–তেমন মনে হয় না আমার। আধুনিক তার দৃষ্টিভঙ্গী। তার মায়ের প্রতি ততটা টান আছে বলে মনে হয় না যতটা আছে তার প্রতি তার মায়ের।
-কিন্তু মায়ের কলঙ্কিত অতীত গোপন রাখার জন্য খুন কি রবিন করতে পারে না?
–না। আমার তো মনে হয় সে বরং এটাকে নিয়ে নাটক লিখতে বসবে, মানে কাজে লাগাবে প্লটটাকে।
খুব শক্ত ব্যাপারটা বোঝা সব রকমের সম্ভাবনা আছে।
–আস্তে আস্তে হয়ত এগোতে পারব।
স্পেন্সের ঘর থেকে পোয়ারো বেরিয়ে এলেন।
তিনি ট্রেনের জন্য কিলচেষ্টার প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন। একটু ঝুঁকে দেখতে পেলেন ট্রেন আসছে। পিঠে হঠাৎ ধাক্কা খেলেন। লাইনের ওপর একটু হলেই পড়তেন। পাশে দাঁড়ানো এক ভদ্রলোক ঠিক সময়ে তাক ধরে ফেলে সামলে দিলেন।
-কি হল আপনার? আর একটু হলেই তো ট্রেনের তলায় পড়ে খোয়াতে হত প্রাণটা।
–অজস্র ধন্যবাদ আপনাকে।
–আসুন, সাহায্য করি আপনাকে। ট্রেনের কামরায় পোয়ারোকে ভদ্রলোক তুলে দিলেন।
বুঝতে পারলেন পোয়ারো তাকে কেউ ঠেলে ফেলে দেবার চেষ্টা করেছিল। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে তদন্তে নিযুক্ত হওয়াতে তিনি কেউ একজন ভয় পেয়েছে, যে তাকে আজ হত্যা করতে চেষ্টা করেছিল।
পোয়ারো স্টেশনে পৌঁছে স্পেন্সকে ফোন করলেন।
–মিঃ স্পেন্স, খবর আছে, আমাকে একটু আগে মেরে ফেলবার চেষ্টা করেছিল কেউ একজন।
না না, কোনো আঘাত লাগেনি আমার তবে আর একটু হলেই মারা পড়তাম। চেষ্টা কে করেছিল জানি না। তবে জানবই। স্পষ্ট বোঝা গেল এবার ঠিক পথেই আমরা এগোচ্ছি।
.
১২.
বৈদ্যুতিক গোলযোগ মেরামতের জন্য গী কার্পেন্টারের বাড়িতে মিস্ত্রী এসেছিল। গৃহ ভৃত্যটি তার কাজে নজর রাখছিল। কাজের ফাঁকে ফাঁকে তাদের দুজনের মধ্যে কথাবার্তা চলছিল।
–মিটিঙে গিয়েছিলেন কাল আপনি?
–না।
–আপনার মনিব মিঃ কার্পেন্টার বক্তৃতা দিয়েছেন খুব চমৎকার। ওঁর গাড়ি মিটিঙে যাওয়ার সময় সব সময়ই আপনিই চালান তাই না?
–না, নিজে উনি চালাতে ভালোবাসেন। একটা রোলস বেন্টলে গাড়ি আছে ওঁর।
–খুব ভালো গাড়ি। ওঁর স্ত্রীও কি নিজে চালান?
–হ্যাঁ, তবে বড় জোরে।
–ওঁর স্ত্রী ছিলেন কালকের মিটিঙে? নাকি উনি রাজনীতি পছন্দ করেন না?
–ভাব দেখান যেন খুবই পছন্দ করেন। মাথা ধরেছিল বলে মিটিঙের মাঝখানেই উঠে চলে এসেছিলেন গতকাল।
-আমার কাজ শেষ হয়ে গেছে।
মিস্ত্রী চলে যাবার পথে নোটবই একটা খুলে লিখল :
গতকাল রাত্রে মি একা গাড়ি চালিয়ে রাত সাড়ে দশটায় বাড়ি ফিরেছে। ওই বিশেষ সময়টাতে কাজেই তার কিলচেষ্টার স্টেশনে উপস্থিতির সম্ভাবনার কথা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অনেক আগে মিসেস মি মিটিঙ থেকে উঠে রওনা দেন এবং মি র মাত্র দশ মিনিট আগে বাড়ি ফিরেছেন ট্রেনে করে।
নোটবইয়ের আগের পৃষ্ঠায় লেখা ছিল :
ডঃ আর কাল রাত্রে কিলচেষ্টারের দিকে রুগী দেখতে গিয়েছিলেন। সুতরাং ওই সময়ে কিলচেষ্টার স্টেশনে উপস্থিত হওয়া অসম্ভব ছিল না তার পক্ষে। মিসেস আর সারাক্ষণ বাড়িতে ছিলেন। পরিচারিকা কফি এনে দেবার পর মিসেস স্কাটের কিন্তু তার সাথে দেখা হয়নি। নিজের গাড়ি আছে ভদ্রমহিলার।
.
পুরোদমে নাটক নিয়ে রবিনদের বাড়িতে কাজ চলছে।
–এরিয়েন, নাটকের এই লাইনটা আপনি বুঝতেই পারছেন না। কি চমৎকার!
–হ্যাঁ রবিন।
-কিন্তু আপনার সুখী ভাবা উচিত ছিল নিজেকে। নায়ক এখানে একজন পঁয়ত্রিশ বছরের যুবক।
-না, ষাট বছরের ভদ্রলোক….
–না না,
–হা নিশ্চয়ই।
–কিন্তু আমার তো মনে হয় পঁয়ত্রিশ বছরের একটুও বেশি হওয়া উচিত নয়।
–গত তিরিশ বছর ধরে ভুলে যাচ্ছ কেন তাকে নিয়ে বই লিখছি। আমার প্রথম বইয়ের এই চরিত্রে তার বয়স পঁয়ত্রিশের কাছে ছিল।
–কিন্তু ষাট বছরের ভদ্রলোকটি হলে সব ব্যাপারটাই গুলিয়ে যাচ্ছে কেমন।
–তাই তো চাই।
–না না, পঁয়ত্রিশ বছরের বেশি করা চলবে না ওকে।
–তা হলে তার আর স্তেন জারসন হওয়া চলবে না, সাধারণ কোনো লোক হতে হবে। –কিন্তু বইতো নায়কের নামেই কাটবে।
-তা বললে চলবে কেন? যারা আমার বই পড়ে সবাই তারা জানে গল্পের নায়ক আমার কেমন। নিশ্চয়ই নতুন করে তুমি নায়ক বানাতে পারো না।
–এটা কিন্তু বই নয়, নাটক। দর্শকের তো আমাদের ভালো লাগা দরকার।
–একটু বাইরে থেকে আমি ঘুরে আসছি।
–আমি সাথে যাব?
–না থাক।
–একটু চিন্তা করবেন নাটকটার কথা।
মিসেস অলিভার পথ চলতে চলতে আগাগোড়া খুঁটিয়ে ভাবতে লাগলেন। এরকুল পোয়ারোকে সাহায্য করা খুব দরকার।
তিনি পোস্ট অফিসে এসে আলাপ জমালেন মিসেস সুইটিম্যানের সঙ্গে।
–আমি আপনাকে চিনি। তিনখানা বই আছে আপনার আমার কাছে। এই দেখুন না, এখানেই আছে। হত্যা রহস্যের কাহিনী আপনি লেখেন, তাই না?
বইগুলোর দিকে মিসেস অলিভার নজর দিলেন। দ্বিতীয় সোনালী মাছের কীর্তি-বইটা মন্দ নয়। বেড়ালের মৃত্যু বইটারও খুব কাটতি হয়েছিল।
–সবই খুব ভালো বইগুলো, মিসেস সুইটিম্যান বললেন, এর একখানাও যদিও ভালো করে পড়ার সময় হয়নি আমার।
–আপনাদের এখানেই তো একটা খুন হয়েছে?
–হ্যাঁ, গত নভেম্বরে। বলতে গেলে একেবারে পাশেই।
–একজন গোয়েন্দা এসেছেন।
–ও, ছোটোখাটো সেই বিদেশী ভদ্রলোক? গতকাল উনি এখানে এসেছিলেন আর…
মিসেস সুইটিম্যান অন্য খরিদ্দার সামলাতে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। একজন তরুণী পোস্ট অফিসে ঢুকতেই তিনি বললেন, মিস হেণ্ডারসন গুড মর্নিং, বেশ গরম আজ না? কেমন আছেন আপনার মা মিসেস ওয়েদারবি?
