কার? আম্বলবির? হ্যাঁ, তা ঠিক–সাধারণ বুদ্ধির অভাব। রক্ত বিষাক্ত হওয়া অত্যন্ত মারাত্মক। এ থেকেই বোঝা যায় ও কোনো দরের ডাক্তার ছিলো।
লিউক কোনো মন্তব্য না করে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে উঠে পড়লো।
দুপুরের খাওয়ার সময় হয়ে গেছে?–হ্যাঁ তাইতো। আপনি যেন কোথায় ছিলেন? মেয়াংস্ট্রেটে? ওদিকটায় কখনো যাওয়া হয়ে ওঠেনি। শুনলাম, এখানকার লোকদের আচারবিচার নিয়ে একটা বই লিখছেন?
হ্যাঁ, তা একখানা
মেজর বলেন–এই ব্যাপারে আপনাকে আমি বেশ মজার কিছু কিছু ঘটনা বলতে পারি। আমি যখন ভারতবর্ষে ছিলাম–আরেব্বাস!
মেজর হর্টনের মতো অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ানদের অতি মুখরোচক বিষয় হলো–ভারতীয় ফকির, আম, দড়ির খেলা ইত্যাদির গল্পে। দশ মিনিট ধরে এসব গল্প শুনে লিউক এবার রাস্তায় পা বাড়ালো।
হঠাৎ লিউকের মনে হলো, ভদ্রলোক কি সত্যিই ব্যথিত, না কি সবটাই একটা বড় ধাপ্পা?
***
শক্তি পরীক্ষা
সেদিন বিকেলবেলায় টেনিস খেলা উৎরোলো বেশ ভালোভাবেই। সবসুদ্ধ আটজন খেলোয়াড় –লর্ড হুইটফিল্ড নিজে, ব্রিজেট, লিউক, রোজ আম্বলবি, মিঃ অ্যাবট, ডাঃ টমাস, মেজর হন এবং ব্যাঙ্ক ম্যানেজারের মেয়ে হেটি জো–মেয়েটি সব সময়ে কারণে-অকারণে হাসে।
সেদিন বিকেলবেলায় দ্বিতীয়ার্ধের খেলায় একদিকে লর্ড হুইটফিল্ড এবং রোজ আর অন্যদিকে লিউক এবং ব্রিজেট পরপর তিনটে গেম খেললো–ফলাফল হলো সমান-সমান। কিন্তু তিনটে গেমের পর হঠাৎ যেন লিউকের খেলাও খুলে গেল; ফলে ওদের দল অচিরেই পাঁচ-তিনে জিতলো, আর এর ফলে লর্ড হুইটফিল্ডের মেজাজও গেল বিগড়ে। এরপর থেকেই ব্রিজেটের খেলা নেমে গেল হাস্যকর পর্যায়ে। বল মারা নিয়ে নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝিও হলো এবং ফলাফলও তেমনটাই হলো–লিউকরা আট-ছয়তে হারলো।
লিউকের কাছে ব্রিজেট ক্ষমা চায়।–আমি সত্যিই খুব দুঃখিত! একেবারে যেন হতক্লান্ত হয়ে পড়েছি।
লিউক ব্রিজকে বললো–তোমাদের শাক-সজির বাগানটা একটু দেখিয়ে দাও তো?
শাক-সজির বাগান দিয়ে কী হবে?
বাঁধাকপির পাতা খেতে ইচ্ছে করছে।
কচি মটরশুটিতে কাজ চলবে?
আরোও ভালো হবে।
টেনিস কোর্ট থেকে বেরিয়ে ওরা দুজনে তরকারির বাগানে এলো।
ব্রিজেট বললো–নাও, প্রাণভরে এবার মটরশুটি খাও।
লিউক বললো–তুমি অমন বিশ্রী করে খেললে কেন?
ব্রিজেট বললো–আমি তো বলেছি যে, দুঃখিত; আমি খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। তাছাড়া, আমার টেনিস খেলা কিছু উল্টোপাল্টা।
উল্টোপাল্টা হওয়ারও একটা সীমা আছে যতটা তুমি দেখাতে চেয়েছো ততটা কিছুতেই হতে পারে না। কিন্তু কেন এমন করলে?
খুব সহজ কারণে; আমার আগেই ভাবা উচিত ছিলো যে গর্ডন হেরে যাওয়া পছন্দ করে না।
কিন্তু আমার দিকটা ভেবেছো? আমি যদি জিততে চাই?
হে আমার প্রিয় বন্ধু তোমার চাওয়া না চাওয়া আমার কাছে আদৌ মূল্যবান নয়।
হেঁয়ালী না করে একটু পরিষ্কার করে বলবে?
শোন, কেউ নিজের রুজি রোজগারের সঙ্গে ঝগড়া করে না–গর্ডন আমার জীবিকা, তুমি তা নও।
এবার লিউক একেবারে ফেটে পড়ল–ঐ সৃষ্টিছাড়া বিদ্ঘুটের মধ্যে তুমি কী এমন দেখলে যে ওকে বিয়ে করতে চাইছো? কেন তোমার এই মতিচ্ছন্নতা?
কারণ, ওর সেক্রেটারী হিসেবে আমি মাইনে পাই সপ্তাহে ছপাউণ্ড; যখন স্ত্রী হবো তখন সব কিছুর অধীশ্বরীও হবো আমি নিজে।
কিন্তু তখন তোমার কাজটা হবে কিঞ্চিৎ অন্য ধরনের।
ব্রিজেট বলে–সংসারের প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয় নিয়েই কি অতি নাটুকেপনা করবে? তুমি যদি ভেবে থাকো যে গর্ডন তার বউয়ের প্রেমে হাবুডুবু খাবে, তাহলে খুব ভুল করবে। ও একেবারেই বাচ্চাদের মতো–ওর দরকার একজন মা-স্ত্রী নয়। ও চায় এমন একজনকে, যে সর্বদা ওর আশেপাশে থাকবে, ওর সব বড় বড় কীর্তিকাহিনীর কথা মন দিয়ে শুনবে।
তোমার জিভটা বড়ই অশালীন।
ব্রিজেট বলে–আবার ভুল করছে। আমি নিজেকে রূপকথা দিয়ে ভোলাই না–নিজের অবস্থা সম্পর্কে আমি সচেতন। তোমার অতি সেকেলে মনটা হয়তো ভাবছে যে, আমি কি জঘন্য এক জীব–যে টাকার জন্য নিজেকে বিক্রী করেছে এবং এই ভাবনাটাই তোমার কাছে আত্মপ্রসাদের মতো।
তুমি একটি আস্ত সুচতুর শয়তান।
নির্বোধ শয়তান হওয়ার থেকে চতুর শয়তান হওয়া ঢের ভালো।
তাই না কি?
ঠিক তাই। আমার ভালোভাবেই সেটা জানা আছে।
কী জানো?
আমি জানি একজন পুরুষমানুষকে ভালোবাসতে হলে কি অসীম মূল্য দিতে হয়। তুমি জনি কর্নিশকে চেনো? ওর জন্য একেবারে পাগল ছিলাম। বিয়ের কথাও ছিলো একেবারে পাকা। কিন্তু কী হলো? এক গোলগাল উত্তরে বিধবাকে বিয়ে করবার জন্য আমাকে ঝেড়ে ফেলতে ওর মোটেই অসুবিধা হয়নি। এমন একটা জব্বর উদাহরণ একজনের প্রেমরোগ সারাবার পক্ষে বেশ ঝাঁঝালো ওষুধ।
লিউক বললো–তা হয়তো সত্যি।
হয়তো নয়, তা-ই সত্যি। প্রশ্ন করে লিউক-তুমিও কি সেই একই সেকেলে মনের পরিচয় দিচ্ছো না?
ব্রিজেটের দিকে লিউক অপাঙ্গদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে; ওর চোখে-মুখে এক অব্যক্ত ব্যথা ফুটে ওঠে–যেন ওর ভেতরটা জ্বলে-পুড়ে যাচ্ছে। ও বলে,-সত্যিই আমার অধিকার আছে–একান্ত অধিকার–শুধু তোমার ওপর। কী যেন বলছিলে তখন যে, ভালোবাসা এত তীব্র যেন আঘাত করে?
ব্রিজেট অবাক হয়ে প্রশ্ন করতে চায়–তুমি!
হ্যাঁ, খুব আশ্চর্য হচ্ছে না? এমন একটা ঘটনা শুনে বেদম হাসি পাচ্ছে? আমি এখানে এলাম একটা বিশেষ কাজ নিয়ে। তুমি এসে দাঁড়ালে; তোমাকে দেখামাত্রই আমার মধ্যে কি যেন একটা হয়ে গেল–অনেকটা মন্ত্রমুগ্ধের মতো হয়ে গেলাম। তুমি আমাকে একেবারে গ্রাস করে ফেলেছো। তুমি যদি হুকুম করো যে–এই মুহর্তে একটা ব্যাঙ হয়ে যাও।তৎক্ষণাৎ একটা ব্যাঙ হয়ে লাফাতে আরম্ভ করবো।
