বেন্টলী বলেছিল, মিঃ পোয়ারো ধন্যবাদ। তবে আমার মনে হয় না আর এখন আপনারা কিছু ধরতে পারবেন।
-আচ্ছা মিঃ বেন্টলী, কোনো শত্রু ছিল কি আপনার মায়ের?
–মোটেই না। সকলেই তাকে শ্রদ্ধা করত।
–আর আপনার বন্ধুরা?
–কোনো বন্ধু নেই আমার।
পোয়ারো ভাবলেন, এটা তো মিথ্যে কথা। ওর তো বন্ধুই মড। আত্মবিশ্বাস যে বেন্টলীর চরিত্রে নেই মডের মধ্যে তা বেশ ভালোই আছে।
পোয়ারো ফেললেন দীর্ঘশ্বাস। তবে প্রকৃত খুনী কে? তাকে খুব তাড়াতাড়ি এগোতে হবে। অনেক কাজ বাকি।
.
০৭.
মিসেস ম্যাগিনটির বাড়ি বাস স্টপ থেকে মাত্র কয়েক পা দুটো বাচ্চা খেলা করছিল দরজার ঠিক সামনেই। তাদের একজন বড়সড় একটা রসালো আপেলে কামড় দিচ্ছিল আর প্রাণপণে চিৎকার করতে করতে অন্যজন একটা টিনের ট্রে দিয়ে ঘা দিচ্ছিল দরজায়। কি সুখী দুজনেই।
যেমন কাণ্ড পোয়ারোর এত আওয়াজের মধ্যে আবার নিজেও দরজায় ধাক্কা দিতে লাগলেন।
বাড়ির পাশ দিয়ে একজন ভদ্রমহিলা বেরিয়ে এলেন।
-আর্নি, এ রকম কোরো না। থামো।
–না থামব না।
আবার আর্নি নামের বাচ্চাটা তার নিজের কাজে মন দিল। মানে মানে দরজার সামনে থেকে পোয়ারো সরে গিয়ে উঁকি মারলেন বাড়ির পেছন দিকে।
গলা পাওয়া গেল ভদ্রমহিলার, প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে যায় বাচ্চাদের জ্বালায়, তাই না?
অবশ্য বিরুদ্ধগত মত পোষণ করেন পোয়ারো, তবু ভদ্রমহিলাকে নিজের স্বার্থেই তিনি ঘাটাতে সাহস করলেন না।
–আপনার জন্য আমি ভেতর দিকের দরজাটা খুলে রেখেছি।
তাঁকে সাদর আহ্বান জানালেন মহিলা।
সন্তর্পণে পোয়ারো ভীষণ নোংরা বাসনমাজার জায়গাটা পেরিয়ে ঢুকলেন ততোধিক নোংরা রান্নাঘরে।
-শুনুন মশাই, ভদ্রমহিলা কিন্তু খুন হননি এখানে। ঐ কাণ্ডটা ঘটেছিল বোধ হয় বৈঠকখানায়।
পোয়ারো হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলেন।
মশাই এই ব্যাপারে আপনিই তো তদন্ত করছেন, তাই না? আপনি সামারহেসদের বাড়িতে উঠেছেন?
-ও, তাহলে আপনি সব খবরই আমার জানেন, আর তা না জানারই বা কি আছে মিসেস….
–কিডল, একজন রাজমিস্ত্রী আমার স্বামী। প্রায় চার মাস আগে এখানে এসেছি। জানেন, আগে ঐ বাচেঁর মায়ের সঙ্গে থাকতাম।
একজন বললে, আর যাই কর তোমরা খুনের জায়গায় থাকতে যেও না। আরে বাবা খুন হয়েছে তো কি হয়েছে? একটা বাড়ি তো বটে। বলুন আপনি? খুপরী ঘরে কষ্ট করে চেয়ার জোড়া দিয়ে শোবার চেয়ে এ ঢের ভালো।
অবশ্য সবাই বলে–খুন হয় যারা তাদের অতৃপ্ত আত্মাটা নাকি ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু এসব দিক দিয়ে এই ভদ্রমহিলার আত্মাটি খুব ভালো। তা, হা দেখবেন নাকি খুনের জায়গাটা?
প্রায় অসহায় পোয়ারো নিজের ভাগ্যের হাতে থুড়ি সমর্পণ করলেন ভদ্রমহিলার হাতে।
একটা ছোট্ট ঘরে মিসেস কিডল তাকে নিয়ে এলেন।
-বুঝলেন, ভদ্রমহিলা এই ঘরের মেঝেতে পড়েছিলেন। মাথার পেছনটা ওর একেবারে দু ফাঁক-ওফ। মিসেস এলিয়টই ওকে ওই অবস্থায় দেখে প্রথমে। লারকিনের সাথে যৌথভাবে রুটির ব্যবসা চালায় মিসেস এলিয়ট। ওপরতলা থেকে কিন্তু চুরি গেছে টাকাটা। আমার সঙ্গে আসুন আপনি, দেখিয়ে দিই সব।
সোজা ওপরে উঠে এলেন মিসেস কিডল। একটা শোবার ঘর-বড় ড্রয়ার, পেতলের একটা খাট, চেয়ার কয়েকটা, একরাশ ভিজে আর শুকনো জামা বাচ্চাদের।
-ঠিক এইখানে, বুঝলেন? চারদিকে পোয়ারো তাকালেন। সত্যিই শক্ত বিশ্বাস করা। ভদ্রমহিলা এখানেই থাকতেন, ঘুমোতেন।
-মিসেস কিডল, নিশ্চয়ই ওঁর আসবাব নয় এগুলো?
-না না, সে সবই ওঁর ভাইঝি কুলাভনে নিয়ে গেছেন।
কোনো স্মৃতিচিহ্নই মিসেস ম্যাগিনটির আর পড়ে নেই। সবকিছু কিডলরা দখল করেছে। জীবন সত্যিই মৃত্যুর পর কতখানি প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
বাচ্চার তীক্ষ্ণ চিৎকার ভেসে এল নিচের তলা থেকে।
-এঃ হেঃ, উঠে পড়েছে বাচ্চাটা। কিছুটা অনাবশ্যক ভাবেই মহিলাটি কথাটা বলে সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নেমে গেলেন। পেছন পেছন পোয়ারো। এখানে তার দেখার মত সত্যিই নেই কিছু, পাশের বাড়ির উদ্দেশ্যে তিনি বেরিয়ে পড়লেন।
–হ্যাঁ মশাই, তাকে আমিই প্রথম মৃত অবস্থায় ওই ভাবে আবিষ্কার করি।
অবাক হতে হয় মিসেস এলিয়টের নাটুকেপনায়। এত ছিমছাম ছোট্টখাট্টো বাড়িতে বেশ বেমানান উনি।
লারকিন, দরজায় রুটিওয়ালা ওই প্রথমে ধাক্কা দেয়। আমাকে বলে যে, মিসেস ম্যাগিনটি কিছুতেই দরজা খুলছেন না। আমার প্রথমেই শুনে মনে হয়েছিল, বয়স হয়েছে। উনি নিশ্চয়ই অসুস্থ হয়েছেন। বয়েস হলে স্ট্রোকটোক হয়, সে তো জানা কথা। ওর বাড়িতে আমি তাড়াতাড়ি যাই। দুজন পুরুষ মানুষের পক্ষে সোজাসুজি একজন মহিলার ঘরে ঢুকে পড়া একটু অসুবিধেজনক। বোঝেন তো?
ঘাড় নাড়লেন পোয়ারো। তারপর বুঝলেন, আমি সিঁড়ি দিয়ে তাড়াতাড়ি উঠে যাই। সেই বেন্টলী নামে লোকটা, সে দাঁড়িয়েছিল সিঁড়ির মাথায়। ওকে কি ফ্যাকাশে দেখাচ্ছিল। কত না জানি ভয় পেয়েছে। অবশ্য তখন আমি সত্যিই জানি না কি সর্বনাশই না ঘটে গেছে। দরজায় প্রথমে জোরে জোরে ধাক্কা দিলাম। সাড়া পেলাম না। বাধ্য হয়ে হাতল ঘুরিয়ে দরজা খুলে দেখি…সব কিছু ঘরের ভেতর লণ্ডভণ্ড তক্তাটা মেঝে থেকে খোলা। চেঁচিয়ে উঠেছিলাম আমি ডাকাতি বলে। কিন্তু কোথায় গেলেন বৃদ্ধা মহিলা? আমরা ওকে বসার ঘরে গিয়ে দেখতে পাই। ও….ভাবতেও পারি না আমি, একেবারে মাথাটা থেতলে গিয়েছে। খুন। তখুনি আমি বুঝেছিলাম এটা খুন। ডাকাতি আর খুন একসঙ্গে। তারপর সে কি চিৎকার আমার। ওরা দুজন তো আমাকে নিয়ে বেশ ব্যস্তই হয়ে পড়ল। বোধহয় অজ্ঞানই হয়ে গিয়েছিলাম। ব্রাণ্ডি দোকান থেকে এনে খাইয়ে চাঙ্গা করে তোলে আমাকে। কি সমবেদনা পুলিশ সার্জন্টেরও দোহাই আপনার, উত্তেজিত হবেন না, ভয় পাবেন না। গরম চা খান বাড়ি গিয়ে? হ্যানো ত্যানো কত কি। বাড়ি ফিরে আমার স্বামী সব জিজ্ঞেস করলেন, আমার তখনো সেকি কাপুনি। ব্যাপারটা কি জানেন? আসলে আমার মনটা বাচ্চাদের মতই নরম।
