সে যেন হঠাৎ করে নিজের মধ্যে ফিরে আসে। এডওয়ার্ড, বাস্তবের এডওয়ার্ড যেন পুনরায় ফিরে এল। মৃদু হেসে বলে ওঠে, তুমি আমার সঙ্গে কথা বলছিলে মিডগে? আমি সত্যিই দুঃখিত, আমি হয়তো অন্য কোনো চিন্তায় মগ্ন ছিলাম, তাই হয়তো তোমার কথা আমার কানে প্রবেশ করেনি।
মিডগে–কিছু নয়, আগুন।
এডওয়ার্ড-খুব ভালো আগুন।
মিডগে–আমাদের আইন্সউইকে সর্বদা আগুনের ব্যবস্থা থাকত। মিডগে অর্ধনিমীলিত চোখে এই স্থানে এডওয়ার্ডের কথা কল্পনা করছে। বাড়ির পশ্চিম পাশের লাইব্রেরি ঘরে এডওয়ার্ড বসত। একটা ম্যাগনেলিয়া একটা জানলা প্রায় ঢেকে দিয়েছিল, সারাটা সোনালি সবুজ রঙে ঘরটাকে ভরিয়ে দিত। অন্য জানলাটা দিয়ে যে-কেউ বাইরে মুক্ত প্রাঙ্গণের দিকে তাকাতে পারত ওয়েলিঙ্গটনিয়া প্রহরীর মতো সেখানে দাঁড়িয়েছিল, তার ডান দিক করে ছিল বড় একটা কপার বী। ওঃ আইন্সউইক–আইন্সউইক!
মিডগে যেন তার কল্পনা জগৎ থেকে আইন্সউইকের সুগন্ধি ঘ্রাণ নিচ্ছে, এই সেপ্টেম্বরেও মোমের মতো শ্বেত-শুভ্র ম্যাগনোলিয়া ফুল ফোটে। আগুনে পাইনের কাঠিগুলো জ্বলছিল, তার গন্ধের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল এডওয়ার্ডের পুঁতির গন্ধ। পেছনের গদি আঁটা চেয়ারে সে বসেছিল। মাঝে মধ্যে বই থেকে মুখ তুলে সে আগুনের দিকে তাকাচ্ছিল এবং একমনে ভেবে যাচ্ছিল হেনরিয়েটার প্রসঙ্গ। মিডগে জিজ্ঞাসা করে, হেনরিয়েটা এখন কোথায়?
এডওয়ার্ড-সুইমিং পুলের ধারেই সে গেছে।
মিডগে-কেন?
এডওয়ার্ড–প্রিয় মিডগে, তোমার নিশ্চয়ই অজানা নয় যে, ক্রিস্টো কতখানি তার মন জুড়ে ছিল।
মিডগে–একটা ব্যাপার আমি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছি না যে, যেখানে গুলি করা হয়েছে সেখানে বসে থাকার কী কারণ থাকতে পারে? হেনরিয়েটার ক্ষেত্রে এটা শোভা পায় না। রঙ্গ-নাটকীয়তা তো কোনোকালেই তার মধ্যে ছিল না।
এডওয়ার্ড-কী করে জানবে কার মধ্যে কী আছে? হেনরিয়েটাকে দেখে বুঝতে পারছ না?
ভ্রূ কুঞ্চিত করে মিডগে বলে ওঠে, এডওয়ার্ড, তুমি আর আমি তো সারাটা জীবন ধরেই হেনরিয়েটাকে জেনে আসছি।
এডওয়ার্ড–তারও পরিবর্তন হয়েছে।
মিডগে–আমার কিন্তু সেটা একবারের জন্যেও মনে হয় না। সত্যি কি আশ্চর্যভাবেই না মানুষের পরিবর্তন ঘটে যায়?
এডওয়ার্ড-হেনরিয়েটাও আর আগের হেনরিয়েটা নেই, তার মধ্যেই পরিবর্তন এসেছে।
মিডগে অবাক চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে।
এডওয়ার্ড-তোমার আর আমার তুলনায় তাদের মধ্যে বোধহয় একটু বেশি পরিবর্তন এসেছে।
মিডগে–আমি কিন্তু একদম বদলাইনি, আগের মতোই আছি, আর তুমি?
এডওয়ার্ড-মিডগে, তোমার দর্শন যদি প্রায়ই মিলত।
মিডগে–(সহাস্যে) আমি জানি, আমি বুঝি, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগ রেখে চলা আজকাল সত্যিই বড় মুস্কিল হয়ে পড়ে।
এডওয়ার্ড-লুসির কথাই ঠিক, দিনটা কী খারাপ ভাবেই না শুরু হয়েছে, হত্যার মধ্যে দিয়েই যদি দিন শুরু হয়, তবে আর ভালো কিছু হওয়ার সম্ভাবনা আছে কি! আমার এখন শুতে যাবার সময়, আচ্ছা, শুভরাত্রি।
এডওয়ার্ড বেরিয়ে যাবার পরেই হেনরিয়েটা জানলা দিয়ে এসে প্রবেশ করে। মিডগে তার দিকে একবার তাকাল।
মিডগে–এডওয়ার্ডের সঙ্গে তুমি কী করেছ?
কপালে ভাঁজ পড়ে হেনরিয়েটার, সে যেন একটু বেশি ভেবে ফেলেন।
মিডগে–হ্যাঁ, এডওয়ার্ড যখন ঘরে প্রবেশ করেছিল তাকে দেখে মনে হয়েছিল সে যেন নিস্তেজ হয়ে পড়েছে এবং চোখমুখও কেমন যেন ফ্যাকাসে।
হেনরিয়েটা–এডওয়ার্ডের জন্য তোমার মনে যখন এতই সহানুভূতি, তবে তার জন্য কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছ না কেন তুমি?
মিডগে–কিছু করব? তুমি বলতে কী চাইছ?
হেনরিয়েটা–আমি কিছুই জানি না। একটা চেয়ারের ওপর দাঁড়িয়ে চিৎকার করে তোমার বক্তব্য বলতে পার। নিজের দিকে একটু দৃষ্টি দাও। তোমরা কি বোঝো না যে, সেটাই এডওয়ার্ডের মতো লোকের একমাত্র আশা?
মিডগে–তুমি ছাড়া আর কাউকে সে বিন্দুমাত্র গ্রাহ্য করতে পারে না হেনরিয়েটা।
হেনরিয়েটা–তাহলে তো এটা তার পক্ষে বড় নির্বোধের মতোই কাজ হল।
মিডগের দিকে চকিত দৃষ্টিতে হেনরিয়েটা একবার দেখে নিয়ে বলে উঠল, আমি সত্যিই খুব দুঃখিত, নিজের অজান্তে যদি তোমার মনে দুঃখ দিয়ে থাকি তার জন্য আমাকে ক্ষমা করো। আজ রাতে আমি এডওয়ার্ডকে এই ব্যাপারটা খুব ভালো বুঝিয়ে দিয়েছি যে, মনে মনে আমি তাকে কতটা ঘৃণা করি।
মিডগে–ঘৃণা? এডওয়ার্ডকে? তোমার পক্ষে এটা কখনোই সম্ভব নয়।
হেনরিয়েটাওঃ হ্যাঁ, আমি সব পারি। তুমি জান না—
মিডগে–কি?
হেনরিয়েটা–এমন কিছু জিনিষ আছে যেগুলো আমার মনকে বড় নাড়া দেয়, সে আমাকে বারংবার সেই জিনিষগুলো স্মরণ করিয়ে দেয়, যা আমি মনে রাখতে চাই না, ভুলে যেতে চাই।
মিডগে–কি জিনিষ?
হেনরিয়েটা–ধরে নাও না–আইন্সউইকের কথা।
মিডগে–আইন্সউইক? তুমি আইন্সউইককে ভুলে যেতে চাও?
হেনরিয়েটা–হ্যাঁ, হা, হা! আমি সেখানে বেশ সুখী ছিলাম, এই মুহূর্তে সে আনন্দের কথা সহ্য পর্যন্ত করার ক্ষমতা আমার নেই।
তুমি কি কিছুই বুঝতে পার না? এমন অনেক সময় এসে দাঁড়ায় যখন সে জানতেও পারে না ভবিষ্যতে কি হবে? আবার এমনও অনেক সময় আসে যখন সবকিছুই বেশ ভালো লাগে, সবকিছুই তখন ভীষণ অপরূপ, রমণীয় রূপেই চোখের সম্মুখে ধরা দেয়। এ জগতে জ্ঞানী লোকের সংখ্যাও খুব কম নয়, যারা কখনও সুখের স্বপ্ন দেখে না, আশা করে না তাদের জীবনে সুখের।
