মিডগে হঠাৎ করে কেঁদে ওঠে, তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়তে থাকে বিন্দু বিন্দু অশ্রু।
লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল অবাক হয়ে আপন মনেই বিড়বিড় করতে থাকেন, তিনি বলেন, প্রিয় বোনটি, তুমি বোধহয় একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলছ।
এডওয়ার্ড সোফায় এসে মিডগের পাশে বসে তার কাঁধে হাত রাখে। সে সান্ত্বনার সুরে বলে ওঠে, ধৈর্য হারিও না, মিডগে। এডওয়ার্ডের কাঁধে মুখ লুকিয়ে হাপুস নয়নে অবিরাম ধারায় চোখের জল ফেলতে থাকে মিডগে। তার মনে পড়ে যায় একবার আইন্সউইক-এ বড়দিনের ছুটিতে তার শশক মারা গেলে এডওয়ার্ড তাকে কতই না প্রবোধ দিয়েছে।
এডওয়ার্ড ধীরে ধীরে বলে ওঠে, একটা বড় আঘাত সে পেয়েছে। তাকে একটু ব্র্যান্ডি দেওয়া যায় কি, লুসি?
বোধহয় খাবার টেবিলে পাওয়া যাবে। আমি ঠিক করতে…হেনরিয়েটা ঘরে পা রাখতেই কান্নায় সে ভেঙে পড়ে। মিডগে চুপচাপ বসেছিল। তার মনে হল, এডওয়ার্ড কাঠ হয়ে শান্ত মনে নীরবে বসে আছে। মিডগে ভাবে, হেনরিয়েটার মনের কী অনুভব? সে ভেবেছিল যে, সে তার দিদির মুখের দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারবে না–কিন্তু সেরকম কোনো কিছুই দৃষ্টিতে পড়ল না। হেনরিয়েটার মুখে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন দেখা গেল না। সে দীপ্তকণ্ঠে মাথা উঁচু করে এসে প্রবেশ করল, তার মুখে বিবর্ণতার চিহ্ন মাত্র নেই, বরং চাতুর্যের ছাপটাই পরিস্ফুট। তাকে দেখে লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল বলে ওঠেন, ওঃ তুমি এসেছ, হেনরিয়েটা? তোমার কথাই বসে আমি ভাবছিলাম। পুলিস, হেনরি আর পৈরটের সঙ্গে বসে কথা বলছে। জার্দাকে তুমি কি দিতে পেরেছ? ব্র্যান্ডিং অথবা চা এবং অ্যাসপিরিন?
আমি তাকে একটু ব্র্যান্ডি এবং গরম জলের একটা বোতল দিয়ে এসেছি।
সম্মতির সুরে লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল বলে ওঠেন, ভালো কাজ করেছ–এই জন্যই তোমাকে ফাস্ট-এইড ক্লাসের বলা যেতে পারে। আঘাতের জন্য গরম জলের বোতল–ব্র্যান্ডি নয় কারণ এতে একটা প্রতিক্রিয়া হয়–তবে জাদার কাছে ওটা কোনো আঘাত নয়–আমি ঠিক বলতে পারি, না, স্বামীকে হত্যা করার পর স্ত্রী-মনের যে কী অনুভূতি হয়–এটা এমনই একটা মনের ব্যাপার যা কেউ ভাষা দিয়েও ব্যক্ত করতে পারে না–তবে আর যাই হোক–এটা তেমন কোনো আঘাত নয়, এতে অবাক হবার কিছু নেই।
হেনরিয়েটার স্বর বরফের মতোই শান্ত হিম শীতল, ঘরের গুমোট ভাব যেন এক লহমায় দূর করে দেয়।
সে বলে ওঠে, তোমরা সকলে এতটা জোর দিয়ে কী করে বলছ যে জার্দাই জনকে হত্যা করেছে?
ক্ষণকালের জন্য সবাই চুপচাপ। পরিস্থিতির পরিবর্তনটাও যেন মিডগের দৃষ্টিতে এড়ায় না। হতবুদ্ধি–অস্পষ্টতা–সন্দেহ এবং অনুসন্ধিৎসা সবগুলোই যেন সম্মিলিত হয়ে ঘরময় বিরাজ করেছে।
লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠেন, আমাদের তো দেখেশুনে তাই মনে হচ্ছে। তোমার মনে কী হচ্ছে?
হেনরিয়েটা সমবেদনার সুরে এটাই বোঝাতে চাইছে যে, এমনটা কি অসম্ভব নয় যে, জাদা পুলের কাছে এসে দেখে জন মুখ থুবড়ে পড়ে আছে, রিভলবারটা সেই সময়েই হয়তো সে মাটি থেকে তুলে হাতে নিয়েছে। অথবা তখনই হয়তো সেখানে এসে দাঁড়িয়েছে?
পূনরায় ফিরে আসে সেই নীরবতা। লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল বলে ওঠেন, জাদার কি ঐ একই বক্তব্য?
হেনরিয়েটা শুধু বলে, হ্যাঁ।
ওটা সরল স্বীকৃতি কখনোই নয়। তার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো শক্তি লুকিয়ে আছে। ঠিক রিভলবারের গুলির মতো। লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল উপরে তোলেন, পরে স্পষ্ট অসঙ্গতির সঙ্গেই অবশ্য বলে ওঠেন, খাবার ঘরে স্যান্ডউইচ এবং কফি দুই আছে।
খোলা দরজা দিয়ে প্রবেশ করে জাদা অনুনয়ের স্বরে বলে ওঠে, আমি আর ঘরে শুয়ে থাকতে পারছি না–আমার ভেতর একটা অস্থিরতা–আমি ভয়ানক…
লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠেন, বেচারা প্রিয় জার্দা। তিনি জোর দিয়ে দীপ্তকণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন বটে, তবে কথাগুলো অর্থহীন মনে হল।
এডওয়ার্ড কপালের উপরের অবিন্যস্ত চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে উদভ্রান্তের মতো বিড়বিড় করতে লাগল।
–আমি–আমি একটু একটু হয়তো উপলব্ধি করতে পারছি। আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারি না–এখনও ভালোভাবে বুঝে উঠতে পারিনি যে ব্যাপারটা কি সত্যি?–জন মৃত? সে একটু কেঁপে ওঠে, কে তাকে মেরেছে? কে তাকে এমন নিষ্ঠুরভাবে মারতে পারে?
স্যার হেনরির ঘরের দরজা খুলে যায়। ইন্সপেক্টর গ্র্যাঞ্জকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ঘরে ঢুকলেন। লম্বা-বলিষ্ঠ সুগঠিত মজবুত দেহের অধিকারী গ্র্যাঞ্জ। তার গোঁফ জোড়া নিচের দিকে বাঁকানো– অর্থাৎ ঠিক যেন দুঃখবাদী গোঁফ।
হেনরি লুসিকে দেখিয়ে বলে ওঠেন, এই আমার স্ত্রী ইন্সপেক্টর গ্র্যাঞ্জ। ইন্সপেক্টর গ্র্যাঞ্জ নত মুখে নমস্কার জানিয়ে বলে ওঠে, লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল, আমি মিসেস ক্রিস্টোর সঙ্গে দুটো কথা বলতে পারি কী-লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল সোফায় উপবিষ্ট জাদাকে দেখিয়ে দিলেন। মিসেস ক্রিস্টো?
জার্দা উৎসাহের সঙ্গে বলে ওঠে, হ্যাঁ, মিসেস ক্রিস্টো আমি।
–আপনাকে ব্যথা দেবার কোনো বাসনা আমার নেই, তবে চাকরি-টাই এমন, আমি আপনাকে এই ব্যাপারে কিছু প্রশ্ন করতে চাই। আপনি চাইলে সলিসিটারকে উপস্থিত রাখতে পারেন–
স্যার হেনরি সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠেন, সেটা বোধহয় একপক্ষে ভালো হয় জার্দা—
