পরদিন ফোন পেলেন পোয়ারো। জ্যাপ করেছেন। তার গলার স্বর ভারী। তিনি বললেন একটা খবর দিই আপনাকে, বন্ধু। আমাদের সব পরিশ্রম বৃথা গেল।
–ঠিক বুঝলাম না। উৎকণ্ঠা ঝরে পড়ছে পোয়ারোর গলার স্বরে।
–আমাদের দায়িত্ব শেষ। কাজকর্ম বন্ধ। এখন আমরা ছুটি কাটাব ইচ্ছেমতো।
পোয়ারো চমকে উঠে বললেন–পাগলের মতো কি সব বলছেন?
তিক্ত স্বরে জ্যাপ বললেন–তদন্তের কাজ সব নষ্ট হয়ে গেল। এত প্রচার, হৈ চৈ, জেরা, জবাবদিহি সব কৌশলে চাপা দেওয়া হল।
কিছুই আমার বোধগম্য হচ্ছে না। তাহলে শুনুন। এতদিন ধরে আমরা যে তল্লাশি চালিয়েছি তা মনে আছে তো? কোন মাছ ধরতে সারা দেশে জাল ফেলেছি সেটাও মনে আছে?
–হ্যাঁ, হ্যাঁ। তারপর?
–সেটা গুটিয়ে ফেলতে হবে। বলতে পারেন চাপা দেওয়া হল ব্যাপারটাকে।
–কিন্তু কার নির্দেশে? বিদেশ দপ্তরের নির্দেশে। এটা অকল্পনীয় নয় কি? হতে পার তবে এরকম ঘটনা বিরল নয়। ওই মাছ নিয়ে তাদের এত আগ্রহ কেন?
–তাকে নিয়ে তারা অত মাথা ঘামায় না। প্রচারে তাদের আপত্তি। অভিযুক্তকে আদালতে তুলতে হবে। জেরাতে মিসেস চ্যাপম্যানের মৃত্যুর প্রসঙ্গ উঠবে। সুতরাং এখানেই ইতি টানো। জ্যাপ চিন্তিত স্বরে বললেন কিন্তু মি. চ্যাপম্যানের অবস্থা কি হবে?
— হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন।
–তিনি বিদেশে কোনো বিপজ্জনক জায়গায় থাকলে এই ঘাঁটাঘাঁটিতে ব্যাপারটা কোথায় এসে দাঁড়াবে বুঝতে পারছেন?
-ওঃ বুঝলাম। ভীষণ বিরক্তিকর ব্যাপার।
জ্যাপ কর্কশ সুরে বললেন–ওই মহিলাকে হাতে পেয়েও ছেড়ে দিতে হবে। এটা মনে পড়লেই সারা শরীর রাগে জ্বলে যাচ্ছে, বন্ধু।
পোয়ারো ধীরে ধীরে বললেন কিছু ভাববেন না, দোস্ত, সে হাতছাড়া হবে না।
দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে জ্যাপ বললেন কিন্তু কিভাবে, আমরা ওপরতলার কড়া নিয়মে বাঁধা পড়েছি।
–আরে মশাই, আমি তো রয়েছি। আমি আপনাদের মতো নিয়মের বেড়াজালে আটকে নেই।
জ্যাপ দারুন খুশি। বললেন–বাঃ চমৎকার। আপনি এগিয়ে যান। আমার শুভেচ্ছা রইল।
–অবশ্যই আমৃত্যু লড়ে যাব।
–তা ভাল। তবে দেখবেন, প্রথম থেকেই ঘটনার যা ঘনঘটা দেখলাম, আপনাকে না কেউ শেষ করে ফেলে।
পোয়ারো ফোন ছেড়ে দিলেন। মনে মনে বললেন–এরকম অতিরঞ্জিত কথা না বলাই ভালো ছিল। ভারি অদ্ভুত একটা মন্তব্য করলাম–আমৃত্যু।
সন্ধ্যার ডাকে এরকুল পোয়ারোর নামে একটি চিঠি। টাইপ করা চিঠির বয়ান আর সইটা হাতে লেখা।
পোয়ারো চিঠিটা খুললেন। তাতে লেখা আছেঃ
আমি আপনার সাক্ষাৎ প্রার্থী। আমার বাড়ি বেলসিতে যদি একবার আসেন তাহলে আমি খুব খুশি হব। আগামীকাল সাড়ে বারোটায়। আপনাকে একটা কাজ দেব। যদি আসতে না পারেন তাহলে দয়া করে আমার সেক্রেটারিকে টেলিফোনে জানিয়ে দেবেন। তার সঙ্গে যোগাযোগ করে অন্য কোনো সময় ঠিক করতেও পারেন। তবে মনে রাখবেন আগামীকালই এলে উপকৃত হব। কম সময় দেওয়ার জন্যে ক্ষমা চাইছি।
—আপনার বিশ্বস্ত,
অ্যালিস্টেয়ার ব্লাস্ট।
চিঠিখানা মন দিয়ে পড়লেন। বার বার পড়লেন। চিঠির বক্তব্যেই গুরুত্ব বোঝার চেষ্টা করলেন। ঠিক সেই সময় তাঁর টেলিফোন বেজে উঠল।
এরকুল পোয়ারো নিজের সম্পর্কে আস্থাবান যে টেলিফোনের শব্দ শুনে ধরতে পারেন কি ধরনের খবর পেতে চলেছেন।
এ ক্ষেত্রে তিনি বুঝলেন, বার্তাটা জরুরি। এটা রঙ নাম্বার অথবা কোনো বন্ধুর ফোন হতে পারে না।
তিনি রিসিভার কানে ধরলেন। তিনি স্বভাবসুলভ স্বরে বললেন–হ্যালো?
নেতিবাচক এক মহিলার কণ্ঠস্বর শুনতে পেলেন–এটা কত নম্বর?
–এটা হোয়াইট হল ৭২৭২।
একটু থেমে ওই মহিলার কণ্ঠস্বর পোয়ারোর কানে এল–মঁসিয়ে পোয়ারো বলছেন?
–হ্যাঁ, বলছি।
–মঁসিয়ে এরকুল পোয়ারো?
–হ্যাঁ।
–মঁসিয়ে পোয়ারো, ইতিমধ্যে আপনি একটা চিঠি পেয়েছেন অথবা পাবেন।
–কে বলছেন? আমি কি জানতে পারি?
–আপনার জানার প্রয়োজন নেই।
–বেশ। জানতে চাই না। তবে, একটা কথা জানাই মাদাম, এর মধ্যে আমি আটটি চিঠি ও তিনটে বিল পেয়েছি।
কোন চিঠির কথা বলছি তা আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। যে কাজের দায়িত্ব আপনাকে দেওয়া হবে তা গ্রহণ না করলেই মঙ্গল হবে, মঁসিয়ে পোয়ারো।
–এটা আমার ওপর ছেড়ে দিন, মাদাম।
হিমশীতল স্বরে জবাব এল–মঁসিয়ে পোয়ারো, আপনাকে সাবধান করছি। আপনি এর মধ্যে মাথা গলাবেন না। আপনার এই ঔদ্ধত্য আমরা বরদাস্ত করব না।
যদি আপনাদের সাবধানবাণী না শুনি?
–তাহলে আপনি বিপদে পড়বেন, মঁসিয়ে পোয়ারো। আমরা সেই ব্যবস্থাই করব।
–এটা হুমকি দেওয়া হচ্ছে, মাদাম।
–আমরা আপনাকে সচেতন করতে চাইছি। এতে আপনার মঙ্গল হবে।
–আপনার মহত্ত্বের পরিচয় পেয়ে কৃতার্থ হলাম, মাদাম।
–যা বলছি সেটা মেনে চলুন। যে বিষয়ে আপনি নিজেকে জড়িয়ে ফেলছেন সেটা থেকে সরে আসুন।
ওহ, হ্যাঁ। তবে মি. মর্লের মৃত্যু নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। ওটা নিছক দুর্ঘটনা একটা মাত্র। সে আমাদের কাজে বাধার সৃষ্টি করছিল।
–তিনি মানবিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তাই অকালে মরতে হল।
–সে অবিবেচকের মতো কাজ করেছিল। তাই সে যোগ্য শাস্তি পেয়েছে।
–আমিও বিবেচক হতে রাজি নই।
–তাহলে আপনি বোকামি করবেন।
বলেই অন্যদিক থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।
পোয়ারো বারকয়েক হ্যালো বললেন, কিন্তু ও প্রান্ত থেকে কোনো শব্দ শুনতে পেলেন না। রিসিভার নামিয়ে রেখে ভাবলেন, ফোনটা কোথা থেকে করা হয়েছে ইচ্ছে করলে জানা যাবে। কিন্তু লাভ হবে না কারণ ফোনটা এসেছে কোনো পাবলিক বুথ থেকে।
