পোয়ারোকে সবাই ধরে বসল। পেয়ারো মৃদু হেসে গোঁফে হাত বোলাতে লাগলেন। বললেন, ও না করে থাকলে খুনটা কে করেছে?
-হ্যাঁ, হ্যাঁ। বলুন আপনি। ও না করে থাকলে খুন করেছে কে?
লরা আপওয়ার্ড নীরস স্বরে বললেন, আপনাদের প্রশ্নে উনি কি রকম বিব্রতবোধ করছেন। আমাদের মধ্যে হয়ত কোনো একজনকেই খুনী বলে উনি সন্দেহ করেন।
ওরে বাবা আমাদের কেউ। চেঁচিয়ে উঠল সকলে।
মিসেস আপওয়ার্ডের চোখাচোখি হল পোয়ারোর সঙ্গে, ভদ্রমহিলার চোখে কৌতুক ছাড়া আরও কিছু ছিল কি? চ্যালেঞ্জ?
রবিন যেন মজার স্বরে বলল, আমাদের মধ্যে কাউকে? বাঃ মন্দ নয় তা। আচ্ছা মরিন, বল দেখি এবার তুমি সেদিন কোথায় ছিলে?
পোয়ারো তারিখটা মনে করিয়ে দিলেন-বাইশে নভেম্বর রাত্রে।
–তা তো মনে নেই আমার। মরিন বললে।
–এতদিন বাদে সঠিক ভাবে তা কেউই মনে করতে পারে না। সমর্থন জানালো শেলা।
রবিন বলল, মনে আছে আমার। আমি সেদিন কোলপোর্ট থিয়েটারে ব্যস্ত ছিলাম নাটক নিয়ে আলোচনায়। সেই আলোচনা চলছিল বহুক্ষণ। আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল গলসওয়ার্দির নাটক সিলভারবক্স-এর পরিচারিকার চরিত্র। মিসেস ম্যাগিনটির মৃত্যুসংবাদ পরদিন বারবার আমাকে নাটকের ঐ চরিত্রটার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিল।
-হ্যাঁ, হা, মনে পড়ছে আমারও, শেলা বললেন। তুমি সেদিন বলেছিলে একা থাকবেন তোমার মা কারণ সে রাত্রে জ্যানেট বাড়ি থাকবে না। তাই আমি রাত্রের খাওয়া সেরে ওঁকে খানিক সঙ্গ দিতে এসেছিলাম। যদিও ডেকে ডেকে কোনো সাড়া পায়নি ওর।
লরা খানিকটা ভেবে নিয়ে বললেন, সেদিন তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েছিলাম মাথার যন্ত্রণা হচ্ছিল বলে। আমার আবার ঘরটা পেছনে, বাগানের দিকে।
আবার শুরু হল শেলার কথা।
খুন হবার কথা পরদিন জানতে পেরে আমার কেমন ভয় ভয় করছিল। এমন তো হতে পারে যে আমি রাস্তায় হত্যাকারীকে দেখেছি।
-এখনো আমার মনে পড়ছে না যে, আমি ঠিক কি কি করেছিলাম সেদিন। বলে চললেন মরিন, রুটিওয়ালা পরদিন সকালে আমাকে বলছিল মিসেস ম্যাগিনটির একটা কিছু হয়েছে। তার আগে দেরি দেখে যথারীতি ভাবছিলাম উনি কাজে আসছেন না কেন? উঃ কি সাংঘাতিক। প্রায় শিউরে উঠল মরিন।
তখনো লরার চোখ পোয়ারোর মুখের পর।
নিজের মনে পোয়ারো ভাবছিলেন। অত্যন্ত বুদ্ধিমতী ভদ্রমহিলা, নির্মম প্রকৃতির এবং স্বার্থপরও। কোনো কিছু করতে বসলে তা দৃঢ়তার সঙ্গে করার মত ওর মনের জোর আছে।
শেলা মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করলেন, কোনো সূত্র পেয়েছেন আপনি?
উৎসাহিত হলেন জনি সামারহেস-হা, ঠিক। কোনো সূত্র? এটাই তো গোয়েন্দা গল্পে আসল। একমাত্র গোয়েন্দা ছাড়া সূত্র থেকে আসল তথ্য আর কেউ উদ্ধার করতে পারে না।মশাই বলুন না যে কোনো একটা সূত্র, যা জেনেছেন আপনি।
হাসিমুখে সকলে পোয়ারোর দিকে তাকালেন তাদের কাছে এটা যেন অনেকটা মজার ব্যাপার (নিশ্চয়ই হত্যাকারী তা ভাবছে না)। কিন্তু আসলে এটা তো আর মজার ব্যাপার নয়। বড় ভয়ংকর জিনিস হত্যা।
পোয়ারো হঠাৎ পকেট থেকে সেই চারখানা ফটো বের করে রাখলেন টেবিলের ওপর। সূত্র চাইছিলেন আপনারা তাই না? এই সেই সূত্র। তিনি নাটকীয়ভাবে বললেন, একসঙ্গে সবাই টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ল। বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য শোনা গেল।
–দেখ দেখ।
–কি বিশ্রী ফটো।
—টুপিটাও বিশ্রী।
-আরে, গোলাপের ছড়াছড়ি দেখেছ?
–কারা এরা?
–কি বিচ্ছিরি বাচ্চাটা।
–কেমন অদ্ভুত সব কিছুই।
এককালে কিন্তু এই ফটোর ভদ্রমহিলা দেখতে ভালোই ছিলেন।
–কেমন করে এ ফটোগুলো সূত্র হতে পারে?
চারদিক থেকে ঝুঁকে পড়া মুখগুলোর ওপর পোয়ারো নিজের দৃষ্টি বুলিয়ে নিলেন। জিজ্ঞেস করলেন, কেউ কি আপনারা ফটোর কাউকে চিনতে পারছেন? যে কোনো একজনকেও, সনাক্ত করতে পারছেন?
সনাক্ত?
–বলতে চাইছি আমি, এই ফটোর মত কোনো ফটো বা চেহারা আগে কোথাও দেখেছেন বলে কি কারও মনে হচ্ছে আপনাদের? হা, মিসেস আপওয়ার্ড, কিছু বলবেন আপনি, এই ফটো সম্বন্ধে?
লিলি একটু দ্বিধাগ্রস্তভাবে গ্যাম্বলের ছবিখানার ওপর আঙুল রেখে লরা বললেন, এই ধরনের, … মনে হচ্ছে যেন কোথায় দেখেছি….. কিন্তু কোথায়?
–আপনি দেখেছেন এরকম ফটো? কবে?
–খুব সম্প্রতি… কিন্তু কোথায়, মনে হচ্ছে যেন কোথায় দেখেছি… কিন্তু কোথায়? মনে করতে পারছি না। কিন্তু নিশ্চিত আমি, এই রকমই ঠিক দেখেছি।
কুঞ্চন দেখা গেল মিসেস অলিভারের কপালে। উঠে দাঁড়িয়ে শেলা বললেন, আমাকে এবার যেতে হবে মিসেস আপওয়ার্ড। আমার ওখানে আপনার চায়ের নিমন্ত্রণ রইল। একদিন কিন্তু আসতে হবে।
–নিশ্চয়ই, যদি আমাকে রবিন নিয়ে যেতে পারে।
–নিশ্চয়ই মা, সেটুকু জোর আছে আমার গায়ে। তবে ওয়েদারবিদের বাড়িতে যাবার দিন হঠাৎ পিছলে গিয়েছিলাম, পথে বেশ কাদা ছিল।
–আঃ, বলে লরা হঠাৎ শব্দ করে উঠলেন।
–মামণি কি হল?
–কিছু না, থামলে কেন?
ব্যাপারটা পাহাড়ের গা বেয়ে ওঠার সময় ঘটেছিল। তোমার হুইল চেয়ারটা প্রথমে পিছলে গেল, তারপর আমি, উঃ ভাবিনি, রক্ষা পাব সে যাত্রা।
হাসতে হাসতে সকলে বিদায় নিলেন। চিন্তান্বিতভাবে পোয়ারো হাঁটা দিলেন। তিনি কি ফটোগুলো দেখিয়ে ভুল করলেন? অনেকর মুখ দিয়েই নেশার ঝোঁকে বেফাঁস কথা কিছু বেরিয়ে যেতে পারে। তিনি যে নাটকীয়ভাবে সকলের সামনে ফটোগুলো বের করে দেখালেন, তার পেছনেও কি ঝোঁক ছিল নেশার? কে জানে।
