–সে তাড়াতাড়ি বাধা দিয়ে বলে ওঠে, সলিসিটার? সলিসিটার আবার কেন। সলিসিটার কেমনভাবে জানবে যে জনের মৃত্যু কীভাবে হয়েছে?
ইন্সপেক্টর গ্র্যাঞ্জ একটু কাশলেন। স্যার হেনরি কিছু বলতে চাইছিলেন। হেনরিয়েটা এই সময়ে বলে ওঠে, আজ সকালে কী ঘটেছে, ইন্সপেক্টর সেটা জানতে চাইছেন।
জাদা তার দিকে ফিরে বিস্ময়ের সুরে বলে ওঠে, আগাগোড়াই এটা একটা নিছক দুঃস্বপ্ন–বাস্তব নয়! আমি–আমি–আমি একবিন্দু চোখের জল ফেলতে পারছিলাম না বা অন্য কিছু করার মতো ক্ষমতা তখন ছিল না। কারো পক্ষেই বোধহয় এই অবস্থায় কিছু করা সম্ভব নয়..
গ্র্যাঞ্জ সান্ত্বনার সুরে বলে ওঠে, আঘাত দেবার জন্যই বোধহয় এটা ঘটেছে মিসেস ক্রিস্টো।
জাদা-হ্যাঁ, হ্যাঁ, বোধহয় তাই। এটা সত্যিই খুব আকস্মিক, আমি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পথ ধরে সুইমিং পুলের দিকে…।
গ্র্যাঞ্জ–কটার সময়, মিসেস ক্রিস্টো?
জাদা–একটার আগে হবে হয়তো–একটা বাজার মিনিট দুই আগে, ঘড়িটা তখন আমি দেখেছিলাম। সেখানে পৌঁছে সত্যিই চোখে পড়ে জনের নিপ্রাণ দেহ, কংক্রিটের ধারে রক্তে ভেসে যাচ্ছে…
গ্র্যাঞ্জ–গুলির শব্দ কি আপনার কানে এসেছিল?
জার্দা-না-না–আমি জানি না। আমি শুনেছিলাম, স্যার হেনরি এবং মিস্টার এ্যাঙ্গক্যাটেল শিকারের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছেন…আমি…আমি শুধুমাত্র জনকে দেখেছি
গ্র্যাঞ্জ–হ্যাঁ, মিসেস ক্রিস্টো?
জার্দা–জন, রক্ত এবং পাশে পড়ে থাকা একটা রিভলবার। রিভলবারটা আমি মাটি থেকে তুলে নিজের হাতে নিয়েছিলাম।
গ্র্যাঞ্জ-কেন?
জাদা–আমাকে মাপ করবেন।
গ্র্যাঞ্জ–মিসেস ক্রিস্টো, আপনি রিভলবারটা তুলতে গেলেন কেন?
জাদা–আমি নিজেও ঠিক বলতে পারব না।
গ্র্যাঞ্জ–ওটাতে হাত ঠেকানো আপনার বোধহয় উচিত হয়নি।
জার্দা–আমার উচিত হয়নি? উদাস চোখের দৃষ্টি মুখের বিমূঢ় ভাব জার্দার। কিন্তু আমি ধরেছিলাম। ওটা আমি আমার নিরাপদ আশ্রয়ে হাতের মধ্যে রেখেছিলাম। জার্দা নিজের হাতের দিকে একবার তাকাল, এখনও যেন-রিভলবারটা তার হাতের মধ্যেই ধরা আছে।
সে তাড়াতাড়ি ইন্সপেক্টরের দিকে তাকাল, তার কণ্ঠস্বর হঠাৎ করে কেমন যেন তীব্র হয়ে উঠেছে–তবে নিদারুণ মনস্তাপপূর্ণ। জনকে কেই বা মারতে পারে? কেউ তাকে মারতে চাইবে না। সে ছিল–নিতান্তই সাধাসিধে ভালো মানুষ। এত দয়ালু–এত–এত স্বার্থশূন্য অন্যের জন্য সে নিজেকে উজাড় করে দিতে পারত। সকলে তাকে ভীষণ ভালোবাসত ইন্সপেক্টর। সে একজন অদ্ভুত প্রকৃতির চিকিৎসক ছিল। সকল স্বামীদের মধ্যে সর্বোত্তম এবং দয়ার অবতার। এটা একটা নিছক দুর্ঘটনা–নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই!
সে একটা হাত ছোড়। যে-কোনো লোককে একবার জিজ্ঞাসা করে দেখুন ইন্সপেক্টর। জনকে কেউ মারতে চায়নি। চেয়েছে কি? সকলের কাছে সে আবেদন জানায়।
ইন্সপেক্টর গ্র্যাঞ্জ তার নোটবই বন্ধ করল। শুধু বলে, সহযোগিতা করার জন্য সত্যি ধন্যবাদ, মিসেস ক্রিস্টো। গ্র্যাঞ্জ আবেগহীন কণ্ঠে বলে ওঠে, আপাতত এতেই কাজ চলে যাবে।
হারকিউল পৈরট এবং গ্র্যাঞ্জ বাদাম বনের মধ্যে দিয়ে সুইমিং পুলের দিকে ধীর পদব্রজে অগ্রসর হল। জন ক্রিস্টোর প্রাণহীন-নিঃসাড় দেহের ফোটো তোলা হল, মাপ-জোক করা হল, পরক্ষা-নিরীক্ষা করে বিস্তারিত সবকিছু লিপিবদ্ধ করা হল। এই সবকিছুই পুলিস সার্জেন করে গেছে, পরে মৃতদেহ মর্গের উদ্দেশ্যে পাঠানো হল। পৈরটের সুইমিং পুলটাকে দেখে সত্যি কী নির্দোষ মনে হচ্ছিল! তার মনে হল, এখানকার সবকিছুই আজ তরল, একমাত্র জনকেই তরল-এ ফেলা যায় না। যে মৃত্যুর মধ্য দিয়েও উদ্দেশ্য-নিষ্ঠ এবং বাস্তুতান্ত্রিক। সুইমিং পুল আজ আর নেহাতই এক পুল নয়–সেটা আজ এমন একটা নামে বিখ্যাত হয়ে উঠেছে যে এইস্থানে জন ক্রিস্টোর দেহ শায়িত আছে, তার দেহ থেকে রক্ত নির্গত হয়ে পুলের ধারে কংক্রিটকে ভিজিয়ে দিয়েছে এবং সবশেষে পুলের নীল জলে এসে মিশেছে। পুলের কৃত্রিম নীল জল। কৃত্রিমতা সর্বত্রই পরিব্যাপ্ত।
কৃত্রিমতা শব্দটাকে পৈরট যেন আঁকড়ে ধরে। স্নানের পরে স্যুট পরা একজন লোক এসে রিভলবারটা পুল থেকে তুলে ইন্সপেক্টরের হাতে জমা করে।
সে বলে ওঠে, আঙুলের ছাপ পরীক্ষার আর কোনো সুযোগ নেই, অবশ্য এখানে তার প্রয়োজনও নেই বললেই চলে। মিসেস ক্রিস্টো নিজের হাতে এটা ধরেছিলেন, তাই না মিস্টার পৈরট?
পৈরট-হ্যাঁ।
গ্র্যাঞ্জ–রিভলবারটা সনাক্তকরণ করা হলো দ্বিতীয় কাজ। আমার মনে হয় হেনরি, আমাদের জন্য ইচ্ছে করলে তাই করতে পারেন, তার কাছ থেকেই ওটা সংগ্রহ করেছে। জিনিষটা এখন পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। পুলের নীচ থেকে যে পথটা এসেছে সেটা সোজাসুজি ফার্ম থেকে। লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল ঐ পথ ধরেই এসেছিলেন। অন্য দু’জন মিস্টার এডওয়ার্ড এবং মিস স্যাভারনেক–বন থেকে এসেছিলেন ঠিকই কিন্তু একত্রে আসেননি। এডওয়ার্ড এসে উপস্থিত হয়েছিলেন বাঁ-দিকের পথ ধরে এবং এই পথটাই উপরের দিকে ফলের বাগানের মধ্যে দিয়ে চলে গেছে। কিন্তু আপনি যখন এখানে এলেন তখন তারা পুলের ধার ঘেঁষে একটু দূরে উভয়েই দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাই না মিস্টার পৈরট?
পৈরট-হ্যাঁ।
গ্র্যাঞ্জ–এই পথটা তাবুর পাশে পোদ্দার লেন বরাবর চলে গিয়েছে। ঠিক আছে–আসুন, আমরাও না হয় ঐ পথেই যাই। পথ চলতে চলতে গ্র্যাঞ্জ নির্লিপ্ত ভাবে নিজের অভিজ্ঞতা এবং দুঃখবাদ নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন।
