পোয়ারো অভদ্রের মত প্রায় দাবড়ানি দিয়েই মহিলাটির আত্মপ্রশংসা করা থামিয়ে দিলেন।
–আচ্ছা আচ্ছা, এখনি বলুন তো ঠিক কখন ওকে আপনি শেষ বারের মত জীবিত অবস্থায় দেখেন?
-সেটা হবে তার আগের দিনই সকালে, উনি বাড়ির পেছনের বাগানে এসেছিলেন পুদিনা শাক তুলতে।
-আপনাকে কি উনি কিছু বলেছিলেন?
-এই টুকটাক আর কি। যেন ভালো যায় সময়টা এ ধরনের শুভকামনা করেছিলেন বলে মনে পড়ছে।
-তাহলে খুন হবার আগের দিন আপনি ওঁকে সকালে শেষবার জীবিত দেখেন তারপর আর নয়।
-হ্যাঁ, তাই তবে ঐ বেন্টলী ছোকরাকে দেখেছিলাম। গলার স্বর মিসেস এলিয়টের খাদে নেমে এল। এই সকাল এগারোটা আন্দাজ। উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল, এলোমেলো পা ফেলতে ফেলতে যেমন ওর ধরন।
চুপ করে রইলেন পোয়ারো কিন্তু তারপর কিছু বললেন না ভদ্রমহিলা।
হঠাৎ পোয়ারো বললেন, আচ্ছা জবাব দিন তো একটা কথার। সত্যি কি আপনি অবাক হয়েছিলেন যখন পুলিশ বেন্টলীকে গ্রেপ্তার করেছিল?
-হ্যাঁ, হয়েছিলাম আবার হইনিও বলতে পারেন। এটা ঠিক যে আমার বরাবরই ছোকরাকে কেমন খ্যাপাটে ধরনের বলে মনে হত। আমার এক খুড়তুতো ভাইও পাগলাটে। সেও মাঝে মাঝে একটু আধটু উল্টোপাল্টা কাজ করে ফেলে। আমার একেও সেরকম মনে হয়। ফাঁসিকাঠে একে না ঝুলিয়ে পাগলাগারদে পাঠালেও আশ্চর্য হব না আমি। আরে বাবা, ও চোরাই টাকাগুলো এমন জায়গায় লুকিয়ে রাখল যে বিশ্বসুদ্ধ লোকে সেটা খুঁজে পাবে। মোট কথা ও বড় বোকা আর সাদাসিধে ধরনের।
–আপনার কি কোনো মাংস কাটার বড় ছুরি বা ওই গোছের কিছু হারিয়েছে?
-না মশাই, অবশ্য এ কথা পুলিশের তরফ থেকেও করা হয়েছিল আমাকে। শুধু আমাকেই নয়, যতজন এখানে আছে সকলকে। আশ্চর্য লাগছে ভাবলে যে ছোকরা কি দিয়ে খুন করলো মহিলাকে।
ডাকঘরের দিকে গুটিগুটি পোয়ারো এগোলেন। কি কাণ্ড খুনী বলে পরিচিত এই বেন্টলী এমন জায়গায় টাকা লুকিয়ে রাখে যাতে সহজে খুঁজে পাওয়া যায় অথচ খুনের হাতিয়ারটা যে কোথায় লুকালো। মাথা নাড়লেন তিনি। আশেপাশের বাকি বাড়ি দুটোতেও তিনি গিয়েছিলেন যার বাসিন্দারা মিসেস কিডল বা এলিয়েটের মত নয়। তাদের কাছ থেকে মৃতার সম্বন্ধে যা জানা গেছে সংক্ষেপে তা হল :
আত্মসম্মানবোধ সম্পন্না মহিলা ছিলেন উনি। ভালোবাসতেন নিজের মনে থাকতে। ওর এক ভাইঝি থাকে কুলাভনে–সে ছাড়া বিশেষ কেউ ওর সঙ্গে দেখা করতে আসত না। এই নিরীহ মহিলার ওপর কারো রাগ থাকতে পারে মনে হয় না। তবুও অনেকেই সন্দেহ করে বেন্টলীকে খুনী বলে।
মনে মনে পোয়ারো ভাবছিলেন, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। সমাধানের আলো কই? মিঃ স্পেন্সের মানসিক চাঞ্চল্য অনুভব করি আমি। দুদে পুলিশ অফিসার একজন। তিনিও কিছু করতে পারছেন না। কিন্তু এরকুল পোয়ারো আমি–কেন ব্যর্থ হব আমি?
ডাকঘরে ঢুকলেন পোয়ারো, বেশ সাজানো গোছানো অনেকটা জায়গা। এগিয়ে গেলেন। কিছু ডাক টিকিট কেনার উদ্দেশ্য। তার দিকে যে ভদ্রমহিলা এগিয়ে এলেন তিনি মধ্যবয়স্কা বুদ্ধিদীপ্ত চোখ।
মিসেস সুইটিম্যান তার নাম।
–নিন। সব মিলিয়ে মোট বারো পেনি। আর কিছু লাগবে?
পোয়ারোর মুখের ওপর নিবদ্ধ মহিলাটির বুদ্ধিদীপ্ত দৃষ্টি। একটি আগোছাল চুল ভরা মেয়ের মাথা পিছনের দরজা দিয়ে উঁকি মারছিল।
-এ অঞ্চলে একেবারেই নতুন আমি–পোয়ারো বললেন।
–লণ্ডন থেকে বোধহয় এসেছেন?
–আচ্ছা মাদাম, আমার এখানে আসার উদ্দেশ্যটা নিশ্চয়ই জানেন আপনি।
–মোটেই উদ্দেশ্য জানি না।
মিসেস ম্যাগিনটি।
–ও, সত্যি মর্মান্তিক।
–বোধহয় আপনি ওকে ভালোভাবেই চিনতেন?
-হ্যাঁ, ব্রডহিনির আর পাঁচজনের মতই আমার পরিচয় ছিল ওর সঙ্গেও। ওর সাথে গল্প হত এখানে এলেই। খুবই দুঃখের ব্যাপার আর যদুর শুনেছি বোধহয় কোনো মীমাংসা হয়নি।
পুলিশের তো সন্দেহ বেন্টলীই খুনী।
–হা জানি। তবে ভুল তো পুলিশেরও হতে পারে। এরকম ঘটনা আকছারই ঘটছে। আবার যেন আপনি ভেবে বসবেন না তার সম্বন্ধে আমি খুব উঁচু ধারণা পোষণ করি। আসলে শুধু সন্দেহের বশে কাউকে খুনী ভাবা উচিত নয় তাই না?
লেখার কাগজ চাইলেন পোয়ারো মহিলাটির কাছে। বাঁদিক থেকে উনি কাগজ আনলেন।
–দেখুন মশাই, এসব অঞ্চলে একেবারেই যে চোর ডাকাতি হয় না তা তো নয়। মনে হয় আমার কোনো ছিঁচকে চোর জানলা খোলা পেয়ে ভেতরে ঢুকেছিল– তারপর সরে পড়েছে টাকাকড়ি হাতিয়ে। নিন আপনার কাগজ।
কেনাকাটা শেষ হল পোয়ারোর।
–আচ্ছা মাদাম, কখনো তো উনি কারো সম্বন্ধে ভয়টয় প্রকাশ করেননি না?
-না তো আমার কাছে তো অন্তত নয়। মিঃ কার্পেন্টারদের বাড়িতে উনি প্রায়ই যেতেন। ওদের ওখানে মাঝে মাঝে পার্টিটার্টি হয় সেই উপলক্ষে কাজে সাহায্য করতে। যা রাত হত ফিরতে বাড়ি তো পাহাড়ের মাথায়। অন্ধকার রাস্তা দিয়ে হাঁটা হয়ত ভয় করত।
–আপনি ওর ভাইঝি মিসেস বার্চকে চেনেন?
–হা, আলাপ হয়েছে অল্পস্বল্প। মাঝে মাঝে স্বামীকে নিয়ে আসতেন।
–মহিলার টাকাকড়ি যা কিছু সবই তো পাবেন উনি?
তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মিসেস সুইটিম্যান পোয়ারোর দিকে তাকালেন। স্বাভাবিক নয় কি সেটাই?
-হ্যাঁ, তা তো বটেই তো তো বটেই। আচ্ছা ভাইঝিকে কি মিসেস ম্যাগিনটি পছন্দ করতেন?
-হা খুব ভালোবাসতেন। তবে বড় চাপা স্বভাবের মহিলা ছিলেন উনি।
