পুরনো খবরের কাগজের ফাইলের সামনে নিথর হয়ে বসে থাকা পোয়ারো ভাবলেন মিসেস ম্যাগনটির কালি কেনার ব্যাপারটা তার মনে যে ধাঁধাঁ লাগিয়েছিল তা নিছক অর্থহীন নয়। সানডে কম্প্যানিয়ন পুরনো দিনের ঘটনার চিত্তাকর্ষক বিবরণ প্রকাশ করার জন্য বিখ্যাত। উনিশে নভেম্বরের সানডে কম্প্যানিয়নের পাতা খোলা পোয়ারোর সামনে। মাঝের পাতার একেবারে ওপর দিকে বড়বড় হরফে লেখা :
বিগত দিনের নৃশংস ঘটনার সঙ্গে জড়িত এই মহিলারা এখন কোথায়?
এর ঠিক নিচে চারটে পুরনো ঝাপসা ছবি যা দেখেই বোঝা সম্ভব নয়। তবে পুরনো দিনের পোশাকে সজ্জিতা মহিলাদের ছবি তো। তাই অদ্ভুত লাগছিলো। একটি করে নাম ছাপা প্রত্যেক ছবির নিচে।
ইভা কেন-কুখ্যাত গ্রেস মামলার অপর মহিলাটি। জেনিস কোর্টল্যাণ্ড–সেই দুভাগ মহিলা যার স্বামীর নৃশংসতা ছিল নজিরবিহীন।
-ছোট লিলি গ্যাম্বল-সামাজিক বিধিনিষেধের শিকার এই শিশুটি।
ভেরা ব্লেক–কখনো ভদ্রমহিলাটি সন্দেহ করেননি যে একজন হত্যাকারী তার স্বামী। এখন এঁরা কোথায়।
এবার পোয়ারো মনঃসংযোগ করলেন ছবির নিচে দেওয়া এদের জীবনের সংক্ষিপ্ত রোমহর্ষক বিবরণে।
তার মনে পড়ল ইভা কেনের নাম। সেই সময়ের অন্যতম চাঞ্চল্যকর মামলা ছিল সেটা। একটা ছোট শহরে যার নাম পারমিনস্টার তাতে আলফ্রেড ক্রেগ কেরানীর কাজ করত। সাদামাটা চেহারার ভদ্র মার্জিত লোক ছিল সে। কিন্তু তার স্ত্রী দুর্ভাগ্যবশত ছিল রুক্ষ বদমেজাজী স্বভাবের। এক মুহূর্তের জন্যও ক্রেগকে স্বস্তি দিত না। স্ত্রীর দৌলতে ডুবে গেল ক্রেগ, নিজেকে অসুস্থ বলে জাহির করত কিন্তু লোকে বলত সবই মনগড়া অসুখবিসুখ। ইভা কেন এদের বাড়িতে গভর্নেসের কাজ করত। এই উনিশ বছরের ইভা মিষ্টি চেহারার নরম প্রকৃতির অসহায় একটি মেয়ে। আলফ্রেড এবং ইভা দিনে দিনে পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং গভীরভাবে দুজন দুজনকে ভালোবাসে।
একদিন প্রতিবেশীরা শোনে যে, মিসেস ক্রেগকে স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য বাইরে যাবার নির্দেশ দিয়েছেন ডাক্তার। সবাইকে ক্রেগ সেইরকমই বলেছিল। সে স্ত্রীকে লন্ডনে পৌঁছে দিয়ে আসে গাড়ি করে এবং সেখান থেকে মিসেস ক্রেগ নাকি যাত্রা করেন ফ্রান্সের দক্ষিণে। ক্রেগ পারমিনস্টারে ফিরে আসে। সে প্রতিবেশীদের প্রায়ই কথা প্রসঙ্গে জানাত যে, স্ত্রী চিঠিতে লিখেছে তার শরীর ভালো যাচ্ছে না বলে। ঘরের কাজকর্ম দেখাশুনো করতে ইভা রয়ে যায় ক্রেগের বাড়িতেই। দুজনের ঘনিষ্ঠতাকে কেন্দ্র করে মৃত্যু সংবাদ পায় তার স্ত্রীর। খবর পেয়ে এক সপ্তাহ ছুটি নিয়ে সে চলে যায় এবং স্ত্রীর শেষ কাজ করে ফিরে আসে।
একটা মস্ত ভুল করে কিন্তু ক্রেগ। যে জায়গায় তার স্ত্রীর মৃত্যু হয়েছে বলে সে বলেছিল, সেটা খুবই পরিচিত অঞ্চল। ফ্রান্সের এক জন প্রতিবেশী ঐ অঞ্চলের বাসিন্দা তার এক আত্মীয়কে লেখা চিঠিতে মিসেস ক্রেগের মৃত্যুর কথা উল্লেখ করেছিল। কিন্তু চিঠির উত্তর মারফত সে জানতে পারে এরকম কোনো মৃত্যু ঘটেনি সেখানে। এর কয়েকদিন বাদে পুলিশি তদন্ত হয়। সকলেই জানে তার পরের ঘটনা। আদৌ মিসেস ক্রেগ ফ্রান্সে যায়নি। ময়নাতদন্তে জানা যায় ভেষজ বিশে তাকে হত্যা করে খণ্ড খণ্ড করে পরিষ্কার ভাবে কেটে ফেলে ক্রেগের বাড়ির চিলেকোঠায় লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। হত্যাপরাধে ক্রেগ অভিযুক্ত হয়। ইভা কেনও ধরা পড়ে কিন্তু প্রমাণাভাবে ছাড়া পায়। কারণ এ সবের কিছুই সে জানত না। নিজের অপরাধ ক্রেগ স্বীকার করে শাস্তি পায়। ইভা সেই সময় সন্তানসম্ভবা ছিল সে পারমিনস্টার ছেড়ে চলে যায়। কোনো সহৃদয় আত্মীয় তাকে আশ্রয় দেন। নিজের নাম ইভা পরিবর্তন করে নৃশংস হত্যাকারী ক্রেগের আওতা মুক্ত হয়ে জীবন শুরু করে নতুন ভাবে। নিজের আত্মজার কাছেও এই ঘটনা সে এবং তার জন্মদাতার নাম গোপন রাখে। সে বলে, আমার মেয়ে সুন্দর সুস্থ জীবনযাপন করুক তা চাই আমি আমার অতীতের ছায়া যেন না পড়ে তার জীবনে। আমার কলঙ্ক, দুঃখ সে আমারই থাক, যেন এতে তার কোনো ক্ষতি না হয়।
বেচারা ইভা। কত অল্প বয়সে তার নিজের জীবনটা নষ্ট হয়ে গেল। এখন সে কোথায়? হয়ত কোনো ছোট্ট শহরে, একজন বৃদ্ধা শ্রদ্ধেয়া মহিলা হিসেবে সকলের কাছে পরিচিত হয়ে শান্ত নিরুপদ্রব জীবন কাটাচ্ছে। হয়ত বা তার মেয়ে স্বামী সন্তান নিয়ে সুখী হয়েছে, নিজের জীবনের খুঁটিনাটি সুখদুঃখের কথা মাকে জানায় সে, কিন্তু কোনোদিন নিজে জানতে পারে না তার মা কত দুঃখী।
-হুম।
পরের ছবিতে পোয়ারো নজর দিলেন।
জেনিস কোর্টল্যাণ্ডের এই ছবি, সত্যিই ভদ্রমহিলা দুর্ভাগ্যের শিকার। অত্যন্ত মন্দ প্রকৃতির মানুষ ছিলেন ওর স্বামী। মহিলাটি দীর্ঘ সত্যিই আট বছর নরকযন্ত্রণা ভোগ করে। তারপর ওর সঙ্গে এক ভদ্র যুবকের বন্ধুত্ব হয়। ভদ্র ও আদর্শবাদী এই যুবকটি জেনিসের ওপর একদিন তার স্বামীর অকথ্য অত্যাচার দেখে রেগে ওঠে এত যে, তার অত্যন্ত করুণ পরিণতি হয়। মার্বেল পাথরের ফায়ার প্লেসে সে জেনিসের স্বামীর মাথা ঠুকে ঠুকে ফাটিয়ে দেয়। ফলে পাঁচ বছরের জেল হয় তার। অসহায় জেনিস সব কিছু ভুলে থাকার জন্য বিদেশ চলে যায়।
কিন্তু সত্যিই সে কি সব ভুলে গেছে? সেইটুকু আশা করি আমরা স্বামী সংসার পরিবৃতা হয়ে, হয়ত নিজের দুঃখ মনে চেপে রেখে আপাত দৃষ্টিতে সে সুখী জীবন যাপন করছে। লিলি গ্যাম্বলের ছবিটি হল তৃতীয় ছবি।
