এডওয়ার্ড আপন মনে বিড়বিড় করতে থাকে, আমাদের মধ্যে অনেক জিনিষেরই বেশ মিল।
হেনরিয়েটা–তুমি কী সুন্দর সুন্দর করে কথা বলতে পার। তবে একটা জিনিষ কিন্তু তোমাদের দুজনের মধ্যেই বর্তমান ছিল, সেটা আমি। তোমরা দুজনেই আমাকে ভালোবাসতে, তাই না? কিন্তু তোমাদের মধ্যে কোনো বন্ধনই হয়নি তাতে, বরং তার বিপরীতটাই ঘটে গেছে।
চাঁদ মেঘের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছিল। এডওয়ার্ড চমকে ওঠে, সে যখন লক্ষ্য করল যে, হেনরিয়েটা একদৃষ্টে তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। আইন্সউইকে যে হেনরিয়েটাকে সে দর্শন লাভ করেছে তার অভিক্ষেপণ হিসাবে সে অজ্ঞাতসারে হেনরিয়েটাকে দেখেছে। সে চিরদিনই তার কাছে হাস্যময়ী এক বালিকা ছিল যার নৃত্যচঞ্চল চোখে যেন অফুরন্ত প্রত্যাশা! যে স্ত্রীলোকটিকে এখন সে দেখতে পাচ্ছে সে যেন তার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিতা। তার সেই উজ্জ্বল চোখ এখনও বর্তমান কিন্তু তার প্রীতিহীন দৃষ্টি এবং তার প্রতি যেন শত্রুভাবাপন্ন।
এডওয়ার্ড আগ্রহ সহকারে বলে ওঠে, হেনরিয়েটা, প্রিয়তমে, আমার ওপর বিশ্বাস রাখো, আমি তোমার প্রতি যথেষ্ট সহানুভূতিশীলতোমার দুঃখে, তোমার শোকে এবং তোমার ক্ষতিতে আমি বরাবরই সংবেদনশীল।
–এটাকে কি দুঃখ বলা যায়?
প্রশ্নটা তাকে সচকিত করে তোলে। হেনরিয়েটা বোধহয় প্রশ্নটা তাকে নয়, নিজের কাছেই নিজেই জবাবদিহি করছে।
হেনরিয়েটা ধীরেসুস্থে বলে ওঠে, এত তাড়াতাড়ি–এত তাড়াতাড়ি ওটা ঘটে যেতে পারে। এখন জীবন্ত, নিশ্বাস ফেলছে এবং পরমুহূর্তে-মৃত–গত–খালি। ও শূন্যতা। এইটুকুই যা পার্থক্য!
আমরা সকলেই এখন ক্যারামেল ক্যাস্টার্ড খেতেই ব্যস্ত এবং আমাদিগকে প্রাণবন্ত বলছি–আর জন, যে আমাদের থেকে বেশি জীবন্ত ছিল, সে আজ মৃত। কথাটা বার বার আমি নিজেকেই বোঝাতে চাইছি। মৃত-মৃত-মৃত তার কোনো অর্থ নেই–একটা গাছের পচা ডাল ডাঙার মতোই কৌতুকভরা বিষয়–এ যেন ঠিক জঙ্গলে ঢোল বাজানো, তাই না? মৃত-মৃত-মৃত-মৃত।
-হেনরিয়েটা, থামো! ঈশ্বরের দোহাই, থামো! এডওয়ার্ডের দিকে সে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকায়।
হেনরিয়েটা–তুমি কি জানতে না যে, আমার চিন্তাধারাটাও একইরকম? তুমি কি ভেবেছিলে? তুমি ভেবেছিলে, একখানা রুমাল চাপা দিয়ে আমি চোখের জল মুছব এবং তুমি আমার হাত ধরে থাকবে? সেটা হয়তো খুব সুখের হবে এবং তাকে খুব সহজে ভুলেও যাওয়া যায়–অর্থাৎ দুঃখের ভাবটা কাটিয়ে ওঠা যায় এবং তাতে হয়তো সান্ত্বনাও মিলে যায়। তুমি খুব ভালো এডওয়ার্ড। তুমি খুব ভালো, একটু বেশি–অত্যন্ত অপ্রতুল।
এডওয়ার্ড পিছু হটতে শুরু করে, তার মুখও কঠিন হয়ে যায়। শুষ্ক কণ্ঠে সে শুধু বলে ওঠে, হা, আমি তা জানতাম।
হেনরিয়েটা তিক্ত কণ্ঠে বলে ওঠে, তোমরা এত কী ভাবছ? অন্যান্য সন্ধ্যার মতো আজকের সন্ধ্যাতেই সবাই একত্র হয়েছে, জনের মৃত্যুতে কেউ তাদের হিসেবের মধ্যে আনতে চাইছে না, ব্যতিক্রম শুধু আমি আর জার্দা। তুমি খুশী, ডেভিড বিব্রত, ব্যথিত মিডগে, আর লুসি ‘নিউজ অব দি ওয়ার্ড’-এর সংবাদ উপভোগ করছে! তোমার স্বপ্নে আসতে শুরু করে দিয়েছে নাকি আজগুবি-ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন?
এডওয়ার্ড মুখে কিছু না বলে এক পা এগিয়ে ছায়ার মধ্যে মিলিয়ে গেল। তার দিকে তাকিয়ে হেনরিয়েটা বলে ওঠে, আজ রাতে আমার কাছে কোনো কিছুই বাস্তব নয়–কেউই বাস্তব নয়, শুধু একজন ছাড়া।
এডওয়ার্ড শান্ত কণ্ঠে বলে ওঠে, আমি জানি..বাস্তবের সঙ্গে আমার কোনো মিল নেই।
হেনরিয়েটা–আমি কী তাহলে পাষণ্ড, এডওয়ার্ড। কিন্তু আমি না বলে পারছি না যে, জন এত বেশি জীবন্ত ছিল–আজ সে মৃত?
এডওয়ার্ড–আমি সে অর্ধমৃত, সে জীবন্ত।
হেনরিয়েটা–আমি ঠিক সেভাবে বলতে চাইছি না এডওয়ার্ড।
এডওয়ার্ড–তুমি সেই কথা বলতে চেয়েছ হেনরিয়েটা এবং সেটাই বোধহয় ঠিক।
কিন্তু হেনরিয়েটা পুরোনো রেশ টেনে বলতে থাকে, এটা মোটেই দুঃখের নয়, আমি বোধহয় একটু বেদনা অনুভব করছি না, কোনোদিন হয়তো পারবও না–জনের কথা আলাদা, তার জন্য শোকপ্রকাশ করতে আমার মন চাইছে।
হেনরিয়েটার কথা এডওয়ার্ডের কাছে অবাস্তবই মনে হয়, সে আরও বেশি অবাক হয়, হেনরিয়েটা যখন বলে ওঠে, সুইমিং পুলের কাছে নিশ্চয়ই যাব।
হেনরিয়েটা গাছের মধ্যে মিলিয়ে যায় এবং ভোলা জানালার মধ্যে দিয়ে স্বমহিমায় ফিরে আসে এডওয়ার্ড।
মিডগে এডওয়ার্ডের দিকে তাকায়। তার মুখ ফ্যাকাসে, এবং গম্ভীর ও মিডগের দীর্ঘশ্বাস তার কানে পৌঁছয় না। এডওয়ার্ড যন্ত্রচালিতের মতো একটা চেয়ার দখল করে বসে পড়ে এবং বলে ওঠে, আজ বড্ড ঠান্ডা।
–তোমার কি খুব শীত করছে, এডওয়ার্ড? আমরা কি–আমরা কি তাহলে আগুন জ্বালাব?
এডওয়ার্ড–কি?
মিডগে একটা দেশলাইয়ের বাক্স নিয়ে অগ্নিকুণ্ড ধরিয়ে দেয়। সে আরো বলে, আগুন বেশ আরামদায়ক, শরীরও গরম হয়। তাকে দেখে মনে হয় যেন সে শীতার্ত। মিডগে ভাবে, তাকে এমন দেখাচ্ছে, হেনরিয়েটা কি তাকে এ বিষয়ে কিছু বলছে? তোমার চেয়ারটা বরং আরও কাছে এগিয়ে আনো, আগুনের একদম কাছে নিয়ে এসো এডওয়ার্ড।
এডওয়ার্ড–কি?
মিডগে–তোমার চেয়ারটা আগুনের কাছে নিয়ে এসো, সে এত জোরে জোরে কথা বলছিল শুনে মনে হবে সে হয়তো কোনো বধির লোকের সঙ্গে আলাপ করছে।
