ঠিক এরকমটা না হলেও প্রায় ঐ ধরনের একটা ঘটনা গত বছর ঘটে গিয়েছিল আশারিজের কাছে। ভদ্রলোক অবসরপ্রাপ্ত সামরিক বিভাগের একজন–উল্লেখযোগ্য চাকরি জীবনের কৃতিত্ব স্ত্রী খুব ভালো, শান্ত, সুন্দরী, পুরোনো ভাবধারার মানুষবয়স প্রায় পঁয়ষট্টির মতো। একদিন স্ত্রী ভদ্রলোকের চাকরি করার সময়কার রিভলবারটা নিয়ে এসে বাগানে ভদ্রলোককে গুলি করে মেরেছেন ঠিক এমনটি ভাবে। অবশ্য এই ঘটনার পেছনে অনেক কিছু রহস্য লুকিয়ে ছিল, এটা অবশ্য আমাদের খুঁজে বার করতে হয়েছে। প্রথমে অবশ্য ভাওতা দেবার উদ্দেশ্যে নানা গল্প শোনানো হয়েছিল–আমরাও সেটা বাহ্যত বিশ্বাস করে ভেতরে ভেতরে অনুসন্ধান চালিয়ে আসল ব্যাপারের সন্ধান পেয়ে গেলাম।
পৈরট–আপনারা কি তাহলে এটাই মেনে নিয়েছেন যে, মিসেস ক্রিস্টোই তার স্বামীকে হত্যা করেছেন?
গ্র্যাঞ্জ—(অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে) আপনি কি তাহলে এটা মন থেকে মানতে পারছেন না?
পৈরট–অবশ্য অসম্ভব কিছুই নয়! আবার মিসেস ক্রিস্টো নিজের মুখে যা বলছেন তা সত্য হলেও হতে পারে।
গ্র্যাঞ্জ নিঃশব্দে ঘাড় নাড়েন। হ্যাঁ, তা হতে পারে। কিন্তু গল্পে সে-রকম কোনো জোর নেই–বড়ই ক্ষীণ। তাছাড়া সেখানে উপস্থিত একবাক্যে সকলেই স্বীকার করেছেন যে, তিনি হত্যা করেছেন। আমাদের থেকে তাদের পক্ষেই বেশি জানা সম্ভব।
গ্র্যাঞ্জ সাথীর মুখের দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকালো। জিজ্ঞাসা করল, আপনি যখন এলেন, মিসেস ক্রিস্টোকে দেখে আপনার কী মনে হয় না যে, নিজের কাজ তিনি ভালোভাবেই সমাপ্ত করতে পেরেছেন?
পৈরট আপন মনেই জাল বুনতে থাকে…পথ ধরে এসে…পাশে পাশে এগিয়ে চলেছে গাজন..জার্দা ক্রিস্টো স্বামীর মৃতদেহের পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে…হাতে রিভলবার, চোখে উদাস করা দৃষ্টি..হা হতে পারে…মিস্টার গ্র্যাঞ্জ যা ভাবছেন তা ঘটলেও ঘটে থাকতে পারে..প্রাথমিক ধারণা অবশ্য তাই…হ্যাঁ, কিন্তু পুরোটা নয়…আবার আসল ব্যাপার ঢাকবার চেষ্টাও হতে পারে… সবই হয়তো সম্ভব…।
ইন্সপেক্টর গ্র্যাঞ্জ এটাই জানতে চান যে, জার্দা ক্রিস্টোর মুখের চেহারা সে সময় ঠিক কেমন হয়েছিল।
পৈরটের এবারে সত্যিই অবাক হবার পালা। তার এতদিনকার অপরাধ শাখার কাজের অভিজ্ঞতায় সে কোনোদিন এমন অদ্ভুত স্ত্রীলোকের মুখোমুখি হয়নি যে, সবে মাত্র তার স্বামীর প্রাণ নিয়ে এসে দাঁড়িয়ে আছে। এমন অবস্থায় একজন স্ত্রীলোকের মুখের ভাব কেমন হওয়া উচিত? বিজয়িনী, ভীতা, আত্মতৃপ্তা, হতবুদ্ধি, শূন্য দৃষ্টি? হয়তো এগুলোর যে-কোনো একটা হবে।
ইন্সপেক্টর গ্র্যাঞ্জ কথা বলে যাচ্ছিল, পৈরট কথার শেষাংশে নিজের বক্তব্য জুড়ে দেয়।
পৈরট–ঘটনার পেছনের সব কথা জানতে হবে এবং চাকরদের কাছ থেকেও সব জানা যেতে পারে।
গ্র্যাঞ্জ–মিসেস ক্রিস্টো কি শেষ পর্যন্ত তাহলে লন্ডনেই ফিরে যাবেন?
পৈরট–হ্যাঁ, তার দুটো সন্তান, তাই তাকে যেতে দিতেই হবে। আমরা অবশ্য তার প্রতি দৃষ্টি রেখেছি, তাকে এ বিষয়ে কিছু জানতে দেওয়া যাবে না। সে ভাবে, সে ভালোভাবেই মুক্তি পেয়ে যাবে..আমার কিন্তু তাকে খুব বোকা স্বভাবের স্ত্রীলোক বলেই মনে হয়…।
জার্দা ক্রিস্টো কি বুঝতে পারে যে তার সম্বন্ধে পুলিসের মতামতটা কি? পুলিস কী ভাবছে? এ্যাঙ্গক্যাটেলরা মনে মনে কী ভাবছে?
সে এমন একটা ভাব দেখাচ্ছে, সে যেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। সে এমন এক স্বভাবের স্ত্রীলোক যাদের প্রতিক্রিয়া হয় অনেক দেরিতে, এখন সব গুলিয়ে ফেলেছে, স্বামীর মৃত্যুতে তার হৃদয় এখন ভেঙে গেছে।
তারা লেনের মধ্যে ঢুকে পড়েছিল। পৈরট তার দরজার কাছে এসে থেমে যায়। গ্র্যাঞ্জ বলে ওঠে, এই ছোট্ট বাড়িটা আপনার? সুন্দর এবং নিরিবিলি! আচ্ছা, এখনকার মতো বিদায়! আপনার সহযোগিতার জন্য অনেক ধন্যবাদ মিস্টার পৈরট। আবার যে-কোনো সময়ে এসে হাজির হয়ে যাব এবং আমরা কীভাবে অগ্রসর হচ্ছি, আপনাকেও সে কথা জানাব। তার চোখ লেনের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে লাগল। আপনার প্রতিবেশী কে?
পৈরট–মিস ভেরোনিকা ক্রে, অভিনেত্রী, সপ্তাহান্তিক ছুটিতে বোধহয় এসে উপস্থিত হয়েছে।
স্যার হেনরির সম্মুখে ডেস্কের ওপর রিভলবারটা রেখে দিয়ে ইন্সপেক্টর গ্র্যাঞ্জ নিঃশব্দে মাথা নাড়ে।
গ্র্যাঞ্জ–এটা পুলের মধ্যেই ছিল। আঙুলের ছাপ যা কিছু ছিল সবই বোধহয় নষ্ট হয়ে গেছে। এটা বড়ই দুঃখের যে, মিস স্যাভারনেকের হাত থেকে জলে পড়ে গিয়েছিল।
হেনরি-হা, হা-কিন্তু সে-সময়টা আমাদের সবার কাছেই একটা উত্তেজক মুহূর্ত ছিল, বিশেষ করে স্ত্রীলোকেরা দুর্বল চিত্তের হন বলেই একটু অল্পেই ঘাবড়ে যান এই অবস্থায় তাদের হাত থেকেই সেইজন্যই হয়তো পড়ে যাওয়া সম্ভব।
গ্র্যাঞ্জ–(মাথা নেড়ে) কিন্তু মিস স্যাভারনেক তত বেশ শান্ত ধীর এবং যথেষ্ট ধৈর্যশালী চতুর এক মহিলা। কথাগুলোর মধ্যে তেমন জোর না থাকলেও এমন একটা প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত ছিল যার জন্য স্যার হেনরি মুখ না তুলে পারলেন না।
-এটা কী চিনতে পারলেন স্যার?
স্যার হেনরি রিভলবারটা পরীক্ষা করে নম্বরটা টুকে নিয়ে নিজের চামড়ায় বাঁধানো একটা নোটবইয়ে লেখা নম্বরের সঙ্গে মেলাতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পরে বই বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে ওঠেন, হ্যাঁ ইন্সপেক্টর, এটা আমার সংগ্রহেরই অন্যতম।
