–আমি সেটা বলতে পারি না। এক ননদ ছিলেন ওঁর–মারা গেছেন দু বছর আগে। আর একজন ছিলেন মিসেস বার্ডলিপ, কিন্তু তিনিও মৃতা।
–ব্যাপারটা তা হলে এমন দাঁড়াচ্ছে যে, তিনি যদি বা কাউকে লিখে থাকেন তা কারোর চিঠির জবাব।
একটু চিন্তিত দেখালো বেমি বার্চকে।
–কিন্তু মিঃ পোয়ারো, ওঁকে কেই বা লিখতে যাবে?
তার মুখটা পরক্ষণেই উজ্জ্বল হয়ে উঠলো–কি আশ্চর্য! সরকার থেকেও তো লিখতে পারে।
পোয়ারো কথাটায় বিশেষ উৎসাহ দেখালেন না।
মিঃ পোয়ারো বুঝলেন, ফর্ম ভর্তি করা, একগাদা আপত্তিকর প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সরকারের চিঠি পেলে অনেক ঝামেলা হয়।
–তাহলে আপনি তাই ভাবছেন মহামান্য সরকার বাহাদুরের কাছ থেকে উনি কোনো চিঠি পেয়ে তারই জবাব দিতে ব্যস্ত হয়েছিলেন?
–মনে হয়। তবে যদি তা হত তাহলে পিসী আমাদের কাছে নিশ্চয়ই কাগজপত্র নিয়ে একবার আসতেন। এসব সরকারী ব্যাপারে উনি বরাবর আনাড়ি ছিলেন–বিব্রতও বোধ করতেন।
–আচ্ছা মিসেস বার্চ, আপনার কি মনে আছে ওর ব্যক্তিগত জিনিসপত্রের মধ্যে চিঠি ছিল কিনা কোনো?
–ঠিক মনে নেই আমার, প্রথমে পুলিশ তদন্ত করে। বেশ কিছুদিন পর আমার হাতে তুলে দেওয়া হয় পিসীমার জিনিসপত্র।
-কি হল জিনিসগুলোর?
–ওই যে চেস্টটা দেখছেন, ওটা ওঁর। খুব ভালো, মেহগনি কাঠের। একটা ওয়ার্ডরোব আছে ওপরে আর ভালো কিছু রান্নার বাসনপত্র, বাকি জিনিসপত্র বিক্রি করে দিয়েছি। এত জায়গার অভাব বাড়িতে।
–ওঁর একান্ত ব্যক্তিগত জিনিসপত্রের কথা আমি বলছি। এই যেমন–ব্রাশ, চিরুনি ফোটোগ্রাফ, প্রসাধনী, কাপড় জামা….
ওঃ, একটা বাক্সে ওসব জিনিস পুরে আমি রেখেছি ওপরের ঘরে। বড়দিনে জামা কাপড়গুলো গরীবদের মধ্যে ভেবেছি বিলিয়ে দেব। আবার পুরনো জিনিস অনেকে সস্তায় বিক্রি করেন–আমার সেটা পোযাবে না।
–কিছু যদি মনে করেন, একবার খুলে দেখতে পারি এই বাক্সটা?
–নিশ্চয়ই। সেজন্য এত কিন্তু কিন্তু করছেন কেন? অবশ্য আমার মনে হয় না আপনি এমন কিছু তাতে পাবেন যা সাহায্য করবে তদন্তের কাজে। সবই তো পুলিশ দেখেছে। তবু আপনিও দেখুন।
তৎপরতার সাথে মিসেস বার্চ পোয়োরোকে নিয়ে চলে এলেন ছোট্ট একটা শোবার ঘরে। পোয়ারোর মনে হল বাড়ির লোকেদের জামা কাপড় তৈরি করা হয় ঘরটাতে। একটা স্যুটকেস খাটের নিচ থেকে বের করে মিসেস বার্চ বললেন, এই নিন। রান্না চাপিয়ে এসেছি আমি, বড্ড ব্যস্ত। নিজেই আপনি দেখেশুনে নিন।
অত্যন্ত কৃতজ্ঞভাবে পোয়ারো তাকে বিদায় জানালেন। মিসেস বার্চের সিঁড়ি দিয়ে নেমে চলে যাবার শব্দ পেলেন। উনি স্যুটকেসের ডালা খুললেন।
ঝুলে ভর্তি ভেতরটা, প্রথমেই বেরোলো ছেঁড়া একটা কোট। সেই মৃতা মহিলার এটি। উলের দুটো সোয়েটার, আরও একখানা কোট, স্কার্ট আর লম্বা মোজা। একটাও পাওয়া গেল
অর্ন্তবাস যখন, ভাইঝিই বোধহয় ব্যবহারের জন্য নিয়েছে। চুলের একটা ব্রাস, একটা চিরুনি ভাঙা কিন্তু পরিষ্কার, একখানা রুপোর গিল্টি করা আয়না। মহিলা আর তার স্বামীর যুগল ফোটো। পিকচার পোস্টকার্ড দুটো, একটা চিনেমাটির কুকুর, পক প্রণালীর ছেঁড়া পাতা উড়ন্ত চাকীর ওপর, খবরের কাগজের একটা কাটিং, একখানা বাইবেল প্রার্থনার বই–এই ধরনের খুঁটিনাটি জিনিস।
পাওয়া গেল না কোনো দস্তানা বা হাতব্যাগ। হয়ত সেগুলোও মিসেস বার্চ নিজে নিয়েছেন বা কাউকে দিয়েছেন। যা জামাকাপড় আছে তা ভাইঝির গায়ে হত না। বেশ ছোটোখাটো মহিলা ছিলেন। বোঝা যাচ্ছে।
একটা জুতোর মোড়ক পেয়ে সেটা পোয়ারো খুললেন। বেশ দামী জুতো অবস্থাও ভালোই রয়েছে জুতোর। তবে পায়ে হত না মিসেস বার্চের। জুতো জোড়া যে কাগজে মোড়া ছিল তা দিয়ে পোয়ারো আবার জুতো মুড়িয়ে রাখতে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ হেড লাইনের দিকে সেটা ওর নজর গেল, সানডে কম্প্যানিয়ন।
উনিশে নভেম্বরের কাগজে। নিহত হন ভদ্রমহিলা ঐ মাসেরই বাইশ তারিখে। তাহলে এই কাগজখানা উনি মারা যাবার দু-তিন দিন আগে কিনেছিলেন। একখানা পড়েছিল ওর ঘরেই পরে নিশ্চয়ই এটি মিসেস বার্চ জুতো মুড়িয়ে রাখেন।
রবিবার উনিশে নভেম্বর, সোমবার বিশ তারিখে মিসেস ম্যাগিনটি ডাকঘরে যান এক বোতল কালি কিনতে। তাহলে কি আকস্মিকভাবেই কোনো কিছুর ওপর নজর পড়েছিল?
অন্য জুতো জোড়ার মোড়ক খুললেন পোয়ারো। সেখানে নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড শিরোনামের কাগজের পাতা। এটার তারিখও উনিশে নভেম্বর।
চোখের সামনে দুখানা কাগজই টান টান করে মেলে ধরতে পোয়ারো আবিষ্কার করলেন, সানডে কম্প্যানিয়নের পৃষ্ঠার কিছুটা অংশ কেটে নেওয়া হয়েছে পরিষ্কার ভাবে। তন্নতন্ন করে, কাগজ দুখানা খুঁজেও কৌতূহলোদ্দীপক কিছু খুঁজে পেলেন না। নিচে গেলেন সুটকেস গুছিয়ে রেখে তখনো মিসেস বার্চ ব্যস্ত রান্নাঘরে।
নিশ্চয়ই আপনি তেমন কিছু খুঁজে পেলেন না?
দায়সারা ভাবে পোয়ারো বললেন, মিসেস বার্চ, আপনার পিসীমার হাত ব্যাগ বা পার্সে কি আপনি কাগজের কোনো কাটিং দেখেছিলেন।
-কই মনে তো পড়ছে না, হয়ত পুলিশ নিয়ে গেছে।
কিন্তু না, স্পেন্সের দেওয়া কাগজপত্র পোয়ারো ঘেঁটে বুঝলেন সেরকম কিছু পায়নি পুলিশ। তারা বাজেয়াপ্ত করেছে হাতব্যাগ কিন্তু কাগজের কোনো কাটিং ছিল না তাতে।
-হুম, দুটো জিনিস হতে পারে। হয় কিছুই নয় ঘটনাটা, অথবা আমার নতুন পদক্ষেপের সূচনা।
