সুতরাং আমরা সবাই শুতে চলে গেলাম; কিন্তু কারো চোখেই ঘুম এল না। বাপির সঙ্গে মা-মণি আর মিস্টার ডুসেল জেগে রইলেন এবং একটুও বাড়িয়ে বলছি না, আমিও এক ফোঁটা ঘুমোইনি বললেই হয়। আজ সকালে বাড়ির পুরুষ মানুষেরা নিচের তলায় গিয়ে দেখে এলেন সদর দরজা তখনও বন্ধ কিনা। দেখা গেল, সব কিছু নিরাপদ। আমরা সেই হাত-পা। হিম করে দেওয়া ঘটনার কথা জনে জনে বিস্তারিতভাবে বললাম। ওরা তাই নিয়ে মজা। করল, অবশ্য পরে ওসব জিনিস নিয়ে হাসাহাসি করা সহজ। একমাত্র এলি আমাদের কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনলেন।
তোমার আনা।
.
শনিবার, ২৭ মার্চ, ১৯৪৩
আদরের কিটি,
আমাদের শর্টহ্যাণ্ডের পাঠক্রম শেষ হয়েছে; এবার আমরা লিখে স্পীড তোলার চেষ্টা করছি। আমরা বেশ চালাক চতুর হয়ে উঠছি না কি? তোমাকে আরেকটু বলব আমার কালক্ষয়ী বিষয়গুলো সম্বন্ধে (নামটা আমার দেওয়া, কেননা দিনগুলো যথাসম্ভব দ্রুত পার করে দেওয়া ছাড়া আমাদের আর কিছু করার নেই–যাতে এখানকার মেয়াদ তাড়াতাড়ি শেষ হয়); পুরাণ বলতে আমি পাগল, বিশেষ করে গ্রীস আর রোমের দেবদেবী। এখানে ওঁরা মনে করেন দুদিনের শখ; নইলে আমার বয়সী কোনো নাবালক পুরাণে আসক্ত, এ জিনিস বাপের জন্মে ওঁরা শোনেননি। বহুৎ আচ্ছা, আমি না হয় প্রথমই হলাম।
মিস্টার ফান ডানের সর্দি, বরঞ্চ বলা ভালো গলায় ওঁর ছোট বীজ কুঁড়ি হয়েছে। তাই নিয়ে উনি চব্বর বাধিয়ে দিয়েছেন। ক্যামোমিল পানিতে ফুটিয়ে তাই দিয়ে গাৰ্গলিং, টিংচার অব মির দিয়ে গলায় পেণ্ট করা, বুকে নাকে, দাঁতে আর জিভে ইউক্যালিপ্টাস মালিশ করা; এবং এত কিছু করার পরও সেই প্যাঁচার মত মুখ করে থাকা।
এক জার্মান চাই রাইটার এক বক্তৃতা দিয়েছে। ১লা জুলাইয়ের আগে সমস্ত ইহুদীদের মার্জান-অধিকৃত দেশগুলো থেকে হটাবাহার হতে হবে। ১লা এপ্রিল থেকে ১লা মে-র মধ্যে উট্রেট প্রদেশ পরিষ্কার করে ফেলতে হবে (যেন ইহুদীরা হল আরশোলা)। ১লা মে থেকে ১লা জুনের মধ্যে উত্তর আর দক্ষিণ হল্যাণ্ড।’ এই হতভাগা মানুষগুলোকে একপাল রুগ্ন অবজ্ঞাত গরুছাগলের মতন নিঘিন্যে কশাইখানায় পাঠানো হচ্ছে।
একটা ছোট্ট ভালো খবর হল, অন্তর্ঘাতকেরা শ্রমিক বিনিময়ের জার্মান বিভাগে আগুন লাগিয়েছে। তার দিনকয়েক পর রেজিস্ট্রারের দপ্তরেরও একই হাল হয়। জার্মান পুলিসের উর্দি পরে তারা কোনোরকমে পাহারাদারদের বেঁধে ফেলে গুরুত্বপূর্ণ দলিল দস্তাবেজ নষ্ট করে দেয়।
তোমার আনা।
.
বৃহস্পতিবার, ১ এপ্রিল, ১৯৪৩
আদরের কিটি,
আমি কিন্তু সত্যিই এপ্রিল-ফুল করছি না (তারিখটা দেখ), বরং তার উল্টো; আমি আজ স্বাচ্ছন্দে বলতে পারি সেই প্রবাদ–’বিপদ কখনও একা আসে না।’ প্রথমে ধর, মিস্টার কুপহুইস, যিনি সব সময় আমাদের উৎফুল্ল রাখেন, তার পেট থেকে রক্ত পড়েছে; কম করে তিন সপ্তাহ তাকে বিছানায় শুয়ে থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, এলির হয়েছে ইনফ্লুয়েঞ্জা। তৃতীয়ত, আসছে সপ্তাহে মিস্টার ফোসেন যাচ্ছেন হাসপাতালে। ওঁর বোধ হয় তলপেটে আলসার হয়েছে। এবং চতুর্থত, কিছু জরুরী ব্যবসায়িক কথা হবে, যার প্রধান প্রধান বিষয় মিস্টার কুপহুইসের সঙ্গে বাপি আগেই বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করে রেখেছিলেন, কিন্তু এখন আর মিস্টার ক্রালারের সঙ্গে সে সব কথা আদ্যোপান্ত খোলাসা করে বলার সময় নেই।
যে ভদ্রলোকদের আসার কথা ছিল তারা যথাসময়ে এসে গেছেন। ওঁরা আসার আগে থেকেই কথাবার্তা কেমন হয় এই নিয়ে বাবা দুশ্চিন্তায় ছটফট করছিলেন। উনি চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলছিলেন, ‘ইস্, আমি যদি ওখানে থাকতে পারতাম আমি নিজে যদি একতলায় থাকতে পারতাম।’ ‘যাও না, মেঝেতে এক কান চেপে শুয়ে পড়, তাহলেই সব শুনতে পাবে।‘ বাপির মুখের ওপর থেকে মেঘ কেটে গেল। কাল সাড়ে দশটায় মারগট আর বাপি (একটা কানের চেয়ে দুটো কান প্রশস্ত) মেঝের ওপর যে যার জায়গা বেছে সটান লম্বা। হলেন। সকালের কথাবার্তা শেষ হল না, কিন্তু বিকেলে বাপির শরীরের অবস্থা কাহিল হয়ে পড়ায় কান-পাতার অভিযানে তাকে ইস্তফা দিতে হল। এ রকম অস্বাভাবিক আর অস্বস্তিকর ভঙ্গিতে পড়ে থাকার ফলে বাপির অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রায় অসাড় হয়ে গেল। যাতায়াতের রাস্তাটাতে গলার আওয়াজ পাওয়া মাত্র আড়াইটের সময় আমি বাপির জায়গা নিলাম। মারগট আমার সঙ্গে রইল। মাঝে মাঝে কথাবার্তাগুলো এতই তানানানা তানানানা করে চলছিল এবং এতই ক্লান্তিকর হচ্ছিল যে, ঠাণ্ডা শক্ত লিনোলিয়ামের মেঝেতে হঠাৎ আমি একদম ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। মারগটের সাহস হয়নি আমার গায়ে হাত দিয়ে ডাকার, পাছে ওরা টের পেয়ে যায়–কথা বলার তো প্রশ্নই ওঠে না। বেশ আধঘণ্টা ঘুমোবার পর জেগে উঠে আমার মুখ শুকিয়ে গেছে–হায় রে, অমন জরুরী আলোচনার এক বর্ণও যে আমার মনে নেই। বরাত ভালো, মারগট ঢের বেশি মন দিয়ে সব শুনেছিল।
তোমার আনা।
.
শুক্রবার ২ এপ্রিল, ১৯৪৩
আদরের কিটি,
মরেছি! আমার নামের পাশে আরেকটা কালো ঢেঁড়া পড়েছে। কাল সন্ধ্যেবেলায় আমি বিছানায় শুয়ে অপেক্ষা করছি বাপি এসে স্তোত্র পড়িয়ে আমাকে শুভরাত্রি বললেন। এমন সময় মা-মণি আমার ঘরে ঢুকে বিছানায় বসে খুব সস্নেহে বললেন, ‘আনা, বাপি এক্ষুনি আসতে পারছেন না, আজ রাত্তিরে তুমি কি আমার সঙ্গে স্তোত্র বলবে?’ আমি উত্তর দিলাম, ‘না, মা-মণি।’
