দাঁড়ান ভাবতে দিন। আচ্ছা, খুন করিনি আমি। আর ঐ এলসা বেচারীও করেনি। মেয়েটা রাগে পাগল হয়ে গিয়েছিল অ্যামিয়াস মারা গেলে। আর কে ছিলো ওখানে? মেরিডিথ ব্লেক? উনি খুব ভক্ত ছিলেন দিদির। অবশ্য সেটা হতে পারে একটা উদ্দেশ্য। হয়তো অ্যামিয়াসকে সরিয়ে দিয়ে উনি বিয়ে করার কথা চিন্তা করে থাকতে পারেন দিদিকে। অবশ্য তাহলে অ্যামিয়াসকে উনি সোজাসুজি বলতে পারতেন, এলসাকে নিয়ে তুমি কেটে পড়ো। ক্যারোলিনকে আমি বুঝিয়ে সুঝিয়ে…। না, কিছুতেই আমি খুনি মনে করতে পারি না মেরিডিথকে। বড্ড ভীরু আর সাবধানী বড় বেশি। কে ছিলো আর?
স্মরণ করিয়ে দিলো পোয়ারো, মিস উইলিয়ামস? ফিলিপ ব্লেক?
অ্যাঞ্জেলার মুখ কয়েক মুহূর্তের জন্যে হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো, মিস উইলিয়ামস? খুন করতে পারে বলে কল্পনাও করা যায় না, বাড়ির গভর্নেস। সব সময়ে মিস উইলিয়ামস আত্মমর্যাদাসম্পন্ন আর সৎ চরিত্রের মহিলা ছিলেন।
আবার একটু থেমে বলতে লাগলেন, অবশ্য ক্যারোলিনকেও উনি খুব ভক্তি শ্রদ্ধা করতেন, উনি সব কিছু করতে পারতেন দিদির জন্যে। মিস উইলিয়ামস তাছাড়া ঘেন্না করতেন অ্যামিয়াসকে। উনি উগ্র সমর্থক ছিলেন নারী স্বাধীনতার। আর ভীষণ অপছন্দ করতেন পুরুষদের। এটাই কি খুন করার পক্ষে যথেষ্ট যুক্তি? নিশ্চয়ই নয়।
পোয়ারো বললো, মিস ওয়ারেন আমার আগ্রহ ক্রমশঃ বেড়ে যাচ্ছে আপনার কথায়। প্রশ্ন করি একটা, আপনি কেন একথা বললেন?
কিছুই বলছি না নির্দিষ্ট করে। যেটুকু আমার মনে আছে ফিলিপ ব্লেক সম্বন্ধে তার ভিত্তিতে বলতে পারি বেশ স্থল আর স্বার্থপর ধরনের মানুষ ছিলেন উনি।
এবং স্থূল আর স্বার্থপর মানুষরা খুনটুন করতে পারে এরকম ধারণা একটা আপনার আছে?
অসুবিধা নিজের দূর করার জন্যে যে কোনো নিষ্ঠুর পথ এই শ্রেণীর লোক অবলম্বন করতে পারে। তাই না?
হা মনে হয় ঠিকই বলেছেন আপনি। একটা এরকম ব্যাপার আছে। কিন্তু মনে হয় আমার আরও ঘটনা কিছু আছে। কি হতে পারে ফিলিপ ব্লেকের অভিসন্ধিটা?
অ্যাঞ্জেলা ওয়ারেন কোনো উত্তর সঙ্গে সঙ্গে দিলেন না। মেঝের দিকে ভ্রূকুটি করে তাকিয়ে রইলেন।
পোয়ারো বললো, অ্যামিয়াস ক্রেলের ভীষণ প্রিয় বন্ধু ছিলেন তো উনি, তাই না?
ঘাড় নেড়ে অ্যাঞ্জেলা সায় দিলেন।
কিন্তু কেমন যেন মনে হচ্ছে আমার মিস ওয়ারেন, এমন ঘটনা কিছু আছে যেটা আমাকে বলছেন না আপনি। দুজনের মধ্যে কি ঐ এলসা মেয়েটাকে নিয়ে রেষারেষি ছিলো?
সজোরে ঘাড় নেড়ে অ্যাঞ্জেলা বললো, না, না, ফিলিপ না।
তাহলে কি ব্যাপারটা? অ্যাঞ্জেলা খুব ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন, বেশ কয়েক বছর কোনো কোনো ঘটনা হঠাৎ মনের মধ্যে কি করে ভেসে ওঠে তা কি আপনি জানেন? কথার মানেটা আমার বুঝিয়ে বলছি। বয়েস যখন আমরা এগারো, একজন তখন আমাকে একটা গল্প বলেছিলাম। আমি গল্পটার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারিনি। আর মাথাও ঘামাইনি সে নিয়ে, ভুলেই গিয়েছিলাম গল্পটা। একটা নাটক বছর দুয়েক আগে দেখতে দেখতে হঠাৎ মনে পড়ে গেলো গল্পটা। আর এতো আমি চমকে উঠেছিলাম যে আমার মুখ দিয়ে বেশ জোরে কথা বেরিয়ে এলো, আরে চালের পুডিং নিয়ে সেই বাজে ঘটনার গল্পটার মানে যে বেশ বুঝতে পারছি এখন। অথচ কোনো প্রত্যক্ষ যোগাযোগের আভাস নেই ঐ দুটি ঘটনার মধ্যে।
পোয়ারো বললো, মিস ওয়ারেন আমি আপনার কথা বুঝতে পারছি।
তাহলে যা বলতে যাচ্ছি এখন আপনি সেটাও বুঝতে পারবেন। একটা হোটেলে একবার ছিলাম। হাঁটছি লম্বা বারান্দা দিয়ে হঠাৎ এক পরিচিত মহিলা একটা শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন, ওঁর ওটা কিন্তু শোবার ঘর ছিলো আর অন্যের শোবার ঘর থেকে তিনি যে বেরিয়ে এলেন সে কথা পরিষ্কার ফুটে উঠেছিলো মুখের ভাবে।
আর অ্যাল্ডারবেরিতে সঙ্গে সঙ্গে একদিন রাতে ফিলিপ ব্লেকের ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে দেখা ক্যারোলিনের মুখের ভাবটার অর্থ বুঝতে পেরে গিয়েছিলাম।
কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলো পোয়ারো, অ্যাঞ্জেলা তাকে বাধা দিয়ে বলতে থাকলেন, আমি কিছুই সে রাতে বুঝতে পারিনি। যতটুকু জানে ওই বয়সের মেয়েরা, বোঝে, তাই জানতাম আমিও বুঝতাম, কিন্তু ঐ ঘটনার সঙ্গে মেলাতে পারিনি তা। আমার কাছে ক্যারোলিনের বেরিয়ে আসাটা ফিলিপ ব্লেকের শোবার ঘর থেকে খুবই সাধারণ ঘটনা বলে মনে হয়েছিলো। মিস উইলিয়ামস বা আমার শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে আসার মতোই একটা স্বাভাবিক ঘটনা। তবে এমন একটা অদ্ভুত ভাব ক্যারোলিনের চোখে মুখে দেখেছিলাম যার অর্থ প্যারিসের হোটেলে মুখের ভাব ওই মহিলার দেখার পর বুঝতে পেরেছিলাম ঠিক মতো।
আস্তে আস্তে পোয়ারো বললো, মিস ওয়ারেন আপনি যা বলছেন তা আমাকে চমকে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। আমি কথা বলছি ফিলিপ ব্লেকের সঙ্গে, মনে হয়েছিলো আমার আপনার দিদিকে উনি ভীষণ ঘেন্না করেন এবং আগেও করতেন।
অ্যাঞ্জেলা বললেন, জানি। বুঝিয়ে বলতে পারবো না আমার কথাটা, তবে ঘটেছিলো ঘটনাটা।
আস্তে আস্তে পোয়ারো মাথা নাড়লো। ফিলিপ ব্লেকের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের পর ওর যেন কেমন মনে হয়েছিলো কোথায় যেন বলা হচ্ছে অসত্য। মাত্রাতিরিক্ত বিদ্বেষটা যে ক্যারোলিনের বিরুদ্ধে অস্বাভাবিক সেটা মনে হয়েছিলো পোয়ারোর।
কথাবার্তার অংশ বিশেষ মেরিডিথ ব্লেকের সঙ্গে তার মনে পড়তে লাগলো। ভীষণ ভেঙে পড়েছিলো অ্যামিয়াসকে বিয়ে করাতে…ওদের বাড়ির দিকে একবছরেরও বেশি মাড়ায়নি।
