পুলের অন্য প্রান্তে যেখানে বনের রাস্তা দুটো এসে এক হয়েছে, সেই স্থানটা তিনি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন।
হারকিউল পৈরট এবার মুখ খোলে। সে জানতে চায়, এরা কারা? জন এবং জার্দা? আমি . কি জানতে পারি?
-হা, হা নিশ্চয়ই। এই দুর্ঘটনার জন্য কারো সঙ্গেই আর পরিচয় হয়ে ওঠেনি। জন হল ক্রিস্টো, ডাক্তার ক্রিস্টো। জাদা ক্রিস্টো তার স্ত্রী, জবাবে বলে ওঠেন লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল।
যে স্ত্রীলকোটি মিসেস ক্রিস্টোর বাড়ি গেলেন, তবে উনি কে?
লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল বলে ওঠেন, আমার খুড়তুতো বোন, হেনরিয়েটা স্যাভারনেক।
পৈরটের বাঁ-দিক থেকে একটা গোলমাল কানে আসতে লাগল। পৈরট ভেবে নেয়, হেনরিয়েটার এটা বলা বোধহয় উচিত নয়, সে অবশ্য ভবিতব্য রূপেই জেনে ফেলেছে।
মুমুর্মু লোকটা ‘হেনরিয়েটা’ কথাটা কোনোক্রমে উচ্চারণ করেছিল। তার বলার কায়দাটা ছিল সত্যিই অদ্ভুত…বলার ভঙ্গিটা এমন ছিল যে পুরোনো অনেক কথা পৈরটকে স্মরণ করিয়ে দেয়…এই সময়ে একটা ঘটনার কথা তার মনে পড়ে যায়…একথার অর্থ কী? মৃত্যুপথযাত্রী কী বলতে চেয়েছিল?..হেনরিয়েটাকে জন কি কিছু বলতে চেয়েছিল?…লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল বলে ওঠেন, ইনি আমাদের এক খুড়তুতো ভাই এডওয়ার্ড এ্যাঙ্গক্যাটেল এবং মিস হার্ডক্যাসেল।
পৈরট মাথা নত করে তাদের সঙ্গে পরিচয় পর্ব সারলেন। বিকারের মতো হাসি হাসছিল মিডগের মুখে, সে কোনোরকমে অতিকষ্টে হাসি দমন করে। স্যার হেনরি বলে ওঠেন, আমার মনে হয়, আমার পরামর্শ অনুযায়ী তোমাদের এখন বাড়ি যাওয়াই উচিত। আমার মিস্টার পৈরটের সঙ্গে দু-একটা বিষয়ে আলোচনায় বসা প্রয়োজন।
লেডি এ্যাঙ্গক্যাটেল চিন্তিতমুখ নিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি বলে ওঠেন, জার্দা বোধহয় শুয়ে পড়েছে। এর থেকে বেশি আর কী বলা যেতে পারে তাকে? আমার কিছুতেই মাথায় আসছে না। এরকম একটা ঘটনা সত্যি বড় একটা ঘটে না। যে স্ত্রী লোক ঠান্ডা মাথায় এইমাত্র তার স্বামীকে খুন করেছে, তাকে আর কী বলা যায়?
প্রশ্নের জবাবের আশায় তিনি তার দিকে উদগ্রীব নয়নে তাকিয়ে রইলেন। পরে অবশ্য বাড়ি ফিরে গেছেন। মিডগে তাকে অনুসরণ করেছে।
পৈরট স্যার হেনরির সঙ্গেই থেকে গেল।
হেনরি সর্বপ্রথম কথা বললেন, তিনি কিছুতেই ভেবে উঠতে পারলেন না, কী বলা তার উচিত। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠেন, ক্রিস্টো নিঃসন্দেহে উপযুক্ত ব্যক্তি–খুবই ভালো এবং অত্যন্ত উপযুক্ত…।
পৈরট আরও একবার মাটিতে পড়ে থাকা প্রাণহীন দেহটার দিকে তাকাল। তার এখন মনে হচ্ছে যে, মৃতলোকটি এখনও জীবন্ত লোকদের থেকে অনেক বেশি জীবন্ত। সে এই ভেবে অবাক হয় যে, তার মানে কেন এমন ধারণা হল! ভদ্রমুখেই সে হেনরিকে বলে, এমন একটা ঘটনা সত্যিই বড় মর্মান্তিক।
স্যার হেনরি বলে ওঠেন, এসব ব্যাপার সম্পূর্ণ আপনার লাইনে পড়ে, আমার লাইনের নয়। আমার তো কেবলই মনে হচ্ছে এরকম একটা হত্যাকাণ্ডের এত কাছে এসে এর আগে কোনোদিন বোধহয় আসিনি। আশা করি, এতক্ষণ ধরে আমি যে পথে হেঁটে চলেছি, সেটা ঠিক পথই ছিল। কি বলেন?
পৈরট বলে ওঠে, হা, নিয়মানুসারে ঠিক ব্যবস্থাই নেওয়া হয়েছে। পুলিসকে খবর দেওয়া হয়েছে, যতক্ষণ না পুলিস এসে পৌঁছচ্ছে, আমাদের কিছুই করণীয় নেই–শুধু একটা বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে যে, কেউ যেন মৃতদেহটার নিকটে না যেতে পারে বা সাক্ষ্য প্রমাণের অবলুপ্তির কোনো কারণ না ঘটে।
শেষ শব্দটা উচ্চারণ করার সময়ই পৈরট একবার মৃতদেহটার দিকে দৃষ্টি বুলিয়ে নিল, রিভলবারটা ঠিক জলের নিচে কংক্রিটের ওপর পড়ে আছে, নীল জলে কিছুটা হয়তো বিকৃত হয়েছে।
সে ভাবে, সে বাধা দেবার আগেই পূর্বের প্রমাণাদি সব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু না–সেটা একটা নিছক দুর্ঘটনা।
স্যার হেনরি বিরক্তির সুরে মৃদুকণ্ঠে বলে ওঠেন, তাহলে একবার ভেবে দেখুন, আমাকে কী ব্যাপার না সামলাতে হচ্ছে? ঠান্ডা বোধহয় একটু বেশি পড়েছে, আসুন এখানে দাঁড়িয়ে না থেকে তাঁবুর মধ্যে গিয়ে বরং বসি। হাঁড় কাঁপানো ঠান্ডা বহুক্ষণ ধরে পায়ে এসে ঠেকায় অত্যধিক শীতে সে কাঁপছিল, এই প্রস্তাবে তাই সে সানন্দেই রাজী হয়ে যায়।
তাবুটা পুলের ঠিক পাশেই ছিল এবং তাবু থেকে পুল, মৃতদেহটা এবং বাড়ি যাওয়ার রাস্তা–যে পথ দিয়ে পুলিস আসবে, সবই চোখে ধরা পড়ছিল।
তাবুটা সুন্দরভাবে চেয়ার-টেবিল দিয়ে সজ্জিত এবং মদ্যপানের সুবন্দোবস্তও এখানে মজুত ছিল। সুচিত্রিত টেবিলে ট্রেতে গ্লাস রাখা এবং তার পাশেই ছিল শেরি ইত্যাদি মদের বোতল। ককটেল হওয়ার এটাই ছিল উপযুক্ত স্থান, এখানে ককটেল হওয়ার কথা ছিল।
স্যার হেনরি বলে ওঠেন, একটু পান করলে কেমন হয়? না থাক, পুলিস না আসা পর্যন্ত আমাদের এখানকার কোনো জিনিষই স্পর্শ করা উচিত নয়। অবশ্য এই কনকনে ঠান্ডায় একটু কিছু পান না করলে পুলিসের খুব অসুবিধার কারণ কিছু ঘটবে না, তবু কিছু না করাই সবদিক থেকে নিরাপদ। গাজনের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে যে এখনও ককটেলের ব্যবস্থা করে উঠতে পারেনি। সে বোধহয় আপনাদের প্রতীক্ষাতেই বসে ছিল।
দু’জনে দুটো কঞ্চির চেয়ার অধিকার করে দরজার কাছে এসে বসলেন, পুলিসের আবির্ভাবের দৃশ্যটা যাতে তাদের চোখে ধরা না পড়ে।
