কিন্তু আমি করেছিলাম।
হেনরিয়েটা তাড়াতাড়ি করে বলে ওঠে, আইন্সউইকে ফিরে যাবার বাসনা আমার নেই, আশা করি ভবিষ্যতেও হবে না।
মিডগে ধীরে ধীরে শান্ত কণ্ঠে শুধু বলে, আমার সত্যি বড় অবাক লাগছে।
.
১৪.
সোমবার সকালে মিডুগের একটু তাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙে যায়। কিন্তু বিছানা ত্যাগ করার আগে কিছুক্ষণ আচ্ছন্নের মতো শুয়ে থাকল, চোখে তখনও ঘুমের রেশ। কিন্তু তার দৃষ্টি বার বার চলে যেতে লাগল দরজার দিকে। কারণ সে ভেবে রেখেছিল লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল হয়তো এসে দাঁড়াবে। প্রথম দিন সকালে লুসি এসে কী বলে গিয়েছিল?
দুঃসহ সাপ্তাহান্তিক একটি ছুটি? সে ভেতর ভেতর যথেষ্ট উদ্বিগ্ন ছিল–তার যেন কেবলই মনে হচ্ছিল অপ্রীতিকর কিছু ঘটবে। হ্যাঁ তার আশঙ্কা মিথ্যে ছিল না–অপ্রীতিকর কিছু তো ঘটেই ছিল–এমন কিছু ঘটল, যা এখনও মিডগের অন্তর বিদ্ধ করছে এবং তার মনের সব আশা-আকাঙ্ক্ষাকে কালো মেঘের মতো আচ্ছন্ন করে রেখেছে। সে এইসব ভাবতে চায় না, এইসব চিন্তা থেকে সে দূরে থাকতে চায়, স্মরণ করতেও তার মনের প্রবৃত্তি হয় না। যা ঘটেছিল সে সত্যিই ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিল। শুধু সেই নয়, এডওয়ার্ডের মতো মানুষকেও ঘটে যাওয়া সব কিছু স্পর্শ করতে পেরেছিল।
স্মৃতি খুব দ্রুত মনের পর্দায় এসে ভেসে ওঠে। কুৎসিত-ভয়ঙ্কর একটা শব্দ–হত্যা।
মিডগে ভাবে, ওঃ না, ওটা বোধহয় সত্য নয়। ওটা কখনোই সত্য হতে পারে না। আমি যেন স্বপ্নরাজ্যে বিচরণ করছি! জন ক্রিস্টো নিহত–গুলিবিদ্ধ তার প্রাণহীন দেহটা পুলের ধারে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে, রক্ত এবং নীল জল যেন হয়ে উঠেছে গোয়েন্দা কাহিনীর জ্যাকেট। কাল্পনিক, অসহ্য। এরকম ঘটনা বোধহয় সচরাচর খুব কমই ঘটে। এই সময়ে যদি আমরা আইন্সউইকে উপস্থিত থাকতাম, তাহলে এরকম অঘটন আইন্সউইকে নাও ঘটতে পারত।
ওটা স্বপ্ন-বাস্তব-সত্য ঘটনা–’নিউজ অব দি ওয়ার্ল্ড’-এ একটা ঘটনা বটে। সে, এডওয়ার্ড, লুসি, হেনরি এবং হেনরিয়েটা সকলেই এই ঘটনার সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত।
অন্যায়-নিঃসন্দেহে অন্যায়-কারণ কারো সঙ্গে ওর তেমন কোনো সম্পর্ক ছিল না, জার্দা যদি সত্যি সত্যিই ওর স্বামীকে হত্যা করে থাকে।
মিডগে অস্থিরভাবেই নড়ে-চড়ে বসে।
শান্ত, মূর্খ, আংশিক করুণ জার্দা–জাদাকে এরকম একটা হাস্যকর নাটকের সঙ্গে জড়াতে পার না-উৎপীড়নের সঙ্গে তাকে জড়ালেও জড়ানো যেতে পারে।
সত্যি সত্যি কাউকে গুলি করে মারা জার্দার পক্ষে সম্ভব নয়।
আবার সেই অন্তঃস্থ অস্থিরতার তাগিদ। না, না, এভাবে ভাবাটা বোধহয় কারো উচিত নয়। আর কেই বা জনকে গুলি করে মারতে পারে? জনের মৃতদেহের পাশেই দাঁড়িয়েছিল জার্দা তার হাতেই ধরা ছিল রিভলবার।
রিভলবারটা সে হেনরির পড়ার ঘর থেকেই সংগ্রহ করেছিল। জার্দা নিজের মুখেই এই বিবৃতি দিয়েছিল যেজনকে সেই প্রথম মৃতরূপে আবিষ্কার করে, রিভলবারটা সে তার পাশ থেকে মাটি থেকে কুড়িয়ে নিয়েছিল। ভালো, এর থেকে আর কী বা সে বলতে পারে? নিরুপায় হয়েই মুখ খুলতে হয়েছে-নেহাতই অনুর্বর দুর্বল কথা। হেনরিয়েটাই জার্দাকে একমাত্র সমর্থন করতে পেরেছে। সেই শুধু প্রথম থেকে বলে যাচ্ছে জার্দার কথা উড়িয়ে দেওয়া যায় না, তার বক্তব্য সত্য হতেও পারে। অন্য কোনো বিকল্প বা কোনো পন্থা হেনরিয়েটা এখনও পর্যন্ত খুঁজে পায়নি। গতরাতে হেনরিয়েটা খুব মুষড়ে পড়েছিল, মুষড়ে পড়ার একমাত্র কারণ জনের অস্বাভাবিক মৃত্যু।
বেচারা হেনরিয়েটা–জনের জন্য আজ সে কত কিছুই না ভাবছে।
সময় কারো জন্যই থেমে থাকে না, সময়ান্তরে সে হয়তো সামলে উঠতে পারবে–সকলেই সব সামলাতে পারে, সব শোকই মানুষের সয়ে যায়। সবাই তার অতীত ভুলেও যায়। হেনরিয়েটা এডওয়ার্ডকে বিবাহ করবে এবং আইন্সউইকে গিয়ে বসবাস করবে। এডওয়ার্ডের মন খুশীতে ভরে উঠবে।
হেনরিয়েটা বরাবর এডওয়ার্ডকে ভালোবাসত। জন ক্রিস্টোর ব্যক্তিত্বই মাঝখানে পড়ে বাধ সাধল। এডওয়ার্ডকে বরং নিষ্প্রভ এবং অপদার্থ করে তুলল।
সেদিন সকালে প্রাতঃরাশের সময় মিডগের মনে হতে লাগল যে, জন ক্রিস্টোর আধিপত্যের রেশ ছিন্ন করে এডওয়ার্ড নিজের ব্যক্তিত্ব বিস্তারের যথেষ্ট সুযোগ পেয়েছে। সে নিজের সম্বন্ধে বরাবরই একটু বেশি সচেতন। কোনো ব্যাপারেই সে আর বিন্দুমাত্র ইতস্তত করে না, বা থেমেও থাকে না। অল্পভাষী ডেভিডের সঙ্গে সে খুশী মনেই কথা বলে যাচ্ছিল।
–ডেভিড, তুমি মাঝে মধ্যে আইন্সউইকে আসবে। সেখানে আমি তোমার জন্য বাড়ির মতোই পরিবেশ সৃষ্টি করব এবং সেখান থেকে তুমি ঐ স্থান সম্পর্কে অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে পারবে।
কমলালেবুর আচার খেতে খেতে ডেভিড নিরাসক্ত কণ্ঠে বলে ওঠে, এই বড় এস্টেটগুলো সত্যি বড় হাস্যকর। এগুলোকে ছোট-ছোট করে ভাগ করাও উচিত।
এডওয়ার্ড সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে, আমি আশা করছি আমার জীবনে আর পুনরাবৃত্তি ঘটবে না, আমার প্রজারা সন্তুষ্ট।
ডেভিড বলে, তাদের সন্তুষ্ট থাকা উচিত নয়, কারোরই সন্তুষ্ট মনে থাকা বোধহয় উচিত নয়।
লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল বলে ওঠেন, এপ যদি তার লেজ নিয়ে খুশী থাকতে পারত।
কিডনির একটা ডিমের দিকে তাকিয়ে এ্যাঙ্গক্যাটেল বলে ওঠেন, নার্সারিতে থাকাকালীন এই সম্পর্কে একটা কবিতাও আমি পাঠ করেছিলাম, কিন্তু কবিতাটা ঠিক কেমন ছিল, মনে করতে পারছি না। আমি তোমার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে প্রস্তুত ডেভিড এবং সেইসঙ্গে বোধহয় শিখে নেব নতুন চিন্তাধারা। যতদূর আমার চোখ যাচ্ছে, একের অপরকে ঘৃণার চোখেই দেখা উচিত–বিনামূল্যে চিকিৎসা এবং শিকার ব্যবস্থাও করা উচিত।
