এবং খুন সে করেনি। এক নিঃশ্বাসে মিসেস অলিভার বলে চললেন, খুন সে করেনি কে করেছে আপনি জানেন এবং তা প্রমাণও করবেন। চমৎকার চমৎকার।
পোয়ারো দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, বড় দ্রুত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন আপনি মাদাম। আমি এখনো পর্যন্ত জানি না কে করেছে এই খুনটা আর জানা গেলেও তা প্রমাণ করা কষ্টসাধ্য এবং সময় সাপেক্ষ।
অধৈর্যভাবে মিসেস অলিভার বললেন, এত ধীরে ধীরে আপনারা পুরুষেরা সব কাজ করেন। আপনাকে খুব শীগগিরই জানিয়ে দেব এ কাজ কে করেছে? বোধহয় এখানকারই কোনো একজন বাসিন্দা। আমায় দু-একদিন একটু ঘুরে দেখার সময় দিন। ঠিক চিনে নেব খুনীকে। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যা তীক্ষ্ণ একজন মহিলার… সেটাই অভাব আপনাদের। আমি তো ঠিকই আঁচ করেছিলাম শ্যানার খুনের মামলায়।
পোয়ারো ভদ্রমহিলাকে মনে করিয়ে দিলেন যে, তখন কত দ্রুত উনি নিজের সিদ্ধান্ত বদলাতেন।
–আপনারা পুরুষেরা। কোনো মহিলা যদি আজ স্কটল্যাণ্ড ইয়ার্ডের প্রধান হতেন তবে….
একটা শব্দ হঠাৎ শুনে নিজের এই বদ্ধমূল ধারণা আর অন্তত কয়েকশো বার বলা কথাটি থামিয়ে দিলেন মাঝপথেই।
–হ্যালো। মিসেস অলিভার।
-এই যে আমি, মিসেস অলিভার এই বলে পোয়ারোর দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন, সংক্ষেপেই সারব আমি।
-না মাদাম না, ব্যস্ততা দেখালেন পোয়ারো। বরং আপনি ঠিক উল্টোটাই করুন।
গেট খুলে রবিন আপওয়ার্ড রাস্তা দিয়ে নেমে এল। তার গায়ে বহু পুরনো প্রায় বিবর্ণ ধূসর রংয়ের ফ্লানেলের ট্রাউজার্স আর স্পোর্ট কোট। টুপি নেই মাথায়। বেশ সুপুরুষ চেহারা।
এরিয়েন রবিন উষ্ণ আলিঙ্গন করল মিসেস অলিভারকে। তার চোখে প্রশংসার দৃষ্টি। মহিলার কাঁধে হাত দুটো রেখে বলল এরিয়েন, আপনার কাহিনীর জন্য নাটকের দ্বিতীয় অংক লেখার চমৎকার একটা পরিকল্পনা মাথায় এসেছে আমার।
-তাই নাকি? বিশেষ উৎসাহ দেখালেন না মিসেস অলিভার। এই যে রবিন, ইনি মঁসিয়ে এরকুল পোয়ারো।
–আচ্ছা বাঃ বেশ তো, মিসেস অলিভার নিশ্চয়ই আপনার সাথে মালপত্র আছে?
–হা গাড়ির পেছনে। গাড়ির পেছনের বুট থেকে রবিন দুটো স্যুটকেস নিয়ে এল।
–এত বিরক্তিকর। নিজের লোক বলতে ঠিক যা বোঝায় তা নেই আমাদের, শুধু ঐ বুড়ি জ্যানেট। একটা না একটা কিছু সব সময় তার লেগেই আছে। যাচ্ছেতাই একেবারে। ওঃ বেশ তো ভারী স্যুটকেস। বোমাটোমা ভেতরে পুরে রেখেছেন নাকি?
রবিন খাড়া রাস্তা দিয়ে উঠতে উঠতে ঘাড় ফেরালো।
-আসুন না, একসঙ্গে কিছু পান করা যাক।
–আপনাকে রবিন বলছে সঙ্গে যেতে, মাসিয়ে, গাড়ির সামনের আসন থেকে মিসেস অলিভার হাতব্যাগ, একটা বই আর পুরনো একজোড়া জুতো বের করতে করতে বলে চললেন, একটু আগে কি আপনি কাঠখোট্টা কথাবার্তা রবিনের সাথে বলতে বারণ করলেন আমায়?
–হ্যাঁ মিসেস অলিভার। যত আন্তরিকতা আপনি দেখাবেন ততই ভালো।
-যদি আমি আপনি হতাম তবে এ ধরনের কথা বলতাম না। যা হোক, এটা তো আপনার ব্যাপার। আপনাকে সাহায্য করব আমি।
রবিন আপওয়ার্ডকে দেখা গেল তার বাড়ির দরজায়।
–চলে আসুন, চলে আসুন। পরে করা যাবে গাড়ির ব্যবস্থাটা আপনাদের দেখার জন্য মামনি অস্থির হয়ে উঠেছেন।
মিসেস অলিভার দ্রুতপায়ে এগোলেন, ওকে অনুসরণ করলেন পোয়ারো।
খুব মনোরমভাবে সাজানো ল্যাবারনাম কুটিরের ভেতরটা। অনুমান করলেন পোয়ারো এর জন্য যথেষ্ট অর্থব্যয় করা হয়েছে। কিন্তু সে অর্থব্যয় সার্থক হয়েছে। স্বাভাবিকতা আর সৌন্দর্যের সুষম সংমিশ্রণ ঘটেছে গৃহসজ্জায় অকৃত্রিম ওক কাঠের তৈরি প্রতিটি আসবাবে।
মিসেস লরা আপওয়ার্ড ফায়ারপ্লেসের পাশে একটা হুইল চেয়ারে বসেছিলেন। তিনি সুমিষ্ট অভ্যর্থনার হাসি হাসলেন। ষাট বছর বয়স, ধূসর কালচে চুল। এক নজরেই বোঝা যায়, যথেষ্ট উদ্যমী।
লরা একগাল হেসে বললেন, আপনার সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগ হওয়ায় অত্যন্ত আনন্দিত আমি মিসেস অলিভার। মনে হয় আমার, হাতের কাছে আপনাকে পেলেই যারা বই নিয়ে আপনাকে বিরক্ত করে, আপনি তাদের অপছন্দ করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন আমি বাতে অসমর্থ তাই আপনার বিরক্তি উৎপাদন করেও বলতে পারি আপনার বইগুলোই আমার অবসর বিনোদনে প্রধান সঙ্গী।
–মিসেস আপওয়ার্ড, আমার তো এ সৌভাগ্য। (বাচ্চা মেয়ের মত মিসেস অলিভার হাত ওল্টালেন) এই ভদ্রলোক মঁসিয়ে পোয়ারো, বহুকালের বন্ধু আমার। হঠাৎই বহুদিন বাদে আপনার বাড়ির সামনে দেখা হয়ে গেল। আসলে ওর গায়ে গিয়ে লেগেছিল আমার আধখাওয়া আপেলের টুকরো…. অনেকটা সেই উইলিয়ম টেলের মতো ব্যাপারটা…
–মঁসিয়ে পোয়ারো, আপনার সাথে পরিচিত হয়ে খুশী হলাম খুব। রবিন
–কি মামনি?
–পানীয় নিয়ে এস কিছু। কোথায় সিগারেটগুলো?
–ওপরেই আছে টেবিলের।
-মঁসিয়ে, আপনিও লেখক, মিসেস অলিভার বলে উঠলেন, না না, একজন বিখ্যাত গোয়েন্দা উনি শার্লক হোমসের মতো। খুব বিখ্যাত। একটা খুনের তদন্তে এসেছেন এখানে।
একটা ঠুং করে শব্দ হল–হালকা গ্লাস ভাঙার শব্দের মতো।
লরা বললেন, রবিন সাবধানে কাজ কর। এরপর তাকালেন পোয়ারোর দিকে। –তাই নাকি মঁসিয়ে পোয়ারো?
বিস্মিতভাবে রবিন বলল, তাহলে তো মরিন সামারহেস ঠিকই বলেছে। ও বলেছিল কদিন আগে। একজন গোয়েন্দা এসেছেন এখানে অবশ্য ওর কাছে একটা খুব মজার ব্যাপার। কিন্তু সত্যিই তো ব্যাপারটা গুরুতর তাই না?
