ধীরে ধীরে তিনি মনে করতে লাগলেন ওই মহিলার কণ্ঠস্বর তার ভীষণ চেনা লাগছে। আগে কোথাও শুনেছিলেন। ম্যাকেল সেইনসবারি সীলের কণ্ঠস্বর নয়তো? তবে মিস সীল একটু চড়া সুরে কথা বলে থাকেন। এটাও আশ্চর্যের নয় যে তিনি অন্যের গলা অনুকরণ করে ফোন করতে পারেন না। কারণ তিনি একজন অভিনেত্রী এটা ভুললে হবে না।
কিন্তু এই যুক্তি তাঁর মনঃপূত হল না। তিনি অন্য একজনের কণ্ঠস্বরের সঙ্গে মিল খুঁজতে চাইছেন।
সকালে সংবাদপত্রে এক দারুণ উত্তেজনাপূর্ণ সংবাদ প্রকাশিত হল। প্রধানমন্ত্রীকে কে বা কারা গুলি করে হত্যার চেষ্টা করেছে। তিনি সেই সময় ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসছিলেন। সঙ্গে এক বন্ধু ছিলেন। তবে ভাগ্য ভাল, গুলিটা তাঁর শরীরে লাগেনি। কিছুটা দূর থেকে চলে গেছে। এজন্য একজন ভারতীয়কে স্কটল্যাণ্ড ইয়ার্ডের পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। খবরটা পোয়ারো মন দিয়ে পড়লেন। তারপর সোজা গিয়ে হাজির হলেন স্কটল্যাণ্ড ইয়ার্ডে জ্যাপের অফিস ঘরে। জ্যাপ তাকে সাদরে অভ্যর্থনা করলেন।
বাঃ আপনারও চোখে পড়েছে খবরটা। আর পড়বেই না কেন এমন মুখরোচক খবর। তা বন্ধুটি কে তা লিখেছে খবরের কাগজে?
না, তিনি কে আপনি জানেন?
–অ্যালিস্টেয়ার ব্লাস্ট।
–-সত্যি? পোয়ারো অবাক হয়ে বললেন?
-হ্যাঁ, বন্ধু। আমি নিশ্চিত মি. ব্লাস্টকে গুলিটা ছোঁড়া হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী তাদের লক্ষ্য নয়। লোকটার লক্ষ্যভেদ ভুল হওয়ায় মি. ব্লাস্ট বেঁচে গেলেন।
–লোকটা কে জানতে পেরেছেন?
–এক হিন্দু ছাত্র। ওর সাথে মি. ব্লাস্ট-এর কোনো শত্রুতা নেই এটা জানা গেছে। ওকে টাকার বিনিময়ে কাজে লাগানো হয়েছে। কিন্তু সে কার হুকুমে একাজ করেছে, তা এখনও স্বীকার করেনি। ছাত্রটিকে গ্রেপ্তার করার কৃতিত্ব কিন্তু আমাদের নয়। এতে সাহায্য করেছেন এক আমেরিকান ভদ্রলোক। তিনি সে সময় ওই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি গুলি ছোঁড়া দেখেছেন। আর সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটিকে ধরে ফেলেন। সে পালাবার চেষ্টা করলে লোকটি চিৎকার করে পুলিশ ডাকেন। এরপর আমাদের লোক গিয়ে ছেলেটিকে গ্রেপ্তার করে।
পোয়ারো বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করলেন–আমেরিকান? দেখেছেন আপনি? দাড়ি আছে?
–এক তরুণ, নাম তার হাওয়ার্ড রেইকস। পোয়ারোর মুখের দিকে দৃষ্টি পড়তে থমকে গেলেন জ্যাপ। তারপর কোনরকমে বললেন–কি হল, বন্ধু? আপনি চেনেন?
পোয়ারো বিষণ্ণ সুরে বললেন–হাওয়ার্ড রেইকস। থাকেন হাবোর্ন প্যালেস হোটেলে।
–হ্যাঁ। ওহ মনে পড়েছে। তাই ভাবছিলাম নামটা কেন চেনা লাগছে। আরে সেই ভদ্রলোক যে নাকি মর্লের মৃত্যুর দিন তার কাছে এসেছিল। অথচ ডাক্তার না দেখিয়ে চলে গিয়েছিল। কি আশ্চর্য। তাই না। একই জিনিস বার বার আমাদের সামনে আসছে। এখনও আপনার মাথাতে সেই পুরোনো পোকাটা রয়েছে?
পোয়ারো তীব্রস্বরে বললেন–হ্যাঁ, এটা আমার প্রত্যাশা পূরণ না হলে বেরোবে না।
ঠিক সাড়ে বারোটায় পোয়ারো গথিক হাউসে এলেন। তাকে অভ্যর্থনা করলেন একজন সেক্রেটারি। মার্জিত; শিক্ষিত তরুণ যুবা।
তিনি ক্ষমা প্রার্থনা করে বললেন–মঁসিয়ে পোয়ারো, আমি দুঃখিত মি. ব্লাস্টও দুঃখপ্রকাশ করেছেন আপনাকে এখানে ডেকে আমার জন্যে, তিনি এখন নেই। তাঁর ডাক এসেছে ১০ ডাউনিং স্টিট থেকে। কারণ, গতকালের সেই অযাচিত ঘটনাটা। আমি আপনার ফ্ল্যাটে যোগাযোগ করেছিলাম। আপনার পরিচারক বলল, আপনি বেরিয়ে পড়েছেন। থেকে কোনো মন্তব্য না পেয়ে তরুণটি আবার বলতে লাগলেন–কেন্টের এমহ্যাসে মি. ব্লাস্টের একটি বাগানবাড়ি আছে। যদি সম্ভব হয় আপনাকে সেখানে যেতে বলেছেন। সপ্তাহের শেষের দিনটি আপনার সঙ্গে কাটানোর ইচ্ছে তার। আপনি যদি রাজি থাকেন বলুন। আমি তাকে জানিয়ে দেব। ফলে তিনি গাড়ি নিয়ে চলে যাবেন সেখানে।
পোয়ারো ভাবছিলেন কি জবাব দেবেন।
যুবকটি আবার বলতে শুরু করলেন মি. ব্লাস্ট আপনার সাথে দেখা করার জন্য খুবই ব্যাকুল হয়েছেন, মঁসিয়ে পোয়ারো।
পোয়ারো এবার মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন বেশ, আমি আমন্ত্রণ গ্রহণ করছি।
ধন্যবাদ, আপনি যেতে রাজি হয়েছে শুনলে মি. ব্লাস্ট খুশি হবেন। একটা কথা, তিনি যদি ছটা নাগাদ যান তাহলে তার চোখ পড়ল মিসেস অলিভেরা জেনের দিকে। ইনি মিস অলিভেরার মা। তিনি সেই মুহূর্তে ঘরে প্রবেশ করেছেন। তিনি সুন্দর সাজে সজ্জিত। মাথায় দামি টুপি। সেই টুপিটি চোখের ভু পর্যন্ত নামানো ছিল।
তিনি তীব্রস্বরে বললেন–ওহঃ! মি. সেলবি, মি. ব্লাস্ট কি বাগানের চেয়ারের বিষয়ে আপনাকে কিছু বলেছেন? আমি গত সপ্তাহে তাকে বলেছিলাম। শুনেছি উনি সপ্তাহের শেষে বাইরে বেড়াতে যাবেন তাহলে তো কথা শেষ না করেই থেমে গেলেন পোয়ারোকে দেখে।
সেক্রেটারি ছেলেটি জানতে চাইলেন মিসেস অলিভেরার সঙ্গে আপনার এর আগে আলাপ হয়েছিল, মঁসিয়ে পোয়ারো?
পোয়ারো মাথা নেড়ে সায় দিলেন।
মিসেস অলিভেরা তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বললেন,
–ওহ! মি. পোয়ারো? ভালো আছেন? হ্যাঁ, মি. সেলবি, যা বলছিলাম, মি. ব্লাস্ট খুবই ব্যস্ত মানুষ জানি তাই এইসব ছোটোখাটো বিষয়ে তিনি মাথা ঘামান না–
মি. সেলবি সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠেন ঠিক আছে, মিসেস অলিভেরা। এই প্রসঙ্গে স্যারের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। আমি মেসার্স ভিডার্সকে ডেকে পাঠিয়েছি। তিনি আজ আসবেন।
