যায়। এই ধরনের জিনিসকে মা-মণি কী বলেন জানো? বাচার কলাকৌশল’। কথাটা যেন কেমন কেমন। গত হপ্তায় সময়ের ব্যাপারে আমরা সবাই কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে ফেলেছি। তার কারণ, আমাদের বড় আদরের ভেস্টারটোরেন ঘণ্টা-বাজা ঘড়িটা বাহ্যত যুদ্ধের প্রয়োজনে নিয়ে চলে গেছে। ফলে, দিনে বা রাত্রে ঠিক কটা বাজল আমরা জানতে পারি না। আমি এখনও কিছুটা আশা করছি যে, ওঁরা ওর একটা বদলির (টিনের তামার বা ঐ ধরনের কিছুতে তৈরি) কথা ভাববেন যা ঐ বড় ঘড়িটাকে কতকটা মনে পড়িয়ে দেবে।
ওপর তলায় বা নিচের তলায়, যখন যেখানেই থাকি, আমার পায়ের দিকে সবাই হাঁ করে চেয়ে থাকে, আমার পায়ে একজোড়া অসাধারণ ভালো জুতো (আজকালকার কথা ভাবলে) চকচক করতে থাকে। দ্রাহ্মাসবের রং দেওয়া সুয়েড-লেদারে তৈরি, বেশ উঁচু হিতোলা এই জুতোজোড়া মিপ কোথা থেকে যেন ২৭.৫০ ফ্লোরিনে কিনে এনেছিলেন। পরলে রণপায় দাঁড়িয়েছি বলে মনে হয়। এবং আমাকে অনেক বেশি ঢ্যাঙা দেখায়।
