লিউকের দৃষ্টি অনুসরণ করে মেজর বললেন–ইনি আমার স্ত্রী–একজন সত্যিকারের মহীয়সী মহিলা; মুখে কী দারুণ অভিব্যক্তি লক্ষ্য করেছেন?
লিউক বললো-হা, দারুণ!
মেজর লিউকের দিকে একটা বিয়ারের গ্লাস এগিয়ে দিয়ে একই কথার পুনরুক্তি করলেন,–একজন সত্যিকারের মহীয়সী-বছরখানেক হলো আমায় ছেড়ে চলে গেছেন, তারপর থেকে আমি আর আগের আমি নেই।
লিউক বললো-তাই না কি?
মেজর একটা চেয়ার দেখিয়ে লিউককে বললেন–ওটার ওপর বসুন।
নিজেও একখানা হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে বললেন–ওঁর মৃত্যুর পর থেকে আমি অনেক বদলে গেছি।
লিউক বলে–আপনি নিশ্চয়ই ওঁর অভাব বোধ করেন?
মেজর বললেন–পুরুষদের প্রতি পদক্ষেপেই স্ত্রীর প্রয়োজন; স্ত্রী না থাকলে তারা একেবারে উচ্ছন্নে যায়।
কিন্তু একথা—
আরে ভাই, আমি জেনেশুনেই বলছি একথা। তবে সব বিয়েই প্রথম দিকটা সুখের হয় না। কিন্তু আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যায়। তবে তার জন্য দরকার উপযুক্ত শৃঙ্খলাবোধ। জীবনের সব স্তরেই শৃঙ্খলাই হচ্ছে আসল। আপন মনে মেজর বলে চলেন–মেয়েরা অতি বিচিত্র প্রাণী। কখনো কখনো মনে হয় যে, অন্যকে আনন্দ দেবার মত কোনো ক্ষমতাই ওদের নেই; কিন্তু একথা সত্যি যে, ওরা পুরুষকে সোজা রাখতে পারে।
কোনো মন্তব্য না করেই লিউক শুনে যায়।
মেজরের প্রশ্ন–বিয়ে করেছেন?
না।
যখন করবেন তখন বুঝতে পারবেন। তবে একটা কথা জেনে রাখুন–বিবাহিত জীবন অতি মধুর।
আজকালকার পাইকারী হারে বিবাহ-বিচ্ছেদের যুগে কারও কাছ থেকে বিয়ের প্রশস্তি শুনতে খুব ভালো লাগে।–লিউক বললো।
আরে দূর! আজকালকার প্যানপেনে ছেলেমেয়েদের কথা আর বলবেন না। কোনোরকম প্রতিকূল অবস্থার সামনে ওরা দাঁড়াতেই পারে না-বীরত্ব বলতে কিছু নেই ওদের।
তবে একটা কথা; লিডিয়ার মতো মহিলা হাজারে একজন মেলে। ওকে এখানে সবাই খুব ভালোবাসতো আর শ্রদ্ধাও করতো।
তা তো বটেই?
ও কোনোরকম অসভ্যতা বরদাস্ত করতো না। আমাদের বাড়িতে একবছরের মধ্যে ঝি-চাকর-পাঁচক মিলে পনেরো জনের বদল-ফেরত হয়েছে। ভেবে দেখুন সংখ্যাটা-পনেরো জন।
ঝি-চাকরদের সঙ্গে না বনলে পত্রপাঠ ঘাড় ধরে বিদায় করাই ছিলো ওঁর একটা বিশেষ পদ্ধতি।
সবসময়ই কি তাই করতেন?–প্রশ্ন করে লিউক।
ঠিক তা নয়, বেশির ভাগই নিজেরাই বিদায় নিতো–লিডিয়া বলতো যে, এটাই সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি।
বুদ্ধিটা খুবই ভালো, তবে এর ফলে কখনো কোনো অসুবিধায় পড়েননি?
আমার ব্যক্তিগত কোনো অসুবিধা হয় না। তবে অসুবিধায় পড়লে তাও করতে হয়, উপায় তো নেই।
উনি বুঝি খুব দুর্বল ছিলেন?
মেজর বললেন–ওর খুব উদ্যোগ ছিলো, সহজে কোনো কিছু ও ছেড়ে দিতো না; কিন্তু বেচারা কি ভোগাই না ভুগলো। ডাক্তাররা পর্যন্ত বুঝতে পারলো না–আর ডাক্তারগুলোও হয়েছে যতসব অকর্মার ধাড়ী। এই আম্বলবির কথাই ধরুন না–এখানে সবাই ভাবতো যে, ও বুঝি খুব ভালো ডাক্তার। আমিও মুখের ওপর স্পষ্ট বলে দিয়েছিলাম যে ওকে দিয়ে চলবে না। এরপরই টমাসকে দেখাই।
তাকে আপনার পছন্দ হয়েছিলো?
সব মিলে মিশে সে বেশ চালাক-চতুর লোক। লিডিয়াকে যদি কেউ বাঁচাতে পারতো, তো টমাসই পারতো। দিন দিন বেশ ভালোর দিকেই যাচ্ছিলো–হঠাৎ একদিন বেড়ে উঠলো।
খুব কষ্ট হতো?
খু-উ-ব। গ্যাস্ট্রাইটিস হয়েছিলো কিনা, দারুণ যন্ত্রণা। শহীদের মতো মৃত্যুকে তিলে তিলে বরণ করে নিলো। দুজন হাসপাতালের নার্স রেখেছিলাম; সব সময় রোগীর জন্য এটা চাই, ওটা চাই করে অস্থির করতো। এই হাসপাতালের নার্সগুলোকে আমি একেবারেই সহ্য করতে পারি না।
লিউক জিজ্ঞেস করলো–আচ্ছা উইচউডে মিসেস হর্টনের অনেক বন্ধু-বান্ধব ছিলো?
মেজর বললেন–এখানকার লোকজন খুবই ভালো। হুইটফিল্ড তার নিজের বাগানের আঙুর, পিছ পাঠিয়েছিলেন। তাছাড়া মাঝেমাঝে আমাদের গ্রামের দুই বুড়ী–হনরিয়া ওয়েনফ্লিট আর ল্যাভিনিয়া পিঙ্কারটনও এসে ওর মাথার কাছে বসে থাকতেন।
মিস পিঙ্কারটন বুঝি প্রায়ই আসতেন?
হ্যাঁ, ভদ্রমহিলা একেবারেই বুড়ী। তবে মহিলা বড় ভালো ছিলেন। তবে দারুণ খুঁতখুঁতে।
ঘাড় নাড়ে লিউক।
মেজর বলতে থাকেন–এখানে বেশির ভাগই মহিলা–ভালো করে এক হাত গলফ খেলার মতো সঙ্গী পর্যন্ত পাওয়া দুষ্কর।
কেন, অ্যান্টিক দোকানে কম বয়সের এক ভদ্রলোক আছেন, তিনি কেমন?–প্রশ্ন করে লিউক।
মেজর বললেন–ওকে দিয়ে গল হয় না–একেবারে মেয়েলী স্বভাবের লোক।
উনি কি অনেকদিন ধরে উইচউডে আছেন?
তা–বছর দুই হবে। একদম বাজে লোক। কিন্তু মজার কথা হলো যে, লিডিয়া ওকে পছন্দ করতো।
লিউক জিজ্ঞেস করলো–আচ্ছা, স্থানীয় সলিসিটার অ্যাবট কেমন লোক? আইনের ব্যাপারে কি খুব ঝানু? আইনের ব্যাপারে ওঁর কাছে গেলে কেমন হয়।
সবাই বলে যে ও বেশ উঁদে উকিল, তবে আমার ভালো জানা নেই। আমার সঙ্গে ঝগড়া হয়েছিলো একবার। আমার মতে, লোকটা খুব অভদ্র; অবশ্য তাতে ভালো উকিল হতে বাধা নেই।
তা তো ঠিকই–তবে আমিও শুনেছি যে, ভদ্রলোক বেশ ঝগড়াটে স্বভাবের এবং এখানকার বহু লোকের সঙ্গেই সদ্ভাব নেই।
আম্বলবির সঙ্গে ওর ঝগড়ার কথা শুনেছেন?
ওদের মধ্যে ঝগড়া হয়েছিলো?
একেবারে তুলকালাম, তবে আমি তাতে মোটেই আশ্চর্য হইনি। আম্বলবিটা ছিলো একটা প্রথম শ্রেণীর গবেট।
ওঁর মৃত্যুটা কিন্তু খুব দুঃখের।–বলে লিউক।
