ডীডার বলল, মা, সে ব্যাপারেই উনি কিছু জানতে এসেছেন। মিসেস ওয়েদারবি বললেন, মঁসিয়ে পোয়ারো বলুন। ভীষণ কৌতূহল হচ্ছে আমার। এইমাত্র মিসেস রেগুল ফোনে বললেন বিখ্যাত একজন অপরাধ বিশেষজ্ঞ এখানে এসেছেন আপনার বর্ণনাও দিলেন। তারপরই ফ্রিডা যখন আমাদের কাজের মেয়েটি এসে বলল আমার সাথে দেখা করতে এসেছে একজন ভদ্রলোক তখনই বুঝলাম আপনি এসেছেন। একবার বলুন তো কি হয়েছে?
–ওই, আপনার মেয়ে যা বলল আপনাকে। মৃতা মহিলার সম্বন্ধে আমি জানতে চাই কিছু। উনি প্রতি বুধবার এখানে কাজে আসতেন এবং উনি মারা যান কোনো এক বুধবার। মারা যান যেদিন সেদিনও কাজে এসেছিলেন। তাই না?
–হ্যাঁ, মনে তো হচ্ছে তাই। ঘটনাটা এতোদিন আগের যে আমার সঠিক মনে নেই।
–সে তো ঠিকই। আচ্ছা, উনি কি কোনোদিন বিশেষ কোনো ঘটনার কথা বলেছিলেন?
বিরক্ত স্বরে মিসেস ওয়েদারবি বললেন, এ ধরনের মহিলারা বড় বেশি বাজে বকেন। আর কে কত কান দেয় বলুন। আর এতো উনি আগে থেকে বলতে পাবেন না যে, সর্বস্ব ওঁর চুরি যাবে এবং খুন হবেন উনি।
–খুন হবার ওঁর কারণ আছে।
ভ্রূ কুঁচকালেন মিসেস ওয়েদারবি।
-মঁসিয়ে, বুঝতে পারছি না আমি, আদপে কি বলতে চাইছেন আপনি?
–আমি নিজেও এখন পর্যন্ত ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি। যাক গে, আপনারা রবিবারে কি কি কাগজ নেন?
নীল চোখ ভদ্রমহিলার ঈষৎ বিস্ফারিত হল।
–দ্য অবজারভার আর সানডে টাইমস নিই। কেন বলুন তো?
–এমনি। মিসেস ম্যাগিনটি সানডে ক্যানিয়ন আর নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড নিতেন।
পোয়ারোর এ কথায় কেউ কোনো মন্তব্য করল না। খানিকক্ষণ বাদে মিসেস ওয়েদারবি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, এত নৃশংস পুরো ব্যাপারটা। সে ভাবতে পেরেছিল এ রকম ভাড়াটে ছেলেটি। মানসিক দিক দিয়ে হয়ত ও অসুস্থ। অথচ এত শিক্ষিত…. ভাবলে খারাপ লাগে খুব।
–হুঁ।
–সত্যি। খুনটা এত নিষ্ঠুর ভাবে করা হয়েছে–শেষমেশ কিনা মাংস কাটার ছুরি। ওফ!
–পুলিশ কিন্তু শেষ পর্যন্ত পায়নি অস্ত্রটা।
–কে জানে, হয়ত ফেলে দিয়েছে কাছাকাছি কোনো পুকুরে বা ডোবায়।
ডীডার বলে উঠল, সেসব জায়গাতেও সব খুঁজেছে পুলিশ, আমি দেখেছি।
–ডীডার, এখন থাক এসব কথা। অসুস্থ বোধ করছি আমি। আমার স্নায়ু তো দুর্বল তা জানো।
পোয়ারোর দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ডীডার বলল, চলুন যাওয়া যাক, বড় দুর্বল প্রকৃতির মানুষ হলেন মা। গোয়েন্দা গল্প পড়াটুকুও পোষায় না মায়ের।
-সত্যি আমি দুঃখিত। পোয়ারো একথা বলে উঠে দাঁড়ালেন, মিসেস ওয়েদারবি, বাধ্য হয়েই কতকটা বিরক্ত করতে এসেছিলাম কারণ বেন্টলী হয়ত কিছুদিনের মধ্যেই ফাঁসি কাঠে ঝুলবে। অথচ যদি সে প্রকৃত অপরাধী না হয়..
কনুইতে ভর দিয়ে মিসেস ওয়েদারবি আধশোওয়া হয়ে চেঁচিয়ে বললেন, কিন্তু সত্যিই সে তো খুনী।
–কিন্তু মাদাম, আমি যে তাতে এখনো নিশ্চিত নই।
দ্রুতপায়ে, পোয়ারো ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।
ডীডার সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে তাকে জিজ্ঞেস করল, ঠিক কি বোঝাতে চাইছেন আপনি?
-যা আমি বললাম, মাদমোয়াজেল।
–হ্যাঁ কিন্তু….থেমে গেল ডীডার। চুপ করে রইলেন পোয়ারো। আবার ডীডার বলল, মাকে অস্থির করে তুলেছেন আপনি। উনি খুন, ডাকাতি এসব ভীষণ ঘেন্না করেন নৃশংসতাও।
–মিস ম্যাগিনটি তো তা হলে মারা যেতে উনি খুবই আঘাত পেয়েছেন বলতে হবে। ভদ্রমহিলা হাজার হোক কাজ করতেন এখানে।
-সে তো একশোবার।
–বোধহয় মাকে সব কথা বলেনও ন আপনারা?
–না, আসলে কম উত্তেজিত করা যায় যতটা এই আরকি।
–যুদ্ধের সময়?
–বিশেষ বোমাটোমা পড়েনি এখানে।
–আপনি তখন কি করতেন?
–সাহায্যকারীদের দলে ছিলাম আমি। বাড়ি থেকে দূরে কোথাও যেতে পারিনি। আমাকে সর্বদা দরকার হয় মায়ের। ঠিকমত কাজের লোকও ছিল না। সেজন্য খুব সুবিধে হয় আমাদের মিসেস ম্যাগিনটিকে পাওয়াতে। বেশ ভালোই কাজকর্ম করতেন উনি। অবশ্য পরিস্থিতিই তো যুদ্ধের জন্য কত বদলে গেছে।
–সেটা আপনি পছন্দ করেন না। না?
–নিশ্চয়ই না। অবশ্য মায়ের কোনো বিকার নেই সর্বক্ষণই উনি অতীতের মধ্যে ডুবে আছেন।
পোয়ারোর নজরে পড়েছিল মিসেস ওয়েদারবির ঘরে নানা পুরনো জিনিসে ভর্তি দেরাজটা।
মৃদুস্বরে বললেন পোয়ারো, পুরনো জিনিসপত্র অনেকে জমাতে ভালোবাসে, বাজে জিনিসও। তাতে আরও বেশি পুরনো দিনের কথা মনে পড়ে।
–তা হবে। এ সবের মানে আমি বুঝি না কিন্তু জমিয়ে রাখি না নিজে। ফেলে দিই সব।
–তাহলে আপনি ভবিষ্যতের দিকেই তাকিয়ে থাকেন, অতীতের দিকে নয়?
আস্তে আস্তে ডীডার বলল, আমি বুঝতে পারি না আমি ঠিক কোনদিকে তাকিয়ে আছি। যথেষ্ট বর্তমানই তাই না?
খুলে গেল সামনের দরজাটা। লম্বা বয়স্ক একজন ভদ্রলোক পোয়ারোকে দেখে ভীডারের দিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিপাত করলেন।
ডীডার বলল, আমার সৎপিতা ইনি।
–আমি এরকুল পোয়ারো। চোখে মুখে মিঃ ওয়েদারবির কোনো ভাবলক্ষণ দেখা গেল না। ও আচ্ছা, এই বলে তিনি নির্বিকার ভাবে গায়ের কোটটা খুলে হ্যাঁঙারে ঝুলিয়ে রাখলেন।
এবার ডীডার বলল, মিসেস ম্যাগিনটি সম্পর্কে ইনি জিজ্ঞাসাবাদ করতে এসেছেন।
দু-এক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর মিঃ ওয়েদারবি বললেন, বেশ কয়েক মাস আগে উনি মারা গেছেন। ওর সম্বন্ধে আমরা কিছুই জানি না। জানলে তা নিশ্চয়ই পুলিশকে বলতাম।
