তারা নীরবে বসে রইলেন। এমনও অনেক সময় আসে, কোনো কিছু বলার মতো ক্ষমতা যখন মানুষের থাকে না।
পৈরট তাবুর সর্বত্র খুঁজে খুঁজে বেড়াচ্ছে, তার কাছে অস্বাভাবিক ধরনের কিছু নজরে পড়ে কিনা। হঠাৎ তার দৃষ্টি গিয়ে পড়ে, একটা চেয়ারের পেছন দিককার পোষাকের গলদেশের অংশে–একটা প্ল্যাটিনাম ফক্স। সে এই ভেবে অবাক হয়ে যায় যে, এটা কার হতে পারে। বাহ্যাড়ম্বরপ্রিয়, আত্মপ্রচারকারি, জাঁকজমকপ্রিয় লোকদেরই এই জিনিস থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু এতক্ষণ পর্যন্ত সে যাদের দর্শন করেছে এ জিনিষ তাদের থাকার কথা নয়। লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেলের কাঁধে এমন পদার্থ সে কল্পনাতেও আনতে পারে না।
এই জিনিষটা হাতে লাগার পর থেকে পৈর ভেতরে ভেতরে বিব্রত বোধ করে। আত্মপ্রচারে নেমে যাদের সুখ একমাত্র তাদের কাছেই এই জিনিষটা থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু যাদের সে দেখছে, তাদের কারোরই এমন স্বভাবের থাকা সম্ভব নয়।
হেনরি বলে ওঠেন, আমরা নিশ্চয়ই ধুমপান করতে পারি। তিনি তার সিগারেটের কেসটা পৈরটের দিকে এগিয়ে ধরলেন।
সিগারেট নেওয়ার আগে পৈরট একবার নিঃশ্বাস টেনে দেখল–ফরাসি সুগন্ধ–দামী মূল্যের ফরাসি সৌরভ। সে যাদের এতক্ষণ ধরে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ করেছে তাদের কারো পোষাক থেকেই এমন সুগন্ধ আসছিল না।
পৈরট চেয়ারে হেলান দিয়ে সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করার সময়েই তার দৃষ্টি চলে যায় চেয়ারের ঠিক পাশেই একটা ছোটমাপের টেবিলের ওপর। কতগুলো দেশলাই–মোট ছটা দেশলাই।
পৈরট খুব অবাক হয়–তার ধারণা এগুলো থেকেই সে হয়তো কোনো অজানা ব্যাপার জেনে যাবে।
.
১২.
লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল বলে ওঠেন, ঘড়িতে এখন আড়াইটে। বসার ঘরে মিডগে এবং এডওয়ার্ডকে সঙ্গে নিয়েই বসেছিলেন। পেছন থেকে যার হেনরির পড়ার ঘর থেকে কথাবার্তার আওয়াজ কানে আসছিল। হারকিউল পৈরট, স্যার হেনরি এবং ইনসপেক্টর গ্র্যাঞ্জ সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল সঙ্গে সঙ্গে এক দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বলে ওঠেন, আমি এখনও এটাই ভেবে চলেছি লাঞ্চের জন্য এ ব্যাপারে কারো উদ্যোগ নেওয়া উচিত। কিছুই ঘটেনি, এই মনে করে ডাইনিং টেবিলে লাঞ্চ খেতে বসে গেলে বড় নিষ্ঠুরতা হবে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।
কিন্তু অন্য দিকটা দেখারও প্রয়োজন আছে। পৈরটকে তো লাঞ্চের জন্য এখনই নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল–সে হয়তো ক্ষুধার্ত পেটেই বসে থাকবে। তাছাড়া, জনের নিহত হওয়ার ঘটনা আমাদের নিকট যতটা হৃদয়বিদারক তার কাছে ততটা নাও হতে পারে। আমি অবশ্য নিজের আহার নিয়ে ভাবছি না, কিন্তু সারাটা বিকাল শিকার করে হেনরি এবং এডওয়ার্ডের ক্ষুধার্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক।
এডওয়ার্ড এ্যাঙ্গক্যাটেল সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে, লুসি আমার জন্য অযথা চিন্তা কোরো না।
তুমি তো বরাবরই বিচার-বিবেচনা করে কাজ করো, এডওয়ার্ড, তোমার কথা না হয় ছেড়ে দিলাম–কিন্তু ডেভিড–আমি গতরাতে ডিনারের সময় লক্ষ্য করেছি যে, সে ভালোই খেতে পারে। যাদের মস্তিষ্কের কাজ বেশি হয় তাদের বেশি পরিমাণ খাদ্যেরও প্রয়োজন হয়। হা। হ্যাঁ, ভালো কথা, ডেভিড কোথায়? দেখছি না তো।
মিডগে বলে ওঠে, সে এই ঘটনা শোনার পর সোজা নিজের ঘরে চলে গেছে।
লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল বলে ওঠেন, হ্যাঁ, তার চিরকালই হাভভাবটা এইরকম, এসব ব্যাপারে সে বড্ড বিরক্ত হয়। অবশ্য হত্যাকাণ্ড বিরক্তিকর ব্যাপারও বটে–এই ব্যাপারে সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে চাকরের দল, সব কাজে অগোছালো ভাব! আমাদের লাঞ্চে হাঁসের মাংসের ব্যবস্থা করা হয়েছিল –সৌভাগ্যের বিষয় এটাই যে, ওটা ঠান্ডা খেতেও সুস্বাদু লাগবে। জার্দার জন্য কী ব্যবস্থা করেছ? একটা কিছুর স্ট্রং স্যুপ?
সত্যিই, লুসি বড়ই অমানুষ।–মিডগে মনে মনে ভাবতে থাকে। কিছুক্ষণ পর সে আপনমনেই মুক্তির অনুসন্ধানে নেমে পড়ে নয়তো লুসি সবই ভাবে সব জিনিষ গ্রহণে ব্যথিত হয়েও সকলের কথাই ভেবে চলেছে। চাকরদের কাজে ত্রুটি-বিচ্যুতি, খাওয়ার জন্য চিন্তা, ক্ষুধার উদ্রেক ইত্যাদি সকল বিষয়ে উপস্থিত সবাই মনে মনে ভাবছে–কিন্তু লুসি সবার মনের ভাবকে ভাষায় রূপান্তরিত করছে। এই মুহূর্তে সে নিজের ক্ষুধার্ত এবং ভেতরে ভেতরে অসুস্থ বোধ করছে।
আসলে যে সমস্যাটা এখন স্ত্রীলোকদের নিকট সম্মুখীন হয়েছে যারা তাকে বেচারী জার্দা বলে ভাবত, আজ সে খুনে-আসামী! সত্যিই বিপজ্জনক-বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি। একবাক্যে সকলেই বিব্রত।
মিডগে ভাবে, অন্য লোকের ক্ষেত্রে যদি এমনটা ঘটতে পারে, তবে আমাদের মতো মানুষের জীবনে এই ঘটনা ঘটতে পারে না?
সে এডওয়ার্ডের ঘরের দিকে একবার তাকাল। সে ভাবে, এডওয়ার্ডের মতো মানুষের এমনটা কখনোই হতে পারে না। এডওয়ার্ডকে তার মায়া হয়। সে কত শান্ত, বিচার-বুদ্ধিশীল, দয়ালু এবং ভদ্র।
গাজন ঘরে প্রবেশ করে গৃহকত্রীর উদ্দেশ্যে বলে ওঠে, মহাশয়া খাবার টেবিলে আমি স্যান্ডউইচ এবং কফি রেখে দিয়েছি।
ওঃ, তোমাকে ধন্যবাদ গাজন!
লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল বলে ওঠেন, গাজন সত্যিই অবাক করে দেয়। আমি ওকে ছাড়া এক মুহূর্ত চলতে পারি না, সে না থাকলে আমার যে কী উপায় হবে। গাজন ঠিক সময় মতো তার কাজ করে যায়। স্যান্ডউইচ-লাঞ্চের-ইত্যনুরূপ এবং এতে হৃদয়হীনতারও কোনো কারণ ঘটতে পারে না। আমার বক্তব্য কি তোমাদের বোধগম্য হয়েছে?
