পোয়ারো বললেন মি. বার্নেস, আপনার পদার্পণে আমি ভীষণ আনন্দিত। তিনি এবার জর্জকে হুকুম করলেন, দুকাপ কফি দিয়ে যেতে। কিন্তু বার্নেস কফির থেকে চা হুইস্কি ও সোডা বেশি পছন্দ করেন।
ইতিমধ্যে জর্জ কফি দিয়ে গেছে। কফি পান করার ফাঁকে মি. বার্নেস বললেন আপনার কাছে আমার কিছু জানবার আছে, মঁসিয়ে পোয়ারো এই ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ খবর রাখেন আপনি, কাগজে বেরিয়েছে নিরুদ্দিষ্ট, মিস সেইনসবারি সীলকে খুঁজে পাওয়া গেছে। অবশ্য এই কৃতিত্ব পুলিশের। তাই আরও প্রমাণের আশায় বিচার থমকে রয়েছে। অতিরিক্ত মাত্রায় মেডিনাল প্রয়োগের ফলে তার মৃত্যু হয়েছে। পোয়ারো বললেন হ্যাঁ, আপনি ঠিক বলেছেন। আচ্ছা, মি. বার্নেস, আপনি অ্যালবার্ট চ্যাপম্যানকে চেনেন?
–ওহ, যে মহিলার ফ্ল্যাটে মিস সীলের লাশ পাওয়া গেছে। সম্পূর্ণ অন্য ধরনের মানুষ তিনি। তিনি কে, মি. বার্নেস? ইনকোয়েস্টে এর উত্তর কেউ দিতে পারবে না। হয়তো তারা জানেন না। তারা ওই অস্ত্র কোম্পানির বিক্রেতার গল্প শোনাবে।
–তাহলে সত্যিই তিনি সিক্রেট সার্ভিসে ছিলেন?
–অবশ্যই। তবে মিসেস চ্যাপম্যানকে সত্যি কথা না বললেই ভালো করতেন তিনি। আসলে বিয়ের পর কাউকে এ কাজে রাখা হয় না। তাহলে অ্যালবার্ট চ্যাপমান ছিলেন, পোয়ারোর কথাটা লুফে নিয়ে মি. বার্নেস বললেন–কিউ. এক্স ৯১২। এটাই তার চিহ্নিতকরণ নম্বর। নাম ব্যবহার করার বিষয় নেই। সে বার্তাবাহকের কাজ করতো। ইউরোপের নানা রাষ্ট্রে পাঠানো হত। অনুল্লেখ্য চেহারা হওয়ায় তাকে নিয়ে বিপদের সম্ভাবনা ছিল না। সুবিধাই হতো বেশি। তবে আজ তার অস্তিত্ব আর নেই। তাহলে তিনি প্রচুর গোপণ খবর রাখতেন?
একদম না!
–আপনি বলছেন তিনি বেঁচে নেই?–তাই তো জানি। তবে এ সবই গুজব। বার্নেসের চোখে চোখ রেখে পোয়ারো বললেন তার স্ত্রী এখন কোথায় জানেন? মি. বার্নেস হেসে বললেন আমার ধারণার অতীত। তবে আশা করেছিলাম ওই মহিলার খবর আপনার মুখেই শুনব। পোয়ারো বললেন–আমার ধারণা ছিল । কথা শেষ না করে মাথায় হাত বোলাতে লাগলেন। মি. বার্নেস সহানুভূতির সুরে বললেন–বিশেষ কিছু ভাবিয়ে তুলেছে বোধহয় আপনাকে? দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পোয়ারো বললেন–হ্যাঁ। আমার চোখের সামনে জীবন্ত প্রমাণ হাজির। ইতিমধ্যে জ্যাপ পোয়ারোর বসবার ঘরে ঢুকে পড়েছেন। টুপিটা তিনি সজোরে ছুঁড়ে ফেললেন টেবিলের ওপরে। তিনি রাগে ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন–এটা কিভাবে বুঝলেন বলুন তো? পোয়ারো ধীরে ধীরে বললেন আপনার একথা বলার অর্থ কি বন্ধু? জ্যাপ চিৎকার করে বললেন–কিসের ভিত্তিতে দেহটা মিস সীলের নয় বলে সনাক্ত করলেন?
প্রশ্নটা পোয়ারোকে চিন্তায় ফেলেছে।–মুখটাই আমার সব গোলমাল করে দিয়েছিল। একজন মৃত মহিলার মুখ এভাবে বিকৃত করার কারণ কি?
জ্যাপ মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন আমার বিশ্বাস সাক্ষ্য প্রমাণ লোপাটের জন্য তাকে খুন করা হয়েছে। হেনরি মর্লে বেঁচে থাকলে তিনিই রহস্য ভেদ করতে পারতেন।
লেদারেণ মি. মর্লের উত্তরাধিকারী। যথেষ্ট যোগ্য লোকও বটে সে। তার সাক্ষ্য আমাদের পথের সন্ধান দিতে পারত।
সংবাদপত্রগুলোর সান্ধ্য সংস্করণে উত্তেজক খবর প্রকাশিত হল। কিং লিওগোল্ড ম্যানসনসের ৪৫ নম্বর ফ্ল্যাটে যে মহিলার মৃতদেহ পাওয়া যায় সেটা মিস সেইনসবারি সীলের নয়। যদিও পুলিশ ভেবেছিল ইনিই মিস সীল যাকে একমাস ধরে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে ময়না তদন্তে প্রমাণিত হয় ওই দেহটি মিসেস অ্যালবার্ট চ্যাপম্যানের।
০৫. নয়, দশ, রামপাখি বশ
ইনকোয়েস্ট শেয। দুই বন্ধু বাড়ির পথে রওনা দিয়েছেন। জ্যাপের মনে আনন্দের উচ্ছ্বাস। জোরে হেসে উঠে তিনি বললেন–ফাটিয়ে দিয়েছেন মশাই। শিহরণ জাগছে শরীরে।
মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন পোয়ারো।
জ্যাপ অবার বলতে লাগলেন প্রথম থেকেই আপনি সঠিক পথে এগোচ্ছিলেন। তবে আমারও সন্দেহ ছিল না তা নয়। এমন নৃশংস হত্যালীলা কেউ যে করতে পারে না দেখলে বিশ্বাস হয় না। কারণ ছাড়া মৃতদেহের মুখ বিকৃত করা যায় না। সনাক্তকরণে বিঘ্ন ঘটানোই এর প্রকৃত কারণ। মৃতদেহটা মিস সীলের না হয়ে অন্য মহিলার হতে পারে এটা বোঝা উচিত ছিল আমার। বিচক্ষণতার অভাব ঘটেছে।
পোয়ারো স্মিত হেসে বললেন–ভুল হওয়াটা স্বাভাবিক। মিস সেইনসবারি সীল অতি সাধারণ, সাজ পোশাকে শৌখিনতার আধিক্য নেই। সাদামাটা প্রসাধন। সেই তুলনায় মিসেস চ্যাপম্যান সুন্দরী, ধনী, করিৎকর্মা মহিলা। তবে তাদের দুজনের বিশেষত্ব হল, দু’জনেই চল্লিশ বছর পার করেছেন। উচ্চতা প্রায় এক, শুভ্র কেশ দু’জনেরই।
জ্যাপ বললেন–হ্যাঁ, তা সত্যি। ম্যাকেল আমাদের বোকা বানিয়েছে। আমি নিশ্চিত তিনিই নাটের গুরু।
নিশ্চয়ই। তার অতীত জীবন আমাদের অজানা নয়।
তবে খুন করতেও তার হাত কাঁপে না সেটা আজ প্রত্যক্ষ করলাম। এখন মনে হচ্ছে ম্যাকেলই সিলভিয়াকে খুন করেছে। নাকি সিলভিয়ার খুনি ম্যাকেল।
এরকুল পোয়ারো তীব্র স্বরে প্রতিবাদ করে বললেন–আমি আপনার কথা মানতে পারছি না। আমি কিছুতেই মিসেস সীলকে খুনির আসনে বসাতে পারছি না।
জ্যাপ উত্তেজিত হয়ে বললেন–আমি এই মামলার শেষ দেখে ছাড়ব, বন্ধু আমি ওই মহিলাকে হার মানতে বাধ্য করবই।
