মিস জনস্টনের সঙ্গে তার সম্পর্ক সব সময় ভালো ছিল কি?
হ্যাঁ, এক এক সময় তার স্বভাব অত্যন্ত বিরক্তিকর বলে মনে হয়। কিন্তু সত্যি সে কিছু মনে করে না। সামনের দিকে ঝুঁকে পড়লো প্যাট্রিসিয়া লেন। দু-একটা জিনিস আপনাকে বোঝাবার চেষ্টা করব বুঝতেই পারছেন ইনসপেক্টর, আমি নিজেল চ্যাপম্যানের সম্বন্ধে বলছি। সে ইচ্ছা করেই তার শক্রবৃদ্ধি করেছে। আজ আমি স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছি সে ভীষণ কঠিন স্বভাবের লোক ছিল। এর ফলে অনেকেই তার বিরুদ্ধে ছিল। তাছাড়া সে সব সময় ঠাট্টাইয়ার্কি করত। কিন্তু এসব ঠাট্টাইয়ার্কি এমন বীভৎস পর্যায়ে চলে যেত যে লোকে তখন তাকে কিছুতেই সহ্য করতে পারত না। কিন্তু বাস্তবে সে ছিল অসুখী। কিন্তু তার বাইরের কঠিন দিকটা লোকে দেখে তার ভেতরের কোমল ও দুর্বল দিকটার কথা কেউ ভেবেও দেখে না। কিন্তু জানেন ইনসপেক্টর আমি দেখেছি, তার জন্য মনে মনে খুব কষ্টও পাই
আহ, বললো ইনসপেক্টর। এটা তাদের পক্ষে দুর্ভাগ্যও বটে।
হ্যাঁ। কিন্তু কি জানেন ইনসপেক্টর, সত্যি তারা সাহায্য করতে পারে না। একেবারে ছেলেবেলা থেকে দুর্ভাগ্য তার সাথী হয়ে গেছে। নিজেদের বাড়ির জীবন খুবই অসুখী। তার বাবা খুবই নিষ্ঠুর ছিলেন। নিজেকে বুঝতে চাইতেন না। আর তার বাবা তার মার সঙ্গে খুবই খারাপ ব্যবহার করেন। ছেলেবেলাতেই তার মা মারা যান। তারপর একদিন নিজেল তার বাবার সঙ্গে ঝগড়া করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে, অজানা পথে। তার বাবা তাকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, নিজেলকে সে এক পেনিও দেবে না। তার তোয়াক্কা করে না নিলে। তার স্বাস্থ্যও ভালো নয়, তার মনটা চমৎকার। এখানে এসে থামল প্যাট্রিসিয়া। দীর্ঘ সময় ধরে এক নাগাড়ে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য হাঁপিয়ে উঠেছিল সে।
ইনসপেক্টর শার্প চিন্তিত হয়ে তার দিকে তাকাল। বহু প্যাট্রিসিয়া লেনদের দেখেছে সে, কিন্তু প্রেমিকদের এমন গভীর প্রেমের কথা সে এর আগে কখনো শোনেননি। অবাক হয়ে শার্প ভাবে, আচ্ছা সিলিয়া অস্টিনের প্রতি নিজেল চ্যাপম্যান আকর্ষণ বোধ করেনি তো। সেটা সম্ভব নয়, আবার একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আর তাই যদি হয়, ভাবলো সে, প্যাট্রিসিয়া লেন নিশ্চয়ই ক্ষুব্ধ হয়ে থাকবে। আর এমনি ক্ষুব্ধ হয় যে, সিলিয়াকে আঘাত করার কথাও তার মনে হয়ে থাকবে। তার সেই ক্ষোভ, বিরক্তি এমনি চরমে উঠে থাকবে যে, শেষ পর্যন্ত সেকি সিলিয়াকে খুন করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে? যে কারণেই হোক, নিশ্চয়ই নয়। কারণ কলিন ম্যাকনারের সঙ্গেই তার বাগদানের খবরটা শোনার পর অবশ্যই তাকে খুন করার মোটিভ বলতে আর কিছু থাকার কথা নয়। তাই ইনসপেক্টর শার্প তার সন্দেহের তালিকা থেকে প্যাট্রিসিয়া লেনকে বাদ দিয়ে এবার জিন টমকিনসনের খোঁজ করল।
.
০৮.
মিস টমকিনসনকে দেখতে কঠোর প্রকৃতির যুবতীর মতো, বয়স সাতাশ, শার্পের সামনে বসে সে প্রথমে বললো, হ্যাঁ, ইনসপেক্টর, বলুন আপনার জন্য কি করতে পারি?
মিস টমকিনসন, আমার মনে হয় না, এই বিয়োগান্ত ঘটনার ব্যাপারে আপনি আমাদের সাহায্য করতে পারবেন।
সত্যি এটা খুবই বেদনাদায়ক ঘটনা। প্রথমে মনে হয়েছিল, নেহাতই আত্মহত্যা করার ঘটনা, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এটা একটা খুনের ঘটনা–এখানে সে নীরবে মাথা নাড়ল।
আমরা মোটামুটি নিশ্চিন্ত হয়ে গেছি, সিলিয়া কখনোই নিজে বিষ খেতে পারে না, শার্প বলল। সেই বিষ কোথাথেকে আসতে পারে আপনি জানেন?
মাথা নাড়ল জিন। জেনেছি সেন্ট ক্যাথেরিন হাসপাতাল থেকে, সেখানে সে কাজ করত। কিন্তু আত্মহত্যার ঘটনা বলেও তো মনে হতে পারে। কিন্তু সিলিয়া ছাড়া কে সেই বিষ জোগাড় করতে পারে?
অনেকেই, বললো ইনসপেক্টর শার্প, অবশ্য তারা যদি তাকে খুন করার জন্য বদ্ধপরিকর হয়ে থাকে। এমনকি আপনি নিজেও মিস টমকিনসন।
সত্যিই ইনসপেক্টর শার্প! জিনের কথায় ঘৃণা প্রকাশ পাচ্ছিল।
ভালো কথা, মিস টমকিনসন, আপনি প্রায়ই তো ডিসপেনসারিতে যান, যান না?
হ্যাঁ যাই। সেখানে মিলড্রেড ক্যারির সঙ্গে দেখা করতে চাই। কিন্তু কখনোই বিষের কাপবোর্ডে হাত দেওয়ার স্বপ্নও আমি দেখিনি।
কিন্তু বাস্তবে আপনি সেটা করলেও করতে পারেন।
না অবশ্যই সেরকম আমি কিছু করতে পারি না।
হ্যাঁ, আমি বলছি আপনি পারেন। তাহলে শুনুন মিস টমকিনসন, মনে করুন আপনার বন্ধুটি কাজে ব্যস্ত ছিলো। বাইরের রোগীদের দেখার জন্য একটি মেয়ে ডিসপেনসারি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। অপর দুজন ডিসপেনসার তখন ঘরের সামনের দিকে ছিল। আর আপনি তখন ঘুরতে ঘুরতে বিষের কাপবোর্ডের সামনে যান আর মরফিয়ার একটা বোতল পকেটে ঢুকিয়ে দেন। সেই দুজন ডিসপেনসার যা ভাবতে পারে না, আপনি তাই করলেন।
ইনসপেক্টর, আপনার কথাগুলি আমার রাগ বাড়িয়ে দিচ্ছে এ এক বাজে অভিযোগ।
কিন্তু এটা অভিযোগ নয়। সেরকম কিছুই নয়। আপনি আমাকে ভুল বুঝবেন না। আপনি বলছেন, এ কাজ আপনার দ্বারা সম্ভব নয়, আর আমি বলছি, হ্যাঁ সম্ভব। তা বলে আমি কখনো বলছি না যে আপনি সেটা করেছেন। আর কেনই বা করতেন তা বলুন?
ঠিক তাই। ইনসপেক্টর শার্প আপনি কেন বুঝতে পারছেন না, সিলিয়া আমার বন্ধু ছিল।
এমন বহু ঘটনা আছে যে বন্ধুরাই তাদের বিষ খাইয়ে হত্যা করেছে। এক এক সময় এমন কতগুলো প্রশ্ন থাকে আমরা নিজেরাই নিজেদেরকে জিজ্ঞাসা করে থাকি। বন্ধু তখন আর বন্ধু থাকে না। বুঝলেন?
