মিডগে–চাকরি করে দুমুঠো অন্নের সংস্থান আমাকেই করতে হয়, তাই ভোগবিলাসের ওপর আমার এত লোভ। বাক্সবিছানা, নিচু বালিশ, দিনের আলো ফোঁটার সঙ্গে সঙ্গে বিছানার পাশে চা–চীনামাটির স্নানাগারে গরম জলের সুবন্দোবস্ত–তৃপ্তিকর বাথটব। সে আরামকেদারায় বসতে তোমার মন নেচে উঠবে…
মিডগে তার তালিকা আর দীর্ঘ করে না।
ডেভিড-শ্রমজীবী মানুষের জীবনে এসব থাকার যথেষ্ট প্রয়োজন আছে। কিন্তু খুব ভোরে বিছানার পাশে চা-রাখা সত্যি অসম্ভব বলেই আমার মনে হয়। এটা নিছকই ভোগসুখপরায়ণতা। তাই বর্তমান বিশ্বে এর কোনো স্থান থাকতেই পারে না।
মিডগে–আন্তরিকভাবে আমি তোমার মতকে সমর্থন করতে পারলাম না ডেভিড।
.
১৫.
সকাল বেলা হারকিউল পৈরট যখন চকোলেট পানে ব্যস্ত সেই সময়ে টেলিফোনের ঘণ্টা বেজে ওঠে।
পৈরট তাড়াতাড়ি গিয়ে রিসিভারটা তুলে বলেন, হ্যালো। সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যুত্তরও এল-পৈরট?
–কে? লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল বলছেন? আপনার কণ্ঠস্বর আমি ঠিক চিনতে পেরেছি, তাই না?
উত্তর এল–আপনাকে বোধহয় একসময়ে বিরক্ত করলাম।
পৈরট–একটুও নয়।
লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল–আমি আপনার কাছে জানতে চাইছি যে, আপনি যদি দয়া করে এখানে একবার আসতে পারেন তবে বড়ই ভালো হয়। আপনার কোনো অসুবিধা হবে না তো?
পৈরট–আপনি কি এক্ষুনি যাবার জন্য বলছেন?
লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল-হা, আমি এক্ষুনি একবার আপনাকে আসার জন্য অনুরোধ করছিলাম। আপনার পক্ষে যত তাড়াতাড়ি আসা সম্ভব।
পৈরট–তাহলে আমি বনের পথটাই ধরব?
লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল-নিশ্চয়ই, ওটাই তো সবচেয়ে সোজা পথ।
পৈরট কোটে লেগে থাকা ধুলো আলতো করে বুরুশ দিয়ে তুলে পাতলা ওভার কোট গায়ে চাপিয়ে লেন পার হয়ে বাদাম বনের মধ্যে দিয়ে পথ চলতে শুরু করে দিল। সুইমিং পুলটা বেশ পরিত্যক্ত, ফাঁকা নির্জন–পুলিশ তার কাজ গুছিয়ে চলে গিয়েছে। এটাকে দেখে বেশ শান্ত এবং শান্তিপূর্ণ বলেই মনে হয় কুয়াশাচ্ছন্ন শরতের আবছা আলো এসে পড়েছে তার জলে।
পৈরট তাবুর দিকে একটা তড়িৎ-দৃষ্টি ফেলে দেখল যে, প্ল্যাটিনাম ফক্স মুক্ত গলাবন্ধটি নেই কিন্তু দেশলাই ছ’টা এখনও সেই আগের মতোই পড়ে আছে। এটা তো দেশলাই রাখার উপযুক্ত জায়গা নয়, এই স্যাঁতসেতে স্থানে কি দেশলাই রাখা যায়। হয়তো একবাক্স থাকলেও থাকতে পারে, কিন্তু ছ’বাক্স! চিত্রিত লোহার টেবিলের দিকে একবার সে তাকাল।
গ্লাসের ট্রে-টা নিয়ে গেছে। কে যেন টেবিলের ওপর পেনসিল দিয়ে দুঃস্বপ্নের মতো একটা গাছের ছবি এঁকেছে–পৈরট সত্যি খারাপ লাগল–তার পরিষ্কার মনে এই ব্যাপারে আঘাত পায় সে। ঘাড় নেড়ে, জিভের শব্দ করে, লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেলের হঠাৎ করে ডেকে পাঠানোর কারণ মনে মনে চিন্তা-ভাবনা করতে করতে দ্রুত পথ চলতে শুরু করে দিল।
লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল ফরাসি জানলায় চুপচাপ নীরবে বসেছিলেন এবং পৈরটকে দেখামাত্রই নিঝুম-নির্জন বসার ঘরে নিয়ে গেলেন। তিনি বললেন, আপনাকে কাছে পেয়ে সত্যি বড় ভালো লাগছে। কথা বলতে বলতে তিনি পৈরটের সঙ্গে করমর্দন করলেন।
পৈরট এ্যাঙ্গক্যাটেল বলেন, দেখুন, কি মুস্কিলে না পড়া গেল, পুলিস ইন্সপেক্টর প্রশ্ন করছেন–বিবৃতিও নিচ্ছেন–কিসব পুলিসী-ভাষা বর্ষণ করছেন, সবশেষে এখন গাজনকে নিয়ে পড়েছেন। গাজনকে না হলে একমুহূর্ত আমাদের চলে না। পুলিসের প্রশ্ন শুনে সে মনে মনে বেশ ঘাবড়েই গেছে। ইন্সপেক্টর গ্র্যাঞ্জ অবশ্য ভালো, আমার মনে হয়, তিনি বেশ সংসারী -ছেলেপুলে-স্ত্রী নিয়েই তার বাস, স্ত্রীর সব কাজই বেশ টিহীন
ইন্সপেক্টর গ্রাঞ্জের পারিবারিক জীবনেরকল্পিত চিত্র লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেলের মুখে নীরবে শুনে যাচ্ছিল পৈরট বিনাপ্রতিবাদে এবং বিনামন্তব্যে। আপনার দয়ার শরীর, আপনি আমাদের পরম হিতাকাঙ্ক্ষী। আমি অবশ্য পুলিসকে গ্রাহ্য করি না। আমার কাছে পুরো ব্যাপারটাই খুব হাস্যকর। মিস্টার গ্র্যাঞ্জকে বলে রেখেছি–আপনার পক্ষে যতটা সম্ভব সাধ্যমতো সাহায্য করে যাব।
গ্র্যাঞ্জ যেন একেবারেই বিমূঢ় হয়ে গেছেন। তবু তিনি নিয়মমাফিক তার কাজ করে যাচ্ছেন। অনেকদিন আগে একটা ব্যাপার কানে এসেছিল যে জন ক্রিস্টো এবং হাসপাতালের এক নার্সের মধ্যে একটা সম্পর্ক আছে, ব্যাপারটা বহু পুরোনো বলে এ বিষয়ে পুলিসের তেমন কোন আগ্রহ নেই বললেই চলে। কেউ অবশ্য এর বিন্দুবিসর্গ জানে না। জার্দাকে তাহলে কত না ঝামেলার সম্মুখীন হতে হতো। স্ত্রী হিসেবে সে যথেষ্ট বিশ্বাসী, তাই না? আবার অনেকের মুখ থেকে এও বলতে শোনা গেছে যে, জার্দার মাথায় কোনো বুদ্ধি নেই বলেই তার আজ এই হাল।
লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল পড়ার ঘরের দরজা খুলে পৈরটকে নিয়ে হঠাৎ করে ঢুকে পড়লেন। ইন্সপেক্টর গ্র্যাঞ্জ এবং গাজন দুজনেই সেখানে উপস্থিত ছিল। ঘরের এককোণে এক তরুণ একটা নোটবই হাতে নিয়ে কি সব লিখে যাচ্ছে। লুসি ও পৈরটকে দেখে গাজন সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ায়। পৈরট তাড়াতাড়ি করে ক্ষমা চেয়ে নেয়। সে বলে ওঠে, আমি এক্ষুনি চলে যাচ্ছি, আমার জানা ছিল না যে, লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল…
গ্রাঞ্জের গোঁফ যেন আরো বিকট এবং দুঃখবাদী রূপেই চোখের সামনে ফুটে উঠল। পৈরট, লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেলের গ্র্যাঞ্জ সম্বন্ধে কল্পিত গল্পে সে খুব ক্রুদ্ধ হয়। গ্র্যাঞ্জ বলেন, বসুন, পৈরট, আমার এখানকার কাজ প্রায় শেষ বললেই চলে। আমার আপনাকে কিছু জিজ্ঞাস্য আছে।
