কিন্তু মিডগের মধ্যে একটা শক্তি বিদ্রোহ ঘোষণা করে ধনী আত্মীয়দের এই দানের বিরুদ্ধে। কালেভদ্রে লুসির এই শৃঙ্খলাবোধ প্রাচুর্যের মধ্যে দিন কয়েক কাটাতে বেশ ভালোই লাগে মনের সুখে আনন্দও করা যায়। কিন্তু অপরের দয়া-দাক্ষিণ্যের ওপর নির্ভর করে চিরটাকাল এইভাবে বেঁচে থাকা তার আত্মসম্মানে আঘাত করে। সেই একই অনুভূতি তাকে ধনী আত্মীয়দের কাছ থেকে টাকা ধার করে স্বাধীনভাবে কোনো ব্যবসায় নামতে বাধা দিয়েছে। এমনটি তার জীবনে বহুবার ঘটেছে। মিডগে টাকা ধারও করে না–কোননা প্রভাব বিস্তার করার মতো প্রবৃত্তিও তার নেই। সে নিজের কথা ভেবে সপ্তাহে চার পাউন্ড বেতনের একটা চাকরিও জোগাড় করেছে।
ম্যাডাম আলফ্রেজ তাকে একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিলেন এই মনে করে যে, মিডগে তার চতুর বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে উপস্থিত হবে তার দোকানে এবং যাতে করে হয়তো তার ব্যবসাতেও উন্নতি হবে, কিন্তু মিডগে তাকে সম্পূর্ণভাবে নিরাশ করেছে। সে কখনও তার বন্ধুদের দোকানে হাজির হবার জন্য উৎসাহ প্রদান করত না। চাকরি করার ব্যাপারে তার তেমন কোনো আগ্রহ নেই। দোকান সে কোনোদিনই পছন্দ করত না, ম্যাডাম আলফ্রেজও তার পছন্দের তালিকায় পড়ে না, বদমেজাজী এবং অভদ্র-খরিদ্দারের দল বরাবরই তার চোখের বিষ, কিন্তু তার মনে একটাই সন্দেহ উঁকি দিতে থাকল যে এই চাকরি সে ছেড়ে দিলে আরও একটা নতুন চাকরি সে আদৌ যোগাড় করতে পারবে কি না সন্দেহ। কারণ অন্য চাকরির উপযুক্ত যোগ্যতা তার কোনোদিনই ছিল না।
এডওয়ার্ড অনুমান করে যে, পছন্দ অপছন্দের যথেষ্ট সুযোগ তার আছে–সকাল বেলা এই কথাটাই তাকে অত্যন্ত উত্তপ্ত করে ক্ষেপিয়ে তুলেছে। বাস্তবতার স্পর্শবর্জিত এই জগতে বসবাস করার কোনো অধিকার এডওয়ার্ডের আছে কি?
তারা সকলেই এ্যাঙ্গক্যাটেল! কেবল সেই অর্ধ এ্যাঙ্গক্যাটেল!
কখনো কখনো, যেমন আজ সকালেই, তার মনে হয়েছিল যে সে মোটেই এ্যাঙ্গক্যাটেল নয়। সে পরিপূর্ণরূপেই তার পিতার কন্যা। তার পিতার কথা মনে হতেই মনের অজানা এক ক্ষতই বেদনামিশ্রিত স্নেহ জেগে ওঠে। পিতার সেই ধূসর রঙের কেশ এবং মধ্যবয়সী চেহারার শান্ত মুখশ্রী সত্যি বড় করুণ!
একজন লোক বছরের পর বছর ধরে ছোটখাটো একটা পারিবারিক ব্যবসা চালাতে তার দেহের সর্বশক্তি, প্রচেষ্টা এবং নিজের মতো করে দেখা এই সব জিনিষগুলো একত্র হলেও যেটা ঢিমেতালে চলার সেটা সেভাবেই চলত। এটা তার অক্ষমতা নয়–এটা ছিল তার উন্নতির অগ্রগতি।
বড়ই আশ্চর্যের বিষয় যে, মিডগের শ্রদ্ধাভক্তি যিনি এতটাকাল ধরে পেয়ে এসেছেন তিনি কিন্তু তার দীপ্তিমতী এ্যাঙ্গক্যাটেল মাতা নন, বরং তার পরিচয় হল শান্ত এবং ক্লান্ত তার পিতারূপে। মিডগে প্রতিবারই আইন্সউইকে যেতই-সেখানে গিয়ে সে জীবনের উদ্দাম আনন্দ অনুভব করত।
প্রতিবার সে বাবার গলা জড়িয়ে আদর করে বলে উঠত, বাড়ি ফিরে আসার আনন্দই আলাদা–এখানে আসতে পেরে আমার সত্যি কী ভালো যে লাগছে।
মিডগে যখন তেরো বছর বয়সের তখন তার মা মারা যান। অনেক সময় তার মনে হয়েছে যে, সে তার মায়ের সম্বন্ধে প্রায় কিছুই জানে না। তিনি ছিলেন অস্পষ্ট, লাবণ্যময়ী এবং প্রফুল্ল স্বভাবের। তার বিবাহ হয়েছিল এ্যাঙ্গক্যাটেল আভিজাত্যের পরিধির একেবারে বাইরে। তিনি এই বিবাহে মনের দিক থেকে অসুখী ছিলেন কিনা, মিডগের সে সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র কোনো ধারণা নেই। স্ত্রীর মৃত্যুতে তার বাবা যেন আরও চুপচাপ এবং ধূসর হয়ে গেলেন। ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রমের বিরুদ্ধে তার অবিরাম সংগ্রাম যেন কোনো কাজেই এল না। মিডগের যখন মাত্র আঠারো তখন তার বাবা নিঃশব্দে নীরবে এই ইহলোকের মায়া ত্যাগ করে চলে যান।
মিডগে বিভিন্ন এ্যাঙ্গক্যাটেল আত্মীয়দের কাছেই থাকত, তাদের হাত থেকে সে উপহার গ্রহণ করত, তাদের সঙ্গে মনের সুখে আনন্দ করত, তবে তাদের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হতে সে বরাবরই অস্বীকার করত। সে তাদের খুবই ভালোবাসত, কিন্তু এমনও অনেক সময় এসে উপস্থিত যখন সে নিজেকে তাদের থেকে পৃথক বলেই মনে করত।
সে তীব্র ঘৃণার সঙ্গে ভাবত, তারা বোধহয় কিছুই জানে না।
আভিমানী এডওয়ার্ড তার দিকে হতবুদ্ধির মতো অপলক নেত্রে তাকিয়ে থাকে, জিজ্ঞাসা করে, আমি কি তোমাকে কোনোভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছি? কেন?
কথার মাঝে লুসির প্রবেশ ঘটে।
মিডগে উদাস ভরা নেত্রে একবার তার দিকে আর একবার এডওয়ার্ডের দিকে তাকাতে থাকে।
লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠেন,এডওয়ার্ডের দিকে তাকিয়ে আর কী হবে মিডগে, বাস্তবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তুমি চল তাই বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গী তোমার আছে, সেইজন্যেই হয়তো তোমার কথা সে বুঝবে না।
বাধা দিয়ে এওয়ার্ড তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, লুসি তুমি যে কী বল তোমার কথাও আমার বোধগম্য হয় না।
লুসির চোখে মুখে অবাক বিস্ময়।
লুসি বলল-বিচারের মাধ্যমে অনুসন্ধানের কথা আমি বলতে চাইছি। এইজন্য জার্দাকে এখানে একবার হাজিরা দিতে হবে। আমি জানতে চাইছি, সে কি এখানে থাকবে, না ‘হোয়াইট হার্ট’-এ চলে যাবে? এখানকার সংসর্গ তার মন আরও ভারাক্রান্ত করে তুলবে। হোয়াইট হার্ট’-এর লোকেরাও তাকে ভালো চোখে দেখবে না বরং কুটি করেই তাকাবে। সেইসঙ্গে থাকবে সাংবাদিক বন্ধুদের ভিড়। বুধবার এগারোটা কি এগারোটা তিরিশে বোধহয় হবে (একটা মৃদু হাসির রেখা লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেলের ঠোঁটে ভেসে ওঠে)।
