মা-মণি উঠে পড়ে এক মুহূর্ত আমার বিছানার পাশে এসে থেমে আস্তে আস্তে দরজার দিকে হেঁটে চললেন। তারপর হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে মুখটাকে পাচার মত করে বললেন, ‘আমি রাগ করিনি। ভালবাসা জোর করে হয় না।’ বলে ঘর ছেড়ে বেরোবার সময় দেখলাম ওঁর চোখে টস্টস্ করছে পানি।
আমি স্থির হয়ে বিছানায় শুয়ে রইলাম, তক্ষুনি এটা অনুভব করতে পারলাম যে মা মণিকে আমার অমন রূঢ়ভাবে দূরে ঠেলে দেওয়াটা জঘন্য কাজ হয়েছে। কিন্তু আমি এও জানতাম, ও ছাড়া আর কোনো উত্তর আমি দিতে পারতাম না। দিয়ে কোনো ফল হত না। মা-মণির কথা ভেবে আমার খুব কষ্ট হল। কত যে কষ্ট হল বলার নয়। কেননা জীবনে এই প্রথম দেখলাম আমাকে মুখ ফেরাতে দেখে উনি সেটা গায়ে মাখছেন। যখন উনি ভালবাসা জোর করে না হওয়ার কথা বলছিলেন তখন আমি ওর মুখে দেখেছিলাম দুঃখের ছাপ।
সত্যি কথা বললে কড়া শোনায়, তবু সেটাই তো সত্যি। উনি নিজেই আমাকে দূরে ঠেলেছেন; ওঁর অবিবেচক সব মন্তব্য, যাতে আমার আদৌ হাসি পায় না এমন সব বদরসিকতা–এ সবের ফলে আমার মনের মধ্যে ঘঁটা পড়ে গেছে; এখন আর ওঁর দিকের কোনো ভালোবাসা আমার মনে সাড়া দেয় না।
ওঁর কড়া কড়া কথায় আমি যেন সিটিয়ে যাই, ওঁরও মনের মথ্যেটা সেই রকম করে উঠেছিল যখন উনি জানলেন যে আমাদের মধ্যে ভালবাসা নেই। অর্ধেক রাত অবধি উনি কান্নাকাটি করেছেন এবং সারা রাত ঘুমোননি বললেই হয়। বাপি আমার দিকে তাকান না, আর যদিও বা একদণ্ড তাকান, আমি দেখতে পাই, ওঁর চোখে লেখা আছে–তুমি কী করে ‘এত নিষ্ঠুর হতে পারো, কী করে তুমি প্রাণে ধরে তোমার মায়ের মনে এতটা দুঃখ দিতে পারো?’
ওঁরা আশা করছেন আমি ক্ষমা চেয়ে নেব; কিন্তু এটা এমন যে, এর জন্যে আমি ক্ষমা চাইতে পারি না। কেননা আমি সত্যি কথা বলেছি এবং আজ হোক কাল হোক, যে-কোন প্রকারে মা-মণিকে সেটা জানতেই হবে। মনে করা হচ্ছে মা-মণির চোখের পানি আর বাপির চাহনি আমি দেখেও দেখছি না–কথাটা ঠিক; তার কারণ, আমি যা বরাবর অনুভব করে এসেছি, সে সম্বন্ধে ওঁদের এই প্রথম হুশ হয়েছে। মা-মণির জন্যে এই ভেবে আমার দুঃখ না হয়ে পারে না যে, এতদিন বাদে এখন ওঁর এটা চোখে পড়ছে, অবিকল ওঁর ভাবটাই আমি গ্রহণ করেছি। আমার দিক থেকে আমি মুখ বুজে এবং এড়ো-এড়ো ভাবে আছি। আর আমি সত্যকে দূরে সরিয়ে রাখব না, কেন না যত বেশি দেরি করা হবে ওঁদের পক্ষে তখন শুনে তা সহ্য করা তত কঠিন হয়ে পড়বে।
তোমার আনা।
.
মঙ্গলবার, ২৭ এপ্রিল, ১৯৪৩
আদরের কিটি,
গোটা বাড়ি গাক গাঁক করে চেঁচাচ্ছে এমন ঝগড়া। মা-মণি, ফান ডানরা আর বাপি। মা মণি, মিসেস ফান ডান–সবাই সবার ওপর খাপ্পা। সুন্দর পরিবেশ, তাই না? আনার চিরাচরিত ত্রুটির ফর্দটি আবার ঝুলি থেকে বের করে আদ্যেপান্ত রটিয়ে দেওয়া হয়েছে।
মিস্টার ফোসেন ইতিমধ্যে বিনেনগাস্টহুইস হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মিস্টার কুপহুইস আবার ঠেলে উঠেছেন, সাধারণত যা সময় লাগে তার আগেই তার রক্ত পড়া বন্ধ হয়েছে। উনি আমাদের জানিয়েছেন যে, দমকল বাহিনী শুধু আগুন না নিভিয়ে গোটা জায়গা পানিতে ভিজিয়ে দেওয়ায় রেজিস্ট্রারের অফিস অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ পেয়েছে। আমি তাতে খুশি।
কার্লটন হোটেল ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গেছে। আগুনে বোমায় টাসা দুটো ব্রিটিশ বিমান ‘ওফিৎসিয়েশঁহাইমের একেবারে ওপরে এসে পড়েছিল। পুরো ফিৎসেলট্রাইসিঙ্গেলের শেষ মুড়োটা পুড়ে ছাই হয়েছে। জার্মান শহরগুলোর ওপর বিমান আক্রমণ দিন দিন জোরদার হচ্ছে। একটি রাতও আমাদের শান্তিতে কাটেনি।
না ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে আমার চোখের কোলে কালি পড়েছে। আমাদের খাওয়াদাওয়ার যা হাল হয়েছে তা কহতব্য নয়। প্রাতঃরাশের জায়গায় শুকনো রুটি আর কফি। রাতের খাওয়া–পনেরো দিন এক নাগাড়ে পালং শাক অথবা লেটুস। আলু বিশ সেন্টিমিটার লম্বা, মিষ্টি আর পচা-পচা খেতে। যারাই খাওয়া কমিয়ে রোগা হতে চায়, তাদের উচিত ‘গুপ্তমহলে’ এসে থাকা। ওপর তলার লোকেরা মুখ তেতো করে নালিশ জানাচ্ছে, কিন্তু এটাকে ততটা শোকাবহ ব্যাপার বলে আমরা মনে করি না। ১৯৪০ সালে যে লোকগুলো লড়েছে অথবা যাদের পল্টনে তলব করা হয়েছিল তাদের ‘ডের ফুরারে’র জন্যে যুদ্ধবন্দী হিসেবে কাজ করার ডাক পড়েছে। স্থলাভিযান ঠেকানোর জন্যে ওরা এটা করতে পারে।
তোমার আনা।
.
শনিবার, ১ মে, ১৯৪৩
আদরের কিটি, এখানে আমরা কিভাবে আছি এটা ভাবলেই সাধারণত আমার মনে না হয়ে পারে না যে, যেসব ইহুদী আত্মগোপন করে নেই তারা যেভাবে দিন কাটাচ্ছে সে তুলনায় আমরা তো স্বর্গে আছি। এ সত্বেও পরে আবার যখন সব স্বাভাবিক হয়ে আসবে, তখন ভেবে অবাক লাগবে যে, নিজের বাড়িতে যে-আমরা এত ঝকঝকে তকতকে হয়ে বাস করতাম, সেই আমরা কতটা নিচু স্তরে নেমে গিয়েছিলাম।
এটা বলতে আমি বোঝাচ্ছি যে, আমাদের আচার-ব্যবহারের অধঃপতন ঘটেছে। যেমন ধরো, আমরা যবে থেকে এখানে এসেছি, আমাদের টেবিলে অয়েল ক্লথ বলতে একটাই; বহুব্যবহৃত হওয়ার ফলে এখন আর সেটাকে আদৌ পরিষ্কার বলা যায় না। অবশ্য এটা বলতে হবে যে, আমি প্রায়ই একটা নোংরা ন্যাকড়া দিয়ে সেটা সাফ করার চেষ্টা করি, কিন্তু ছিঁড়েখুঁড়ে ন্যাকড়াটার আর কিছু পদার্থ নেই।
