যে পরিবারের সন্তান লিলি তাতে পরিবারের লোক সংখ্যা অনুপাতে আয়ের অংক অত্যন্ত কম হওয়ায় ওর এক পিসী নিজের কাছে ওকে নিয়ে আসেন। সিনেমা যেতে চাইলে লিলিকে তিনি বাধা দিতেন। এরকম প্রায়ই বাধা পাওয়াতে লিলি ক্ষিপ্ত হয়ে একদিন মাংস কাটার ছুরি দিয়ে প্রচণ্ড আঘাত করে মহিলাকে। এই আঘাতে রোগা এবং ছোটখাটো চেহারার পিসীটি মারা যান। তখন লিলির বছর বারো বয়েস, অল্প বয়েসী কয়েদীদের স্কুলে স্থান পায় লিলি ও লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যায়।
এখন নিশ্চয়ই একজন মহিলা লিলি আবার তার পুরনো জীবন সে ফিরে পেতে পারে। তার আচরণ খুব সন্তোষজনক ছিল। সে যতটা অপরাধের জন্য নিজে দায়ী, তার চেয়ে সমাজের বিধি নিষেধও কিছু কমদামী নয়। লিলি সমাজের নানারকম নিয়মের শিকার হয়েছিল। সে হয়ত আজ কারো সুখী স্ত্রী; কোনো সন্তানের সুখী মা। হায় ছোট্ট লিলি গ্যাম্বল।
পোয়ারো মাথা নাড়লেন। বারো বছরের লিলি, যে নাকি পিসীকে আঘাত করে মাংস কাটার ছুরি দিয়ে সে কখনোই খুব ভালো হতে পারে না। পোয়ারো কিন্তু এক্ষেত্রে হতভাগ্য পিসীর পক্ষই অবলম্বন করবেন।
ভেরা ব্লেকের শেষ ছবিখানা :
এমন এক শ্রেণীর মহিলা হল ভেরা–চিরদিনই যাদের ভাগ্য খারাপ। যে ছেলেটির সঙ্গে প্রথমে তার বন্ধুত্ব ছিল, জানতে পারা যায় ব্যাঙ্কের দারোয়ানকে খতম করে ডাকাতি করায় সে নজরবন্দী পুলিশের। পরবর্তীকালে ভেরা বিয়ে করে একজন সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ীকে। চোরাই মালের ব্যবাসা ছিল নাকি তার আবার। পুলিশের নেকনজর থেকে রেহাই পায়নি ভেরার দুই সন্তানও মায়ের সঙ্গে তারা মনিহারি দোকানে গেলে এটা সেটা দোকানের জিনিস সরাত। ভেরার অভিশপ্ত জীবন শেষ পর্যন্ত মুক্তি পায়। এক সহৃদয় ভদ্রলোক আশ্রয় দেন ভেরাকে তার দুটি সন্তানসহ। পর পর ভাগ্যের হাতে মার খাবার পর সুদিন এসেছে ভেরার।
আপন মনে পোয়ারো বললেন, এতেও সন্দেহ আছে আমার। কে বলতে পারে হয়ত ভেরা কোনো এক ধাপ্পাবাজের খপ্পরে পড়েছে এবার।
ভালো করে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পোয়ারো ছবি চারটি দেখতে লাগলেন।
ইভা কেনের মাথায় কোকড়া কোঁকড়া চুল–নেমে এসেছে কানের দুপাশ দিয়ে। মস্ত টুপি মাথায়। টেলিফোনের রিসিভার কানে দেবার মত করে এ হাতে ধরা একগুচ্ছ গোলাপ কানের পাশে।
কান ঢাকা টুপি জেনিস কোর্টল্যাণ্ডের মাথায়। কোমরে কোমর বন্ধনী।
খুব সাধাসিধে চেহারার লিলি গ্যাম্বল। হাঁ করে আছে, চোখে মোটা কাঁচের চশমা। এতই অস্পষ্ট ভেরা ব্লেকের ছবি যে প্রায় কিছু বোঝাই যায় না।
মিসেস ম্যাগিনটি কোনো কারণে এগুলো কাগজ থেকে কেটে রেখেছিলেন, বোঝা গেল। এই খবরগুলোর অংশ জুতার মোড়কের কাগজটাতে তাই পাওয়া যায়নি। কিন্তু কেন? সে কি, কারণ? এসব কি ওর শুধুই কৌতূহল উদ্রেক করেছিল?
আদপেই তা মনে হয় না পোয়ারোর। এই ষাট বছরের মহিলা জীবনে খুব কম জিনিসই ব্যক্তিগত সংগ্রহে রেখেছেন। পুলিশের রেকর্ড দেখেই তা বোঝা যায়। কাগজ থেকে রবিবার ভদ্র মহিলা কেটে রাখেন এগুলো। ডাকঘরে সোমবার যান এক বোতল কালি কিনতে সুতরাং অনুমান করা কঠিন নয় যে উনি, যাঁর চিঠি লেখার অভ্যেস ছিল না, লিখতে যাচ্ছিলেন একটা চিঠি। যদি আইন সংক্রান্ত চিঠি হত এটা তাহলে উনি সাহায্য নিতেন মিঃ বার্চের। সুতরাং তা যখন নেননি, সে সম্ভাবনা নেই- তাহলে?
আবার ছবি চারটের দিকে পোয়ারো তাকালেন। এখন এরা কোথায়? একটা কথা তিনি ভাবলেন–কে বলতে পারে এদের যে কেউ হয়ত একজন গত নভেম্বরে এই ব্রডহিনিতেই ছিলেন।
অবশ্য পোয়ারো পরের দিনের আগে মিস পামেলা হসফলের সংগে যোগাযোগ করে উঠতে পারলেন না। মিস হসফল কিন্তু বলে রেখেছিলেন তিনি খুব বেশি সময় দিতে পারবেন না, কারণ তাঁকে শেফিল্ড যেতে হচ্ছে বিশেষ কাজে।
দীর্ঘকায় পামেলা চেহারায় পুরুষালি ধাচের, পানাসক্ত এবং ধূমপানে অভ্যস্ত। তাকে দেখে বোঝা বেশ শক্ত যে কাগজের এরকম সেন্টিমেন্টাল লেখাটির লেখিকা তিনি।
-মঁসিয়ে পোয়ারো যা বলার তাড়াতাড়ি বলুন। আমার আবার বড্ড তাড়া আছে।
-ও হ্যাঁ, আপনারই একটা লেখার ব্যাপারে কথাটা সানডে কম্প্যানিয়নে ….গত নভেম্বরে…. নৃশংস ঘটনার শিকার চারজন হতভাগ্য মহিলার ব্যাপারে….
-হা হা। ঘটনাটা বেশ রসালো কি বলেন?
–অপরাধ সংক্রান্ত ঘটনাগুলোর কথাই আমি বিশেষভাবে বলতে চাইছি। গত উনিশে নভেম্বরের প্রবন্ধটা। চারজন মহিলা হলেন ইভা কেন, ভেরা ব্লেক, জেনিস কোর্টল্যাণ্ড আর লিলি গ্যাম্বল।
মুচকি হাসলেন পামেলা-হা, হা এখন কোথায় এই সব মহিলারা?…মনে পড়েছে।
–মনে হয় আমার নিশ্চয়ই আপনি এসব ব্যাপারে মাঝে মাঝে উদ্ভট উদ্ভট চিঠিপত্র পেয়ে থাকেন।
–ওহ নিশ্চয়ই। কারো কারোর তো আজগুবি চিঠি লেখা ছাড়া কাজ থাকে না কোনো। যেমন ধরুন, কেউ নাকি খুনী ক্রেগকে হেঁটে যেতে দেখেছে রাস্তা দিয়ে। আবার কেউ কেউ নিজের জীবনের আরও করুণ আর আষাঢ়ে গল্প ফাঁদে।
কাগজে এই ফিচারটা ছাপা হবার পর ব্রডহিনি থেকে কোনো এক মিসেস ম্যাগিনটির লেখা একটা চিঠি কি পেয়েছিলেন আপনি।
ওঃ হো মঁসিয়ে পোয়ারো, তা কেমন করে জানব বলুন? আমি দিস্তে দিস্তে রোজ চিঠি পাই। অত চিঠির মধ্যে থেকে একটা বিশেষ কোনো নাম কেমন করে আমার মনে থাকতে পারে আপনি বলুন।
