কি ভেবে আবার তিনি উল্টোদিকে হাঁটতে শুরু করলেন। ভেতরে গেট খুলে ঢুকে আবার বাড়িটাতে ফিরে এলেন। পোয়ারোর কানে এল রবিন আর মিসেস অলিভারের আলোচনা। রবিনই যেন দুজনের মধ্যে বেশি কথা বলছিল।
তিনি ডানদিকের দরজা ঠেলে মিসেস আপওয়ার্ডের ঘরে প্রবেশ করলেন। আর সকলের সাথে খানিক আগেই তিনিও কিছু সময় এ ঘরে কাটিয়ে গেছেন। ফায়ার প্লেসের সামনে ভদ্রমহিলা বসেছিলেন, চিন্তায় মগ্ন। সামান্য গলা খাকারি দিলেন পোয়ারো। উনি সেই শব্দে সচকিত হয়ে ফিরে তাকালেন।
–ও, আপনি, তাই বলুন। একেবারে আমি চমকে গিয়েছিলাম।
–আমি দুঃখিত। অন্য কাউকে কি আপনি আশা করেছিলেন? সে কে?
লরা এড়িয়ে গেলেন প্রশ্নটা–আপনি কি কিছু ফেলে গেছেন, মিঃ পোয়ারো?
-যা আমি এখানে ফেলে গেছি, তা হল বিপদ। আপনি ফটোটা কার হতে পারে বলে সন্দেহ করেন?
–বিপদ?
-হ্যাঁ, আপনার বিপদ, কারণ আপনি একটা ফটো দেখে কোনো একজনকে চিনতে পেরেছেন। ঠিক যে চিনতে পেরেছেন তা নয়, পুরনো সব ফটোই প্রায় এক ধরনের লাগে।
মাদাম শুনুন, এ ব্যাপারে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া আমাদের উচিত। একটা ফটো দেখে মিসেস ম্যাগিনটিও কাউকে চিনতে পেরেছিলেন এবং তাকে সেজন্য প্রাণ হারাতে হয়।
–কি বলতে চান আপনি? আমার ক্ষেত্রেও মনে হচ্ছে তাই ঘটবে বলে?
-হ্যাঁ। যা জানতে পেরেছেন আপনি, এখনই বলুন। নিরাপদ সময় এটাই। সেটাই শুভ হবে আপনার পক্ষে।
–দেখুন, এত সহজ নয় সব কিছু। আমি তো সঠিক কিছু জানি না। যা আবছা আবছা মনে পড়ে তা ভুলও হতে পারে। কোথায়, কখন, কবে, সবকিছুরই বেশ স্পষ্ট ছবি আসা দরকার মনের সামনে, যা বলছি, বুঝেছেন নিশ্চয়ই?
–কিন্তু মনে হয় আমার খুব ভালোভাবেই জানেন আপনি।
-আপনি আমায় ঘাবড়ে দিতে চান? জানেন, অনেক কিছুই খুঁটিয়ে ভাবা দরকার। ছুটে এসে আমার কাছে কোনো লাভ হল না আপনার। যা জানি আমি তা আমার নিজের কাছেই জানা থাক। আমি তড়িঘড়ি কোনো সিদ্ধান্ত নিই না। ধীরভাবে এগোই। স্থির সিদ্ধান্তে আসার জন্য যেটুকু দরকার সেটুকু সময় নিতে আমি কার্পণ্য করি না।
-সব কিছু আপনি লুকোতে চান।
–হয়ত ঠিকই বুঝেছেন আপনি। মানুষের শক্তি জানার ক্ষমতাই মানুষকে সেটাই সঠিক পথ নির্দেশ করে। এরকম হালচাল আমাদের দেশের মানুষের বোধহয় পছন্দ হয় না। না, মিঃ পোয়ারো।
বিদেশী বলেই হয়ত আমি, আপনিও আপনার।
–তা কিন্তু আমি বলতে চাইনি যদি রাজী থাকেন আপনি, তবে স্পেন্সকে সুপারিন্টেডেন্ট ভাবা যেতে পারে।
–পুলিশ? না মিঃ পোয়ারো। তার দরকার এক্ষুনি আছে বলে মনে করি না আমি।
পোয়ারো নিরুপায় ভাবে কাঁধ ঝাঁকালেন।
–আমি আপনাকে সতর্ক করে দিলাম মাত্র। পোয়ারো ফিরে যেতে যেতে নিশ্চিত হলেন যে মিসেস আপওয়ার্ড ফটোখানা সুনিশ্চিতভাবে সনাক্ত করতে পেরেছেন।
৪. শেষ পর্যন্ত বসন্ত এল
১৪.
পোয়ারো সকালবেলা মনে মনে বললেন, তাহলে শেষ পর্যন্ত বসন্ত এল। তার বিফলে গেছে কালকের রাতটা। অত্যন্ত বুদ্ধিমতী মহিলা মিসেস আপওয়ার্ড আর যথেষ্ট সচেতন আত্মরক্ষা সম্বন্ধে। পোয়ারো তার ভাবভঙ্গি কিছুই বুঝতে পারেননি। ভদ্রমহিলা আসলে তাকে বুঝতে দেননি। তিনি চিনতে পেরেছেন গ্যাম্বা র ফটোটা এবং নিজেই সে সম্পর্কে ব্যবস্থা নেবেন। গতকালের ঘটনাটা বাগানে বেড়াতে বেড়াতে আগাগোড়া নিজের মনে পোয়ারো বিশ্লেষণ করছিলেন।
হঠাৎ একেবারে ঠিক পেছনে শোনা গেল কারও কণ্ঠস্বর।
-মিঃ পোয়ারো। লঘুপদে মিসেস রেগুল সামনে এসে দাঁড়ালেন।
মোটেও মিঃ পোয়ারো তাঁর পদশব্দ শুনতে পাননি। বড্ড নার্ভাসবোধ করছেন কাল থেকেই।
ক্ষমা করবেন। আপনি এসেছেন, টের পাইনি আমি একেবারে।
একটু হাসলেন শেলা। তিনি পোয়ারোর থেকে বেশি নার্ভাস হয়ে পড়েছেন। কাঁপছে। চোখের পাতা। অস্থির ভাবে বারবার দুহাত মুঠো করছেন।
নিশ্চয়ই আপনাকে আমি খুব বিরক্ত করছি না? আপনি কি এখন ব্যস্ত?
-না, না, মোটেও ব্যস্ত নই। বসন্তের সৌন্দর্য একটু উপভোগ করছি বাইরে বেড়িয়ে। ভীষণ হওয়া এ বাড়িটায়।
–তা যা বলেছেন।-জানলা কোনো সময় বন্ধ করা যায় না। আর খুলে খুলে যায় দরজাটাও।
-বাজে বাড়িটা। ওঁরা যত্ন নেন না বাড়িটার। অবশ্য সামর্থ্যও নেই সত্যি। তাহলে রাখা কেন বাড়িটা, আমি হলে বিক্রি করে দিতাম এটা। এমন বাজে সেন্টিমেন্টের মানে হয় না কোনো।
–আমরা আজকাল কেউই সংবেদনশীল নই।
–হবে। আড়চোখে পোয়ারো ভদ্রমহিলার অস্থির হাত দুটোর দিকে তাকালেন। শেলাই প্রথম কথা শুরু করেন, মনে মনে তিনি তাই চাইছিলেন।
–আচ্ছা, যখন কোথাও তদন্ত করতে যান আপনি, কেন এসেছেন এখানে? একথার কৈফিয়ত কি আপনাকে দিতে হয় সেখানে?
মহিলার দিকে চোখ না রেখেও পোয়ারো বুঝলেন যে তাকে তীক্ষ্ণভাবে শেলা নিরীক্ষণ করছেন।
পোয়ারো বললেন, হ্যাঁ, বলে নিলে সুবিধে হয় অনেক ক্ষেত্রে।
বড্ড বিরক্তিকর।
–কিন্তু আমার তা মনে হয় না। কাজ এতে বেশ তাড়াতাড়ি এগোয় বলে ধারণা আমার।
–তাহলে এখন বলুন, এখানে কেন মিঃ পোয়ারো আপনি এসেছেন। এই ব্রডহিনিতে?
–সে কারণটা তো আমি আপনাদের বলেছি। মিসেস ম্যাগিনটির খুনের কিনারা করতে এখানে এসেছি।
–আপনি তাই বলছেন বটে কিন্তু তা অবিশ্বাস্য।
–তাই নাকি?
–হ্যাঁ, কে এ কথা বিশ্বাস করে না।
