হাজার ঘষামাজা সত্বেও টেবিলটার যা হাল হয়েছে, তাতে কেউ আমাদের সুখ্যাতি করবে না। ফান ডানেরা সারা শীতকাল একই ফ্ল্যানেলের চাদরে শুয়েছেন; চাদরটা এখানে। কাচা সম্ভব হয় না, তার কারণ রেশনে আমরা যে সাবানের গুঁড়োটুকু পাই তাতে কুলোয় না। এবং জিনিসটাও তত ভালো নয়। বাপির ট্রাউজার জালজাল করছে আর তার টাইও ঝরঝরে হয়ে এসেছে। মার করসেট আজ ফেঁসে গেছে, ওগুলো এখন রিপু করারও বাইরে আর মারগটকে এখন দুই সাইজ ছোট ব্রেসিয়ার পরে চলতে হচ্ছে।
মা-মণি আর মারগট গোটা শীতকাল তিনটে গেঞ্জি ভাগ করে পরে চালিয়েছে, আমারগুলো এত খাটো যে, তাতে পেট পর্যন্ত ঢাকে না।
নিশ্চয় এ জিনিসগুলো এমন যা জয় করা যায়। তবু মাঝে মাঝে আমি হঠাৎ ভাবিত হয়ে পড়ি। আমার প্যান্ট থেকে বাপির দাড়ি কামানোর বুরুশ পর্যন্ত যতসব জীর্ণ ক্ষয়ে যাওয়া জিনিস নিয়ে আজ আমরা এই যে চালাচ্ছি–কীকরে আবার আমরা যুদ্ধের আগেকার পর্যায়ে ফিরে যেতে পারব?
কাল রাত্তিরে এত অসহ্য রকমের গোলাগুলি ফেটেছে যে চারবার উঠে আমি আমার নিজের বলতে যা কিছু সব এক জায়গায় করেছি। পালাবার পক্ষে অত্যাবশ্যক জিনিসগুলো আমি সুটকেসে ভরেছি।
কিন্তু মা-মণি খুব নায্যতই বলেছেন–’পালিয়ে কোথায় যাবি তুই?’ দেশের নানা অংশে ধর্মঘট চলতে থাকায় সারা হল্যাণ্ডকে নাড়া দেওয়া হচ্ছে। সুতরাং আক্রান্ত অবস্থা জারি করা হয়েছে এবং প্রত্যেককে একটি করে মাখনের কুপন কম পেতে হবে।
ছোট বাচ্চারা ভারি দুষ্ট।
তোমার আনা।
.
মঙ্গলবার, ১৮ মে, ১৯৪৩
আদরের কিটি,
জার্মান আর বৃটিশ বিমানের এক প্রচণ্ড হাওয়াই যুদ্ধ আমি চাক্ষুষ করলাম। দুর্ভাগ্যক্রমে ৪ জন দুই মিত্রপক্ষের সৈন্যকে জ্বলন্ত বিমান থেকে লাফিয়ে পড়তে হয়েছিল। হালভেগে থাকেন আমাদের দুধওয়ালা; তাদের মধ্যে একজন ডাচ ভাষা গড়গড় করে বলে। সিগারেট ধরাবার জন্যে লোকটা আগুন চেয়েছিল এবং বলেছিল যে তাদের দলে ছিল ছ’জন লোক। পাইলট যে, সে আগুনে পুড়ে মারা যায় এবং পঞ্চম লোকটি কোথাও লুকিয়ে পড়েছে। জার্মান পুলিস এসে সুস্থ নিটোল চারটি লোককে ধরে নিয়ে যায়। আমি এই ভেবে অবাক হই যে, পারাসুট নিয়ে ঐ রকম ভয়াবহ ঝাঁপ দেওয়ার পরেও কী করে ওরা মাথা ঠাণ্ডা রাখতে পেরেছিল।
এখন বেশ গরম পড়ে গেছে; এ সত্বেও তরিতরকারির খোসা আর আবর্জনা পোড়ানোর জন্যে একদিন অন্তর আমাদের আগুন জ্বালাতে হচ্ছে। জঞ্জালের ঝুড়িতে আমরা কিছু ফেলতে পারি না, কারণ আড়তের ঝাড়ুদারকে আমাদের সমঝে চলতে হয়। একটু অসাবধান হলে খুব সহজেই ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে।
যেসব ছাত্ররা এ বছর ডিগ্রি পেতে চায় কিংবা পড়াশুনো চালিয়ে যেতে চায়, তাদের সবাইকেই এই মর্মে সই করতে হবে যে, তারা জার্মানদের পক্ষাবলম্বী এবং নব-বিধানের সমর্থক। শতকরা আশীজন তাদের বিবেকবিরুদ্ধ কাজ করতে অস্বীকার করেছে। এর জন্যে স্বভাবতই তাদের ফল ভোগ করতে হয়েছে। সই-না-করা সমস্ত ছাত্রকে জার্মানিতে মেহনতী শিবিরে যেতে হবে। জার্মানে গিয়ে সবাইকে যদি হাড়ভাঙা মেহনত করতে হয়, তাহলে এদেশে নওজোয়ান বলতে কী আর অবশিষ্ট থাকবে? গোলাগুলির আওয়াজের দরুন মা-মণি কাল জানলা এটে দিয়েছিলেন; আমি ছিলাম পিমের বিছানায়।
আমাদের ওপরতলার মিসেস ফান ডান বিছানা ছেড়ে তড়াক করে লাফ দেন; যেন মুশ্চি ওঁকে কামড়ে দিয়েছে। আর তার ঠিক পরক্ষণেই এক প্রচণ্ড কান-ফাটানো আওয়াজ। শুনে মনে হল, আমার বিছানার ঠিক পাশেই যেন একটা আগুনে বোমা এসে ফেটেছে। আমি তারস্বরে চেঁচালাম, ‘আলো জ্বালো, আলো জ্বালো।’ পিম বাতিটা জ্বেলে দিল। আমি ভেবেছিলাম মিনিট কয়েকের মধ্যে অন্তত দেখব ঘরটা দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছে। তেমন কিছুই ঘটল না। আমরা তাড়াতাড়ি ছুটলাম ওপরতলায় কী ব্যাপার দেখতে। খোলা জানালা দিয়ে ফান ডান দম্পতি একটা লাল ঝলকানি দেখতে পান। মিস্টার ফান ডান ভাবলেন পাড়ায় আগুন লেগেছে এবং তার স্ত্রীর ধারণা হল আমাদের বাড়িটাতেই আগুন ধরে গেছে। বোমা ফাটার আওয়াজের আগেই হাঁটু কাঁপতে কাঁপতে ভদ্রমহিলা উঠে পড়েছেন। কিন্তু ঘটনার ওখানেই ছেদ পড়ায় আমরা শুটিসুটি মেরে যে যার বিছানায় ফিরে এলাম।
মিনিট পনেরো যেতে না যেতেই আবার গোলাগুলি শুরু হয়ে গেল। মিসেস ফান ডান সঙ্গে সঙ্গে সটান লাফিয়ে উঠলেন এবং স্বামীর সাহচর্যে শান্তি না পেয়ে তিনি হাড় জুড়োবার জন্যে নিচের তলায় মিস্টার ডুসেলের ঘরে চলে এলেন। ডুসেল তাঁকে ‘এসো বাছা, আমার কাছে শোও’ বলে আপ্যায়ন করায় আমরা আর হাসি চেপে রাখতে পারলাম না। কামানের গর্জন আর আমাদের বিচলিত করল না, আমাদের ভয় তখন চলে গেছে।
তোমার আনা।
.
রবিবার, ১৩ জুন, ১৯৪৩
আদরের কিটি,
আমার জন্মদিন উপলক্ষে বাপির লেখা কবিতাটি এত সুন্দর যে তোমাকে না শুনিয়ে পারছি না। পিম সাধারণত পদ্য লেখেন জার্মান ভাষায়, মারগট নিজে যেচে তার অনুবাদ করেছে। মারগটের অনুবাদ খোলতাই হয়েছে কিনা তুমি নিয়ে বুঝে দেখ। বছরের ঘটনাবলীর একটা সংক্ষিপ্তসার দেওয়ার পর, কবিতায় বলা হচ্ছে–
এখানে কনিষ্ঠ বটে, ছোট নও এখনও তা বল
জীবন অতিষ্ঠ তবু, যে কারণে সমান সকলে
গুরু বনে গিয়ে কানে মন্ত্র দিতে চায় এই মতো–
আমরা ঝানু, জেনে নাও কত ধানে চাল হয় কত।
এসব করেছি আগে, সুতরাং আমরা সব জানি।
বড়দা সদাই ভালো, জেনো এই মহাজনবাণী।
জীবনের শুরু থেকে এই হল নিয়ম, অন্তত–
চোখেই পড়ে না দোষ নিজেদের, এত ছোট ছোট।
ফলে, খুব স্বচ্ছন্দেই দেওয়া যায় অন্যদের গাল,
অন্যদের ত্রুটিগুলো হয়ে ওঠে তিল থেকে তাল।
আমরা হই মাতাপিতা, আমাদের ওপর চ’টো না।
তোমাকে দরদ দিয়ে ন্যায্য ভাবে করি বিবেচনা।
সংশোধন মেনে নিও মাঝে মাঝে, হোক অনিচ্ছায়
যদ্যপি তোমার মনে হবে তেতো বড়ি গেলো প্রায়।
এটাই প্রশস্ত বলে জেনো যদি শান্তি রাখতে হয়।
যদ্দিন ভোগান্তি আছে করে যেতে হবে কালক্ষয়।
বই মুখে করে বসে পড়ো তুমি সারাদিন প্রায়
এভাবে বেঁচেছে এই পৃথিবীতে কে কবে কোথায়?
কিছুতে বিরক্তি নেই, স্নিগ্ধ হাওয়া আনো তুমি নিজে
তোমার একমাত্র খেদ, গায়ে দিই কী যে!
আমার নিকার নেই, পরিধেয় সমস্তই টেঁটি
গেঞ্জিতে বাঁচে না লজ্জা, হায় হায়, কী করে যে বেটি!
জুতো পায়ে দিতে গেলে কাটতে হয় পায়ের আঙুল,
ভেবে ভেবে সোনামণি পাই না যে কূল।’
