এবার ঘড়ির দিকে তাকালেন মিঃ ওয়েদারবি।
-ডীডার, আশা করি আর পনেরো মিনিটের মধ্যে দুপুরের খাওয়া আমরা শুরু করতে পারব?
–না, বোধহয় আজ একটু দেরি হবে।
–কেন?
–ফ্রীড়া খুব ব্যস্ত ছিল।
-ডীডার, তোমাকে আমি মনে করিয়ে দিতে চাই যে ঘরের কাজকর্ম ঠিকমত হচ্ছে কিনা তা দেখার দায়িত্ব তোমার। তোমার কাছে আর একটু বেশি সময় জ্ঞান আশা করি আমি।
দরজা খুলে পোয়ারো বেরিয়ে এসে পেছন ফিরে তাকালেন। মিঃ ওয়েদারবির দৃষ্টিতে সৎ মেয়ের প্রতি বিতৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেলেন না। আর অন্য জনের দৃষ্টিতে যা ছিল তা সৎপিতার প্রতি নিছক ঘৃণা।
৩. তৃতীয় সফর
১০.
পোয়ারো মধ্যাহ্ন ভোজনের জন্য তার তৃতীয় সফরটা মুলতুবী রেখেছিলেন। আধসেদ্ধ মাংস, নরম জল জল আলুসেদ্ধ আর প্যানকেক অবশ্য মরিনের কথা যদি মানতে হয় খাবারের তালিকায়। কি যে অদ্ভুত খেতে।
পোয়ারো টিলা বেয়ে উঠতে লাগলেন। ল্যাবারনাম এসে গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই। দুটো কটেজ মিলিয়ে একটা করা হয়েছে, আধুনিক মোটামুটি। রুচিসম্মত ভাবে তৈরি মিসেস আপওয়ার্ড এবং তার পুত্র উদীয়মান নাট্যকার রবিন আপওয়ার্ড থাকেন এখানে।
ভেতরে গেট দিয়ে ঢোকবার আগে এক মূহুর্ত থামলেন পোয়ারো। গোঁফটা একবার হাত দিয়ে ঠিক করে নিলেন। ঠিক এই সময় খুব ধীরে ধীরে টিলা থেকে একটা গাড়ি নামছিল আর একটা আধখাওয়া আপেল উড়ন্তবস্থায় এসে ঠিক করে তার গালে লাগল।
হতচকিত পোয়ারো চিৎকার করে প্রতিবাদ জানাতেই থেমে গেল গাড়িটা আর গাড়ির জানলা দিয়ে বেরিয়ে এল একজনের মাথা।
-ওহ ভীষণ দুঃখিত। খুব কি লেগেছে আপনার? উত্তেজিত ভাবে উত্তর দিতে যাবার মুহূর্তে প্রশ্নকারিণীর দিকে পোয়ারো তাকালেন।
গোবেচারা, মুখ ঘন ভুরু, ধূসর রংয়ের একরাশ চুল দেখেই চিনতে পারলেন তিনি মহিলাটিকে (অবশ্য খাওয়া আপেল ছুঁড়ে ফেলার অভ্যেসটাও এই চেনার ব্যাপারে যথেষ্ট ভূমিকা নিয়েছিল)।
–আরে আপনি? মিসেস অলিভার।
সত্যিই তাই। ভদ্রমহিলা হলেন বিখ্যাত রহস্যকাহিনী লেখিকা মিসেস অলিভার।
উচ্ছ্বসিতা অলিভার গাড়ি থেকে নামতে উদ্যত হলেন। ছোট গাড়িটা অথচ মিসেস অলিভার বিশালবপু। পোয়ারো ওর দুর্দশা দেখে সাহায্য করলেন ওঁকে।
মিসেস অলিভার কৈফিয়ত দেবার সুরে বললেন, খিল ধরে গেছে হাতে পায়ে গায়ে, অনেকক্ষণ গাড়িতে তো।
একরাশ আপেল ওর নামার সঙ্গে সঙ্গে গড়াতে গড়াতে মাটিতে পড়ল।
–ফেটে গেল ব্যাগটা, বুঝলেন মঁসিয়ে।
জামা ঝেড়েঝুড়ে আরও তিনি কয়েক টুকরো আপেল বের করে বেশ গর্বিত ভাবে তাকালেন পোয়ারোর দিকে।
–এগুলো বাক্সের আপেল ছিল। যাকগে, নিশ্চয়ই আপেলের অভাব এদিকেও থাকবে না। আবার যা কপাল আমার, হয়ত অন্য জায়গায় সবই চালান হয়ে গেল। থাক ওসব, বলুন কেমন আছেন? আপনি নিশ্চয়ই এদিকে যাচ্ছেন না? কোনো খুনটুনের ব্যাপারে যে আপনি এসেছেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই আমার। যে বাড়িতে আমি অতিথি আশা করি সেই বাড়ির গৃহকত্রী নন?
–কে নিমন্ত্রণ করেছেন আপনাকে?
-ওই যে একটা বাড়ি দেখছেন টিলার ওপর ল্যাবারনাম– একটু নেমে গিয়ে চার্চের পাশে, আমি ওই বাড়িতে যাব। কেমন ভদ্রমহিলা?
চেনেন না আপনি?
–না, একান্ত বৈষয়িক কাজেই এসেছি আমি রবিন আপওয়ার্ড আমার একটা বইয়ের নাট্যরূপ দিচ্ছে কিছু কিছু কাজ আছে আমাদের একসঙ্গে।
-আচ্ছা, মাদাম খুবই আনন্দের কথা।
-না, সেরকম সুখকর কিছু ব্যাপার নয়। যথেষ্ট দুঃখজনক পরিস্থিতি–ভাবতেই পারিনি আমি। কেন যে নাক গলাতে এলাম এ সবের ভেতর। আমার যথেষ্ট আয় হয় বই থেকেই আর আয় বাড়া মানেই কর বাড়া। কখনোই সেজন্য অতিরিক্ত আয়ের দিকে ঝোঁক নেই আমার। কিন্তু আপনি ধারণাই করতে পারবেন না যে সৃষ্টি করা আপনার চরিত্র বা এমন সব কথা বলছে মূল বইতে আদপেই ছিল না। বলতে যান কিছু শুনতে হবে এসব উৎকৃষ্ট নাটকের জন্য দরকার। এই সবই করে রবিন আপওয়ার্ড। ও নাকি খুব চালাক সকলের ধারণা। এটা তো আমার মাথায় কিছুতেই ঢোকে না যে ও যদি যথেষ্ট বুদ্ধিমানই হয় তবে একটা মৌলিক নাটক ও নিজে কেন লেখে না? ফিনল্যাণ্ডীয় আমার গোয়েন্দাটিকে অব্যাহতি দিলেই তো পারে। ওঃ, এখন সে তো আবার ফিনল্যাণ্ডের লোকও নয়। নরওয়ের প্রতিরোধ বাহিনীর সদস্য একজন। ওহ হো, টুপিটা যে কোথায় ফেললাম। মাথায় হাত দিলেন মিসেস অলিভার।
গাড়ির ভেতর পোয়ারো উঁকি মেরে বললেন, মাদাম আমার মনে হয় ওটার ওপর আপনি বসেছিলেন।
টুপিটা পর্যবেক্ষণ করে মিসেস অলিভার সমর্থন সূচক গলায় বললেন, সত্যিই তাই। যাকগে। শুনুন, যা বলছিলাম। আমি গীর্জায় যাই প্রতি রবিবার আর বিশপ যাই বলুন না কেন, সেটা টুপী পরার থেকেও বেশি সেকেলে ব্যাপার। সেসব কথা থাক এখন। বলুন তো দেখি এবার খুনের ব্যাপারটা। মনে আছে আপনার সেই আমাদের খুনের তদন্তের কথা?
নিশ্চয়ই, খুব ভালো করে।
–মজা হয়েছিল বেশ, না?
–মানে খুন হবার পরের ঘটনাগুলোর কথা বলছি আর কি। কে খুন হল এবার?
–মিঃ শ্যাতানার মত নামীদামী অত কেউ নয়। বয়স্কা একজন মহিলা। টাকাকড়িও তাঁর খোয়া গেছে। প্রায় পাঁচ মাস আগের ঘটনা। হয়ত আপনি কাগজেও পড়েছেন। মিসেস ম্যাগিনটি….অপরাধী সন্দেহে একটি যুবক গ্রেপ্তার হয়েছে এবং শাস্তি স্বরূপ তার ফাঁসির হুকুম জারী করেছে আদালত।
