আমার এই রকমই সন্দেহ, মিঃ আলডিন। কিন্তু সন্দেহ হলেই আইনতঃ আমরা তাকে। গ্রেফতার করতে পারি না।
ম্যাজিস্ট্রেট কথাটা স্বীকার করলেন। বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন, সত্যিই তার বিরুদ্ধে আমরা এমন কোনো প্রমাণই পাচ্ছি না যে, যার জোরে তাকে এই মামলার আসামী হিসেবে গ্রেপ্তার করা যায়।
–সত্যিই যদি তিনি অপরাধী হন। বললেন পোয়ারো।
–আপনি এখনও যদি বলছেন।
-হা মঁসিয়ে কমিশনার, এখনও আমি যদি বলছি।–কথাটা বেশ জোর দিয়েই বললেন পোয়ারো।
কথাটা প্রথমে কমিশনারের খারাপ লাগল কিন্তু পরক্ষণেই তিনি ভাবলেন যে, সত্যিই অনুমানের ওপর নির্ভর করে কাউকে আগে থেকেই অপরাধী বলে ধরে নেওয়া যায় না বা উচিৎ নয়।
-আপনার কথাই ঠিক মঁসিয়ে। এরপর আপনি কি বলতে চান। তার জন্যে আমার খুবই আগ্রহ হচ্ছে।
–এরপর যা বলতে চাইছি সেটা মোটেই গুরুত্বপূর্ণ কথা নয়। সত্যিই যদি কাউন্ট অপরাধী হয়; সে তাহলে একটা আত্মরক্ষার পথও বেছে রেখেছে। কাউন্ট-এর মতো চতুর লোক আগে থেকে সাবধান না হয়ে কোনো কিছু করেছে বলে মনে হয় না। কিন্তু তা সত্ত্বে কোনো একটি বিশেষ কারণের জন্য তার ওপরে পুরোপুরি সন্দেহ আসছে না।
–কি সে কারণ?
মনস্তত্ত্ব।
–মনস্তত্ত্ব, বলেন কি!
–ঠিকই বলছি। কাউন্ট একটা লম্পট। স্বীকার করি এ কথা। কাউন্ট জোচ্চোর, তাতেও ভুল নেই। কাউন্ট নারী লোভী তাও জানি। সে হার্ট অফ ফায়ার চুরি করার মতলব করেছিল সেও ঠিক। কিন্তু সে যে হত্যাকারী, একথা স্বীকার করতে পারছি না। এই ধরণের লোকেরা স্বভাবতই ভীরু হয়। কোনো রকম বিপদের ঝুঁকি নিতে চায় না তারা। ছলচাতুরী আর জাল জোছুরী যাদের পেশা তারা হত্যা করে না। ধরা পড়ে ফাঁসীকাষ্ঠে প্রাণ দিতে হবে–তাই তারা একাজ থেকে সব সময় দূরে থাকে।
ম্যাজিস্ট্রেট কিন্তু মেনে নিতে পারেন না তার কথা। তিনি বললেন, আমার অভিজ্ঞতা কিন্তু অন্যরকম। আমার বিচারক জীবনে এমন কেসও আমি দেখেছি যে অভিজাত বংশের লোকেরাও সময় সময় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। অতএব আপনার সঙ্গে আমি একমত নই।
–বিশ্বাস অবিশ্বাসের প্রশ্নে মতভেদ নিশ্চয়ই থাকতে পারে। আমি শুধু আমার ব্যক্তিগত মতমতই ব্যক্ত করেছি। তবে সঙ্গে সঙ্গে আমি এও বলতে চাই যে, কাউন্টকে আমি জালে ফেলতে পারলে খুবই খুশী হব। আমি চাই ঐ রকম ভদ্রবেশী শয়তানকে আদালতে হাজির করে পুলিশ তার মুখোশ খুলে দিক। আশা করি আপনিও তাই চান।
নিশ্চয়ই।
–আপনার মতামত কি মিঃ আলডিন?
-আমিও চাই শয়তানটাকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করা হোক।
ম্যাজিস্ট্রেট বললেন, কিন্তু বর্তমানে আমাদের হাতে এমন কোনো প্রমাণ নেই যার বলে ওকে গ্রেপ্তার করা যায়। তবে ওর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রমাণ সংগ্রহ করার জন্যে আমি চেষ্টা করবো। আজই বিভিন্ন স্থানে টেলিগ্রাম করব ওর খবরা-খবর সংগ্রহ করতে।
–আপনি যদি চান আমিও এ ব্যাপারে আপনাকে সাহায্য করতে রাজী আছি। বললেন পোয়ারো।
–আপনার সাহায্য পেলে আমরা খুবই খুশী হব। আপনি তাহলে কবে থেকে কাজে নামতে চান?
-আজ থেকেই।
.
১৪.
পোয়ারোর কাজ শুরু হলো
মঁসিয়ে এরকুল পোয়ারো তার কাজ শুরু করলেন। তার কাজের ধরন একেবারেই আলাদা। এটি হলো ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ। এবং এই পদ্ধতিতেই তিনি কাজ শুরু করলেন।
-আপনার হয়তো মনে হচ্ছে যে কাউন্ট দ্য রোচিই মাদাম ক্যাথারিন-এর হত্যাকারী, তাই না?–পোয়ারো বললেন।
-হ্যাঁ, আমার দৃঢ় ধারণা ওই শয়তানই রুথকে হত্যা করেছে।
–কিন্তু আরও একটি ঘটনা আপনি একেবারেই ছেড়ে দিচ্ছেন যে।
–কোনো ঘটনা?
ঘটনাটা হলো –মিঃ ক্যাথারিনও ওই ট্রেনে ভ্রমণ করেছিলেন।
–আপনি ড্রেককে কি সন্দেহ করেন?
–না। এখনও সেরকম কিছু মনে করছি না। তবে ইতিমধ্যেই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। পুলিশের প্রিফেক্ট নিজে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন।
–তার কাছে কি বলেছে সে?
–তিনি বলেছেন তার স্ত্রী যে ওই ট্রেনে ভ্রমণ করছিলেন সে খবর তিনি জানতেন না।
-আমারও তাই মনে হয়। কারণ সে যদি জানত যে রুথ এই ট্রেনে ভ্রমণ করছে, তাহলে সে তার ফিয়াসেকে নিয়ে একই ট্রেনে ভ্রমণ করত না।
–ফিয়াসে! –বিস্ময়ের সঙ্গে বেরিয়ে এলো কমিশনারের মুখ থেকে; কে সে?
–তার নাম মিরেলি।–আলডিন বললেন, শুনেছি সে নাকি একজন নাম করা নাচিয়ে।
–ঠিকই শুনেছেন। নাচিয়ে হিসেবে সত্যিই তার নাম আছে।–বললেন কমিশনার।
–আর একটা কথা আমি যোগ করতে চাই।–পোয়ারো বললেন, কথাটা হলো, মিরেলিকে পেতে হলে জলের মতো টাকা ব্যয় করতে হয়। আর একটা কথা জানতে চাইছি।
–কি জানতে চান?
–স্ত্রীর মৃত্যুতে আর্থিক দিক দিয়ে কোনো লাভ হয়েছে কি?
-তা হয়েছে বৈকি! ব্যাঙ্কে রুথ-এর নামে ত্রিশ লক্ষ পাউণ্ড জমা আছে। ও টাকা এখন তারই প্রাপ্য। অথচ রুথ যদি কোনো উইল করে যেত তাহলে ও টাকার উত্তরাধিকারী হত উইলের বেনিফিসিয়ারী। তবে আমি যতদূর জানি রুথ কোনো উইল করেনি।
–অর্থাৎ তার মৃত্যুতে মিঃ ক্যাথারিন ত্রিশ লক্ষ টাকা পেয়ে যাচ্ছেন। তাই না?
–হ্যাঁ। সেই রকমই।
–মিঃ ক্যাথারিন-এর আর্থিক অবস্থা কি রকম?
–খুবই খারাপ। দেউলেও বলা চলে। আমি বিশ্বস্ত সূত্রে খবর পেয়েছি যে, দেনায় একেবারে ডুবে আছে সে।
–মাদাম ক্যাথারিন যে ডাইভোর্সের মামলা রুজু করতে যাচ্ছিলেন, এ খবর তিনি জানতেন কি?
