–জুরির বিচারের অনুসন্ধান আজ পর্যন্ত দেখার সৌভাগ্য তার জীবনে ঘটেনি। আমার গায়ে অবশ্য ধূসর রঙের পোষাক, গির্জার উপযোগী টুপিও আছে–নেই শুধু দস্তানা।
ঘর থেকে বেরিয়ে পাশের ঘরে গিয়ে টেলিফোনের রিসিভারটা তুলতে তুলতে লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল বলে ওঠেন, বাগান করার দস্তানা ছাড়া আমার কাছে আর কোনো দস্তানা নেই। আগে অবশ্য ছিল, তখন গভর্মেন্ট হাউসে থাকতাম। কিন্তু যাই বলা, দস্তানা পরা সত্যিই বোকামির লক্ষণ, কি বলো তাই না?
এডওয়ার্ড মৃদু হাসি হেসে বলে ওঠে, অপরাধ করার পেছনে একটা সুবিধা কিন্তু থেকে যায়, কারণ দস্তানা পরে কোনো অপরাধ করলে আঙুলের ছাপের ভয় থাকে না।
লুসি বলে ওঠে–বেশ মজার কথা বলেছ কিন্তু এডওয়ার্ড। টেলিফোনের রিসিভারটা কেন তুলেছিলাম বলতে পারবে?
এডওয়ার্ড-বোধহয় কাউকে ফোন করার উদ্দেশ্যে! ফোনের দিকে এগিয়েছিলে!
লুসি–না, তেমন ভাবে তো কিছু মনে পড়ছে না (রিসিভারটা রেখেছিলেন)।
এডওয়ার্ড-প্রিয় লুসি, মিডগের কাজের জায়গার কথা চিন্তা-ভাবনা করছিলাম। সেখানকার সব কিছুই আমার খারাপ লাগে।
মিডগে–এডওয়ার্ড মনে মনে আশা করে যে, আমার একজন সহানুভূতিসম্পন্ন মালিক পাওয়া উচিত, যে আমার সঠিক মূল্য বুঝতে পারবে, আমার প্রতি দয়া-পরবশ!
লুসি–প্রিয় এডওয়ার্ড। আমি তোমার অভিমতের সঙ্গে একমত।
এডওয়ার্ড–আমি ভেতরে ভেতরে সত্যি বড় উদ্বিগ্ন–গভীর ভাবে ব্যাপারটা নিয়ে একটু চিন্তাভাবনা করছি।
মিডগে-অভদ্র মহিলার কাছ থেকে বেতন রূপে মাত্র চার পাউন্ড আমার হাতে এসে ঠেকে–সমস্ত অসুবিধার মুখ্য কারণ কিন্তু এটাই।
বলা না থামিয়ে বাগানের মধ্যে দিয়ে প্রবেশ করে মিডগে।
স্যার হেনরি নিচু দেয়ালের ওপর তার সেই নির্দিষ্ট স্থানটিতে বসে। সেদিকে দৃষ্টিপাত না করে মিডগে ফুলের বাগানের মধ্যে দিয়ে চলে গেল। তার আত্মীয়দের মধ্যে একটা আকর্ষণ করার ক্ষমতা আছে, কিন্তু আজ সকালে তাদের সে আকর্ষণের কোনো মূল্যই তার নেই।
ডেভিড এ্যঙ্গক্যাটেল পথের শেষ প্রান্তে একটা আসনের ওপর বসেছিল। বিশেষ ভাবে আকর্ষিত হবার মতো কোনো জিনিষ তার মধ্যে ছিল না, মিডগে এসে তার পাশে বসে পড়ে। হতাশা ভরা মুখের দিকে ঈর্ষা-পরায়ণ দৃষ্টি নিয়েই সে তাকিয়ে রইল।
ডেভিড মনে মনে ভাবে, লোকের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়ানো সত্যি খুব কঠিন! শোবার ঘর থেকে ঝি তাকে ঠেলে পাঠিয়ে দিয়েছে ন্যাতা, বুরুশ এবং ঝাড়ন দিয়ে ঘর মুছতে এবং ঘর পরিষ্কার করার বাসনা নিয়ে। লাইব্রেরি ঘরটিও মোটেই নিরিবিলি নয়, যেমনটি সে কল্পনা করে রেখেছিল। লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল সেখানে দু’বার প্রবেশ করে দয়া-পরবশ হয়ে এমন উপদেশ দিলেন যে প্রকৃতঅর্থে যার কোনো সদুত্তর হয় না। এখানে সে উপস্থিত হয়েছিল নিজের ব্যাপারে একটু ঠান্ডা মাথায় চিন্তা ভাবনা করার আশায়। ইচ্ছার বিরুদ্ধেই সে সাপ্তাহান্তিক ছুটি কাটাতে এসেছিল, কিন্তু হত্যাকাণ্ডের রহস্যজালে জড়িয়ে পড়ার জন্য ছুটি আরও দীর্ঘমেয়াদী হচ্ছে।
শিক্ষাগত অতীত এবং লেফটউয়িং-এর ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় বসতে এবং ভাবনা-চিন্তা করতে বরাবরই ডেভিড ভালোবাসে। বাস্তব এবং অস্থির চঞ্চল এই বর্তমানকে সে কিছুতেই সহ্য করতে পারে না। লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেলের উদ্দেশ্যে সে বলেছে যে, নিউজ অব দি ওয়ার্ড’ সে খুলেও দেখে না, কিন্তু এই মুহূর্তে তার মনে হচ্ছে যে নিউজ অক্ দি ওয়ার্লড ‘হলো’তে এসে সে হাজির হয়েছে।
হত্যা! ডেভিড যেন অজানা এক ঘৃণায় শিউরে ওঠে। তার বন্ধুবান্ধবরাই বা কী ভাববে? ‘হত্যা’ কথাটাকে লোকেরাই বা কী মনে গ্রহণ করবে? এ সম্বন্ধে অভিমত কী দাঁড়াবে? একঘেয়ে, বিরক্তি? হালকা খুশির ছোঁয়া?
এইসব সমস্যা মনে মনে সমাধানের প্রচেষ্টায় সে উঠে পড়ে লেগেছিল। মিডগের উপস্থিতি এই মুহূর্তে তার কাছে বড় বিরক্তিকর লাগল। মিডগে তার পাশের আসনে বসতে যাচ্ছিল তখন সে তার দিকে বক্রদৃষ্টিতে একবার তাকাল।
মিডগে ডেভিডের বক্রদৃষ্টিতে নির্ভীক চাহনির সাহায্যে প্রত্যুত্তর দিয়ে দিল–ডেভিড সঙ্গে সঙ্গে আরো সচকিত হয়ে ওঠে। তার মনে হতে লাগল মিডগের মতো বালিকা সত্যি বড় বিরক্তিকর আর বুদ্ধির লেশমাত্র নেই।
মিডগে–তোমার আত্মীয়দের ঠিক কেমন মনে হয়?
ডেভিড-কেউ তার আত্মীয়-বন্ধুদের ব্যাপারে কি কোনো চিন্তা-ভাবনা করে?
মিডগে–প্রকৃতপক্ষে কোনো জিনিষ সম্পর্কে কারো মাথা-ব্যথা আছে কি?
ডেভিড-তুমি বোধহয় কারো না! আমি হত্যাকাণ্ডকে বিশ্লেষণ করছিলাম।
মিডগে–এটা সত্যি বড় বিরক্তিকর!
ডেভিড–শুধু বিরক্তিকর নয় সেই সঙ্গে ক্লান্তিকরও বটে! গোয়েন্দা কাহিনীর মতো সকল রহস্যের জট পাকিয়ে আছে!
মিডগে–তুমি কি এখানে এসে দুঃখ পেয়েছ?
ডেভিড-হ্যাঁ, আমি লন্ডনে আমার এক বন্ধুর সঙ্গেই থাকতাম। তার লেফটউইং’-বইয়ের দোকান আছে।
মিডগে–আমার কিন্তু মনে হয় এখানে একা থাকার আনন্দই আলাদা সেই জন্য কথাটাও বেশ আরামদায়ক।
ডেভিড–(অবজ্ঞার সুরে) আরামের জন্য কেউ যে এতটা লালায়িত হয় তা আগে শুনিনি।
মিডগে–আমার জীবনে এমনও অনেক সময় এসেছে যখন কিছুই আমি গ্রাহ্য করি না।
ডেভিড–তুমি যদি শ্রমের মাধ্যমে জীবিকা উপার্জন করে থাকো তবে তোমার জীবনের প্রতি এটা হয়ে উঠবে প্রশ্রয়ের এক অনন্যভঙ্গী।
