–একজন আদর্শ স্ত্রী এবং মা আপনি, পোয়ারো তাকে বললেন।
চোখ দুটি মরিনের বিস্ময়ে বিস্ফারিত হল চোখ তার বড় সুন্দর। আন্দাজ করলেন মিসেস অলিভার মরিনের বয়েস ত্রিশের সামান্য ওপরে।
মরিন বললেন, সত্যি? যদিও আমি স্বামী আর সন্তানদের সকলকে ভীষণ ভালোবাসি কিন্তু যথেষ্ট কি সেটাই?
পোয়ারো বললেন, দেখুন, আমার মনে হয় যে সত্যি স্ত্রী তার স্বামীকে ভালোবাসেন, তাঁর উচিত স্বামীর পেটের প্রতি যত্ন নেওয়া।
-কিন্তু পেট তো জনির খুব ভালো, একেবারে চর্বি নেই। বলতে পারেন ওর পেটই নেই। অবাক হয়ে মরিন বললেন।
–না, না। খাবারদাবারের কথা আমি বলছি।
–ও বুঝেছি। আমার রান্নাবান্নার কথা আপনি বলতে চাইছেন। আমি আবার খাবারটাবারের ব্যাপারেও একেবারে চিন্তাই করি না। পোশাক-আশাকের ব্যাপারেও তাই।
মরিন দু-চার মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। অল্প নেশাগ্রস্ত চোখে যেন তাকিয়ে আছেন দূরে। হঠাৎ কথা বলতে শুরু করলেন আবার।
একটা চিঠি পড়ছিলাম সেদিন কাগজে। কেমন বোকা বোকা লাগল চিঠিটা। যদি বাচ্চাকে মানুষ করতে বাবামায়ের অসুবিধে থাকে অথচ দত্তক দিলে সেই বাচ্চার মানুষ হওয়ার সবরকম সুযোগ পাবার সম্ভাবনা ষোলো আনার ওপর আঠারো আনা তবে দত্তক দেওয়া উচিত কি অনুচিত সেই সম্বন্ধে চিঠিতে আলোচনা করা হয়েছে। মনে হয় আমার এটা বাড়াবাড়ি। আমার মতে সবচেয়ে বেশি দরকার পেট ভরে বাচ্চাকে খেতে দেওয়া। তা পারলেই মিটে গেল সমস্যা।
শূন্য গ্লাসের দিকে মুখ নিচু করে তাকিয়ে মরিন মৃদুস্বরে বলে চললেন, একজনের দত্তক কন্যা ছিলাম আমি। আমায় আমার মা ত্যাগ করা সত্ত্বেও সমস্ত সুবিধে পেয়েছি আমি, তবু এখনো ভাবলে আমার কষ্ট হয় যে, আমার মায়ের কাছে আমি বঞ্চিত ছিলাম না।
-হয়ত সেটা আপনারই মঙ্গলের জন্য করা হয়েছিল। পোয়ারো বললেন।
মরিন পোয়ারোর চোখে চোখ রেখে বললেন, আমার কিন্তু তা মোটেই মনে হয় না। অবশ্য সমাজের কাছে এরকম জবাবদিহি করা সোজা। যাদের সন্তানকে ছেড়ে থাকতে কষ্ট হয় না, তারাই এরকম করতে পারে। আমিও মা, আমি কিন্তু জগতের সমস্ত সম্পদের বিনিময়েও কাছছাড়া করতে পারব না আমার সন্তানদের।
–আপনাকে সর্বান্তকরণে আমরা সমর্থন করি। পোয়ারো এবং মিসেস অলিভার দুজনেই একথা বললেন মরিনকে।
রবিন ইতিমধ্যে এগিয়ে এল। আপনাদের কি কথা হচ্ছে?
মরিন বলল, দত্তক নেওয়া সম্বন্ধে। আমার ভালো লাগে না নিজেকে দত্তক ভাবতে। তোমার লাগে?
রবিন বলল, কারও দত্তক সন্তান হওয়া নিশ্চয়ই ভালো অনাথ হওয়ার থেকে। যাকগে, এবার যাওয়া যাক চল।
সবাই উঠলেন অতিথিরা এর মধ্যেই ডঃ রেগুল চলে গিয়েছেন। ঢালু পথ ধরে সকলে এগোতে শুরু করলেন।
রবিন ল্যাবারলাম-এর গেটে পৌঁছতে বলে উঠল, একটু ভেতরে চলুন আপনারা, মাকে বলে যাবেন। উনি বড় অসহায় অথচ আনন্দ পেতে চান সাবইকে নিয়ে।
সবাই হৈ হৈ করে ভেতরে ঢুকল। ওদের সকলকে দেখে মিসেস আপওয়ার্ড খুশী হলেন বলে মনে হল।
উনি জিজ্ঞেস করলেন, আর কেউ এসেছিলেন, ওয়েদারবি পরিবারের ওরা?
-না, শরীরটা মিসেস ওয়েদারবির ভালো না থাকায় উনি আসেননি। তাই ওঁর মেয়েও আসেননি।
–একটু সংবেদনশীল মেয়েটি, না? শেলা রেগুল বললেন।
–একটু নয়। খুবই বেশি মনে হয় আমার। রবিন মন্তব্য করল।
–সেজন্য নিজেই মেয়েটির মা দায়ী। অনেক মা আছেন, এইভাবে যারা ছেলেমেয়ের মাথাটি খাচ্ছেন। হঠাৎ কথাটা বলে ফেলেই মরিন লজ্জা পেয়ে চুপ করে গেলেন।
–রবিন, তোমার মাথাটি কি আমি খাচ্ছি? মিসেস আপওয়ার্ড জিজ্ঞেস করলেন।
–এ কি বলছ মামনি? তোমার কথাই হচ্ছে না।
অপ্রস্তুত হয়ে মরিন কথার মোড় ঘুরিয়ে দিতে চেষ্টা করলেন। নিজের আইরিশ উলফ হাউণ্ডের বাচ্চার প্রসঙ্গ তুললেন উনি।
–মানুষ কুকুরদের মত বংশ পরম্পরায় পিতৃপুরুষের গুণ পায়। মিসেস আপওয়ার্ড সুনিশ্চিত ধারণা ব্যক্ত করলেন।
আমতা আমতা করে শেলা বললেন, এটা কি ঠিক? মনে হয় আমার পরিবেশও দায়ী তাতে অনেকটা।
–না বৎসে। যদি পরিবেশের প্রভাব কিছু থাকে, তবে তা ওপর ওপর। কেন মানুষ হবে তা বোঝা যাবে না তার বংশ পরিচয়েই।
অহেতুক শেলা জোর গলায় বললেন, খুব অন্যায় এটা। মানুষের বিচার করা ঠিক নয়। এভাবে। একটু লাল দেখালো শেলার মুখ।
কৌতূহল ভরে পোয়ারো শেলার মুখের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখলেন।
–জীবনটাই তো অন্যায়ে গড়া, শোনা গেল লরার কথা।
ধীরে ধীরে জনি সামারহেস বললেন, মিসেস আপওয়ার্ডের কথা আমি সমর্থন করি। মানুষের বংশধারার ধাত ব্যাপারটা খুব মানি আমি।
প্রশ্ন করলেন মিসেস অলিভার, আপনার কি মনে হয় সব গুণাগুণই মানুষের মধ্যে উত্তরাধিকার সূত্রে বর্তায়, তিন চার পুরুষ পরেও?
মরিন তার স্বাভাবিক সুমিষ্ট স্বরে বললেন, কিন্তু প্রবাদ আছে, যত খারাপই হোক না কেন একজন তাকে করুণা করা উচিত।
ক্রমেই বিষয়বস্তু গভীরতার দিকে এগোচ্ছে দেখে সকলে প্রসঙ্গান্তরে গেলেন। পোয়ারোকে লক্ষ্য করে বলা হল, এবার আপনি বরং মিসেস ম্যাগিনটির হত্যার ব্যপারে কিছু বলুন। কেন ওই পেয়িংগেস্টকে আপনার খুনী বলে মনে হয় না?
রবিন বলল, জানেন, রাস্তায় পায়চারী করবার সময় ওই লোকটা নিজের মনে বকবক করত। আমি প্রায়ই ওকে দেখতাম। কেমন যেন অদ্ভুত।
-ও যে খুন করেনি তার স্বপক্ষে আপনি নিশ্চয়ই কোনো প্রমাণ পেয়েছেন। একটু খুলে বলুন দয়া করে।
