মিডগের মনে হয় লুসির আচার-ব্যবহারে স্বাভাবিকতার ছাপই স্পষ্ট। জাদা চলে যাবার পরে হলের মধ্যে সেই পূর্বেকার স্বাভাবিক পরিবেশটা স্বমহিমায় ফিরে এসেছে। জার্দা ক্রিস্টোর ব্যাপারটা যেন নিছক স্বপ্ন। বাইরে থেকে গাড়ির শব্দ এল এবং গাড়ি থেকে নেমে এলেন স্যার হেনরি। লুসি বলে ওঠেন, প্রিয় হেনরি, সব ঠিকঠাক আছে তো?
হেনরি সঙ্গে সঙ্গে জবাবে বলে, হ্যাঁ, সেক্রেটারি সেখানেই উপস্থিত ছিল–বেশ বুদ্ধিমতী উপযুক্ত মেয়ে। সে নিজের তাগিদে সমস্ত জিনিষের ভার নিয়ে নিল। মনে হল, একটা বোনও আছে। সেক্রেটারি তাকে টেলিগ্রাম করে দিয়েছে।
লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল বলে ওঠেন, আমি তো জানতাম, টুনব্রিজওয়েবস-এ থাকে।
স্যার হেনরি বলেন–বেক্সিল হবে বোধহয়?
লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল বলেন–হ্যাঁ, খুব সম্ভব বেক্সিলই হবে।
গাজন এসে বলে ওঠেন যে, ইন্সপেক্টর গ্রাঞ্জের টেলিফোন এসেছিল, বুধবার বেলা এগারোটা নাগাদ বিচারের মাধ্যমে অনুসন্ধান শুরু হবে।
স্যার হেনরি নীরবে মাথা নাড়েন। লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল বলেন, মিডগে, তুমি তোমার দোকানে একটা ফোন করে দাও। বাধ্য সন্তানের মতো মিডগে ধীর পদক্ষেপে টেলিফোনের কাছে এগিয়ে যায়।
তার জীবন এখন এমনি একটা অবস্থার মধ্যে দিয়ে চলেছে যে, সে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না, কিভাবে তার মালিককে সে বুঝিয়ে বলবে যে, চারদিন ছুটি নেবার পর আজও সে কাজে যেতে পারবে না কারণ সে একটা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিজের অজান্তে জড়িয়ে পড়েছে। সবকিছু শোনার পরেও এটাকে ঠিক বিশ্বাসযোগ্য রূপে মানা যাচ্ছিল না, মনে হচ্ছিল না। বক্তব্যের মধ্যে সত্যিকারের কোন আসল সত্য লুকিয়ে আছে কিনা।
ম্যাডাম আলফ্রেজ এমনই এক মহিলা কোনো কিছু বোঝানো যাকে সত্যি খুব কষ্টকর। মিডগে দৃঢ়চিত্তে টেলিফোনের রিসিভার তুলল।
ইহুদী মহিলাটিকে মিডগে বুঝিয়ে বলল যে, সে কিছুতেই কিছু বোধগম্য করে উঠতে পারছে না। সে কেবলই একটা বুলি আওড়ে চলেছে, তুমি কী জান না আমার লোকবল কম? তোমার এমন কি হয়েছে যে, আরও দুটো দিন তোমার টিকি মিলবে না, সব ঝামেলা এসে পড়বে আমার ঘাড়ে? মৃত্যু? কবর দেওয়া? তুমি কী বিশ্বাস কর যে, আমি তোমার সাজানো এইসব বাজে অজুহাত মেনে নেব?
মিডগের কণ্ঠস্বরে এতটুকু জড়তা নেই, সে মুক্ত কণ্ঠেই এই কথা বলে ওঠে।
আলফ্রেজ–কি? পুলিস? তুমি পুলিসের হাতে পড়েছ নাকি?
মিডগে পুনরায় বোঝতে শুরু করে দেয়। সে ধৈর্যের সীমা হারিয়েছে, আর সে চিৎকার করে উঠেছে। ভাবে, মিডগে একটা খারাপ ব্যাপারে পুলিসের হাতে ধরা পড়েছে। একটা খারাপ পুলিস কেস!
এডওয়ার্ড দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে কিন্তু মিডগের জন্যই তাকে থেমে যেতে হয়।
এডওয়ার্ডের উপস্থিতি তার মনে অনেক সাহস এনে দেয়। অনুনয় বিনয় করে ইহুদী রমণীর উদ্দেশ্যে সে বলে ওঠে, আমি সত্যিই খুব দুঃখিত মহাশয়া, কিন্তু দেখুন এ ব্যাপারে আমার কোনো দোষ নেই।
ইহুদী রমণীর ক্রুদ্ধ আর্তচিৎকার যেন কিছুতেই থামে না। সে বলে, ওরা তোমার বন্ধু? ওরা কেমন অদ্ভুত চরিত্রের লোকরে বাবা, একটা লোককে গুলি করে নিজেরাই পুলিসে খবর দেয়? আমি বহুক্ষণ চিন্তা করার পর একটা সিদ্ধান্তেই পৌঁছতে পেরেছি যে, তোমাকে আর কোনোভাবেই নেওয়া যায় না, আমি কিছুতেই আমার নিজের সংস্থার মান ডোবাতে পারি না।
মিডগে এবারও তাকে অনুরোধের সুরে কাকুতি-মিনতি করে আসলে ব্যাপারটা কী ঘটেছিল সেটাই বোঝাতে সক্ষম হল, রিসিভারটা যথাস্থানে রেখে দেবার পর সে যেন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বাঁচল।
দেখো, এমন স্থানে আমি কাজ করি। আমাকে বলতে হল যে, বৃহস্পতিবারের আগে আমার পক্ষে যাওয়া কিছুতেই সম্ভব হচ্ছে না-পুলিস এবং বিচারের মাধ্যমে অনুসন্ধানের জন্য–মিডগে বলে ওঠে।
এডওয়ার্ড–আমার মনে হয় এরা লোক হিসেবে প্রত্যেকই বেশ ভালো। এই পোষাকের দোকানটা তোমার কেমন লাগে? যে মহিলার দোকান, তিনি তোমার প্রতি সহানুভূতিশীল?
মিডগে–এই মুহূর্তে সেভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। সে একজন হোয়াইট চ্যাপেল ইহুদী স্ত্রীলোক, কলপ করা কেশ, কণ্ঠস্বরও বেশ কর্কশ।
এডওয়ার্ড–কিন্তু প্রিয় মিডগে–এডওয়ার্ডের বলার ভঙ্গিমা এমন ছিল যে, মিডগে হেসে ফেলে।
এডওয়ার্ড আবার বলে–কিন্তু প্রিয় বোন–খুব ভালোভাবে এইটুকু সত্য উপলব্ধি করতে পেরেছি যে এমন আচার-আচরণ তুমি মোটেই সহ্য করতে পার না। তোমাকে যদি কোনোদিন অন্যের অধীনে চাকরি করতেই হয়, তবে এমন জায়গায় চাকরি নেবে যেখানকার পারিপার্শ্বিক অবস্থার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে সামঞ্জস্য রেখে চলতে পারবে, যাদের সঙ্গে তোমাকে একসঙ্গে বসে চাকরি করতে হবে তারা তোমার পছন্দমতোই হবে।
মিডগে তার মুখের দিকে অপলক নয়নে তাকিয়ে থাকে, কিন্তু কোনো জবাব দেয় না। একটা চিন্তাই তাকে বড় উতলা করতে থাকে, এডওয়ার্ডের মতো লোককে কী করলে বোঝানো সম্ভব? শ্রমের বাজার, চাকরি প্রভৃতি সম্বন্ধে সে কতটুকুই বা জানে?
তার মধ্যে হঠাৎ করে একটা বিরক্তির জোয়ার দেখা দেয়। সে অনুভব করতে পারে, লুসি, হেনরি, এডওয়ার্ড এবং এমনকি হেনরিয়েটাও তার থেকে পৃথক। তার মধ্যে এবং ওদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে যেন এক দুস্তর ব্যবধান। যে উপসাগরের ব্যবধান–যে উপসাগর পার হওয়া কোননামতেই সম্ভব নয়–যে উপসাগর চাকুরিজীবী মানুষ আর আরামে-বসে-থাকা মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করতে পেরেছে এক ব্যবধান। একটা চাকরি পাবার এবং তা বজায় রাখা যে কত কষ্টের, সে সম্বন্ধে তাদের বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। কেউ হয়তো বলবে যে, জীবনধারণের জন্য তার চাকুরী করার কোনো প্রয়োজন নেই। লুসি এবং হেনরি খুশিমনেই তাকে একটা বাড়ি দেবেন সেই সঙ্গে কিছু ভাতাও। এডওয়ার্ড হয়তো স্বেচ্ছার সঙ্গেই কিছু ভাতা দিতে রাজী হবে।
